নিজস্ব প্রতিবেদক।।
ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী এমভি অভিযান-১০ নামক লঞ্চের ইঞ্জিন থেকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দগ্ধ হয়েছে কমপক্ষে শতাধিক মানুষ।
রিনা বলেন, ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় আমাদের বসবাস, বাবার বাড়ি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় আর শ্বশুর বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটায়। তিন দিনের ছুটিতে ছেলেকে নিয়ে বাবার বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছিলাম।
তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত উপায়ন্ত না দেখে ছেলেকে ধাক্কা দিয়ে নদীতে ফেলে দেই। এরপর দেখি ছেলের মাথা ভাসছে। তখন আমিও বোরকা ছিড়ে ফেলে ঝাপ দেই নদীতে। ছেলেকে ধরে কোনভাবে খুব কষ্টে সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হই। এরপর নদী তীরের লোকজন সহায়তায় এগিয়ে আসেন। আল্লাহর রহমতে মা-ছেলে বেঁচে গেছি।
কিন্তু ঢাকা থেকে ফেরার পথে লঞ্চে আগুন লাগে। ঘটনার সময় জীবন বাঁচাতে লঞ্চ থেকে ঝাঁপ দেন তাইফার নানা। তাকে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাইফার বাবা ও তাইফা লঞ্চের ডেকে আটকে পড়েন। তাইফা অগ্নিদগ্ধ হয়ে লঞ্চেই মারা যায়, তার বাবা বশির গুরুতর দগ্ধ হন। বর্তমানে তাইফার বাবা বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
অনেক ধাক্কাধাক্কি করেও তারা গেট খুলতে না পেরে তৃতীয় তলার রেলিংএ মমতাজের শাড়ি বেঁধে স্বামী গোলাম রহমান তাকে কোনো মতে দ্বিতীয় তলায় নামায়। পরে তিনি নিজেও ওই শাড়ী বেয়ে দ্বিতীয় তলায় নামেন। এরপর নিচে নামার আর কোনো উপায় খুঁজে পাননি এই দম্পতি। উপায়ান্ত না পেয়ে বৃদ্ধ ও অসুস্থ স্ত্রীকে দ্বিতীয় তলা থেকে নিচে জলে ফেলে দেন স্বামী গোলাম রহমান। এরপর নিজেও লাফ দিয়ে স্ত্রীকে ধরে কোনো মতে তীরে ওঠেন।
এরপর নাতিকে নিয়ে কেবিন থেকে বের হয়ে দেখেন আগুনের লেলিহান শিখা। বৃদ্ধ নারী নাতিকে নিয়ে দিকবেদিক ছুটতে থাকেন। ইতিমধ্যে লঞ্চের সব লাইট বন্ধ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে লঞ্চটির সমস্ত বডি গরম হয়ে যায়। নাতি মেহেদী লঞ্চের পাশে গেলে একজন তার গায়ের ওপর পরে। তার সাথে সেও তিন তলা থেকে ছিটকে নিচে পানিতে পড়ে যায়।
নাতিকে হারিয়ে বৃদ্ধ নাসরিন আক্তার কি করবে ভেবে পায় না। এদিকে প্রচণ্ড তাপে পায়ের তলা পুড়ে যাচ্ছিলো তার। তিনি উপায় না পেয়ে তিন তলা থেকে জীবনের মায়া ত্যাগ করে নিচে ঝাপ দেন। এর পরে কিভাবে তীরে উঠেছেন সে ঘটনা তিনি মনে করতে পারছেন না। তিনিও বর্তমানে বামনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
আগুনের উৎপত্তিস্থল স্পষ্ট দেখেছেন বামনা উপজেলার ব্যবসায়ী গোবিন্দ সাহা। তিনি তখন লঞ্চটির নিচ তলায় সামনের দিকে শুয়ে ছিলেন। হঠাৎ তিনি ইঞ্জিন রুমে আগুন দেখতে পান। তিনি তাৎক্ষনিক দৌড়ে তিন তলায় সুকানির কাছে গিয়ে লঞ্চের আগুনের বিষয়টি বলেন। তিনি তাকে লঞ্চটি তীরে নিতে অনুরোধ করেন। পরে তিনি আবার নিচে চলে আসেন। এমন সময় লঞ্চটির প্রায় অর্ধেক অংশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। লঞ্চটির ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ায় তীরে নেওয়ার চেষ্টা করলেও ভাটায় লঞ্চটিকে মাঝ নদীর দিকে নিয়ে যাচ্ছিলো বলে দাবি তার। তিনি তখন কোনো মতে ঝাঁপ দিয়ে নদীতে পড়েন। পরে দেখতে পান লঞ্চের শেষ দৃশ্য। রাত আনুমানিক ৩টায় আগুন লাগা লঞ্চে অনেক যাত্রী নিখোজ। পানিতে পাওয়া গেছে ৩ জনের লাশ। যে ৩৬ জনের লাশ পাওয়া গেছে তাদের অধিকাংশ পুড়ে ছাই। বরিশাল ও ঝালকাঠির হাসপাতালে শতাধিক মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছেন। গুরুতর আহতদের ঢাকা নেওয়া হচ্ছে। অনেকের শরীরে ৫০ ভাগ পুড়ে গেছে। মৃত্যুর পরিমান বাড়ার সম্ভাবনা।
জেলা প্রশাসন থেকে ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে লাশ দাফন ও অন্যন্য কাজের জন্য। নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী নিহতদের প্রত্যেককে দেড় লাখ প্রদানের ঘোষণা দেন। তিনি ঘটনাস্থলে এসে বলেন,এটি দূর্ঘটনা না কোনো চক্রান্ত বা নাশকতা সেটা খতিয়ে দেখা হবে।
মর্মান্তিক এ দূর্ঘটনায় শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
