নিউজ ডেস্ক।।
নভেম্বরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩৭৯টি। এতে নিহত হয়েছেন ৪১৩ জন এবং আহত ৫৩২ জন। নিহতদের মধ্যে নারী ৬৭, শিশু ৫৮। ১৫৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ১৮৪ জন, যা মোট নিহতের ৪৪.৫৫ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৪১.৬৮ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ৯৬ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ২৩.২৪ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫৩ জন, অর্থাৎ ১২.৮৩ শতাংশ। এই সময়ে ৭টি নৌদুর্ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং ৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ১১টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ২ জন আহত হয়েছেন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৭টি জাতীয় দৈনিক, ৫টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অক্টোবরে ৩৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০৭ জন নিহত হন, যা নভেম্বরের চেয়ে কম। এই হিসাবে অক্টোবরের তুলনায় নভেম্বরে দুর্ঘটনা বেড়েছে ১৩.১৭ শতাংশ এবং প্রাণহানি বেড়েছে ৪.৮৭ শতাংশ।
যানবাহনভিত্তিক নিহতের চিত্র : দুর্ঘটনায় যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেলচালক ও আরোহী ১৮৪ জন (৪৪.৫৫ পার্সেন্ট), বাসযাত্রী ২৩ জন (৫.৫৬ পার্সেন্ট), ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ডভ্যান-ট্রাক্টর-ট্রলিযাত্রী ১২ জন (২.৯০ পার্সেন্ট), মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার- অ্যাম্বুলেন্স-জিপযাত্রী ৯ জন (২.১৭ পার্সেন্ট), থ্রি-হুইলারযাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-মিশুক-টেম্পো-লেগুনা) ৬৬ জন (১৫.৯৮ পার্সেন্ট), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-বোরাক-মাহিন্দ্র-টমটম) ১৭ জন (৪.১১ পার্সেন্ট)। প্যাডেল রিকশা-রিকশাভ্যান বাইসাইকেল আরোহী ৬ জন (১.৪৫ পার্সেন্ট) নিহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনা সংঘটিত সড়কের ধরন : রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ১৫৬টি (৪১.১৬ পার্সেন্ট) জাতীয় মহাসড়কে, ১৩১টি (৩৪.৫৬ পার্সেন্ট) আঞ্চলিক সড়কে, ৫৩টি (১৩.৯৮ পার্সেন্ট) গ্রামীণ সড়কে, ৩৫টি (৯.২৩ পার্সেন্ট) শহরের সড়কে ও অন্য স্থানে ৪টি (১.০৫ পার্সেন্ট) সংঘটিত হয়েছে।
দুর্ঘটনার ধরন : দুর্ঘটনাগুলোর ৮৯টি (২৩.৪৮ পার্সেন্ট) মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৩৩টি (৩৫.০৯ পার্সেন্ট) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ৯১টি (২৪ পার্সেন্ট) পথচারীকে চাপা/ধাক্কা দেওয়া, ৫৯টি (১৫.৫৬ পার্সেন্ট) যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং ৭টি (১.৮৪ পার্সেন্ট) অন্য কারণে ঘটেছে।
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহন : দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের মধ্যে-ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ ২১.৪২ শতাংশ, ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি-ড্রাম ট্রাক ৩.৮৪ শতাংশ, মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার-অ্যাম্বুলেন্স-জিপ ৫.৩১ শতাংশ, যাত্রীবাহী বাস ১১.৫৩ শতাংশ, মোটরসাইকেল ৩০.৫৮ শতাংশ, থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-মিশুক-লেগুনা-টেম্পো) ১৯.৯৬ শতাংশ, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন (নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-পাখিভ্যান-বোরাক-মাহিন্দ্র-টমটম) ৪.৩৯ শতাংশ এবং প্যাডেল রিকশা-রিকশাভ্যান-বাইসাইকেল ১.৯৩ শতাংশ।
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা : দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা ৫৪৬টি। (ট্রাক ৭৮, বাস ৬৩, কাভার্ডভ্যান ১২, পিকআপ ২৭, ট্রলি ৮, লরি ৩, ট্রাক্টর ৬, মাইক্রোবাস ১৩, প্রাইভেটকার ১১, অ্যাম্বুলেন্স ৩, জিপ ২, পুলিশ পিকআপ ২, ড্রাম ট্রাক ৪, মোটরসাইকেল ১৬৭, থ্রি-হুইলার ১০৯ (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-মিশুক-টেম্পো-লেগুনা), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন ২২ (নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-পাখিভ্যান-বোরাক-মাহিন্দ্র-টমটম) ও প্যাডেল রিকশা-রিকশাভ্যান-বাইসাইকেল ১৬টি।
দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণ : দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে ভোরে ৫ পার্সেন্ট, সকালে ২৭.১৭ পার্সেন্ট, দুপুরে ১৭.৪১ পার্সেন্ট, বিকালে ২২.১৬ পার্সেন্ট, সন্ধ্যায় ৬.৮৬ পার্সেন্ট ও রাতে ২১.৩৭ পার্সেন্ট।
দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারি পরিসংখ্যান : ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনা ২৬.৫৭ পার্সেন্ট, প্রাণহানি ২৬.৫১ পার্সেন্ট। রাজশাহী বিভাগে দুর্ঘটনা ১৫.৯৪ পার্সেন্ট, প্রাণহানি ১৩.৪২ পার্সেন্ট। চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনা ১৯.৩২ পার্সেন্ট, প্রাণহানি ২১.৮১ পার্সেন্ট। খুলনা বিভাগে দুর্ঘটনা ৯.১৭ পার্সেন্ট, প্রাণহানি ৭.৭১ পার্সেন্ট। বরিশাল বিভাগে দুর্ঘটনা ৮.২১ পার্সেন্ট, প্রাণহানি ৬.০৪ পার্সেন্ট। সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা ৭.২৪ পার্সেন্ট, প্রাণহানি ৭.০৪ পার্সেন্ট। রংপুর বিভাগে দুর্ঘটনা ৬.৭৬ পার্সেন্ট, প্রাণহানি ৯.৭৩ পার্সেন্ট এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুর্ঘটনা ৭.১৬ পার্সেন্ট, প্রাণহানি ৭.৭১ পার্সেন্ট ঘটেছে।
ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ৮৩টি দুর্ঘটনায় নিহত ১০৪ জন। সবচেয়ে কম বরিশাল বিভাগে। ২২টি দুর্ঘটনায় নিহত ২৪ জন। একক জেলা হিসাবে চট্টগ্রাম জেলায় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ২১টি দুর্ঘটনায় ২৯ জন নিহত। সবচেয়ে কম লালমনিরহাট জেলায়। ২টি দুর্ঘটনা ঘটলেও কেউ হতাহত হয়নি। রাজধানী ঢাকায় ১৪টি দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত হয়েছেন।
আহত ও নিহতদের পেশাগত পরিচয় : নিহতদের মধ্যে পুলিশ সদস্য ২ জন, সেনা সদস্য ১ জন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষক ১১ জন, চিকিৎসক ৩ জন, রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইঞ্জিনিয়ার ১ জন, সাংবাদিক ৪ জন, ইমাম ২ জন, এনজিও কর্মকর্তা-কর্মচারী ৯ জন, ওষুধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বিক্রয় প্রতিনিধি ১৭ জন, স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ২৩ জন, পোশাক শ্রমিক ৭ জন, নির্মাণ শ্রমিক ৪ জন, ইটভাটা শ্রমিক ২ জন, ধানকাটা শ্রমিক ৩ জন, জুতা কারখানার শ্রমিক ৫ জন, রাজমিস্ত্রি ১ জন, কাঠমিস্ত্রি ১ জন, ইলেকট্রিশিয়ান ১ জন, মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ৩ জন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ৭ জন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নটর ডেম কলেজের ২ জনসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫৪ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন।
সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলো : ১. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ২. বেপরোয়া গতি, ৩. চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা, ৪. বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা, ৫. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, ৬. তরুণ ও যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ৭. জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা, ৮. দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ৯. বিআরটিএ-এর সক্ষমতার ঘাটতি, ১০ গণপরিবহণ খাতে চাঁদাবাজি।
সুপারিশগুলো : ১. দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি করতে হবে, ২. চালকের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করতে হবে, ৩. বিআরটিএ-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে, ৪. পরিবহণের মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, ৫. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল বন্ধ করে এগুলোর জন্য আলাদা পার্শ্বরাস্তা (সার্ভিস লেন) তৈরি করতে হবে, ৬. পর্যায়ক্রমে সব মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ করতে হবে, ৭. গণপরিবহণে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে, ৮. রেল ও নৌপথ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে সড়কপথের ওপর চাপ কমাতে হবে, ৯. টেকসই পরিবহণ কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, ১০.‘সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮’ বাধাহীনভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
মন্তব্য : ট্রাক ও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ চালকদের বেপরোয়া গতিতে ট্রাক চালানো এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর কারণে তারা নিজেরা দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে এবং অন্য যানবাহনকে আক্রান্ত করছে। পথচারী নিহতের মাত্রাও চরম উদ্বেগজনক পর্যায়ে। পথচারীরা যেমন সড়কে নিয়ম মেনে চলে না, তেমনি যানবাহনগুলোও বেপরোয়া গতিতে চলে। এতে পথচারী নিহতের ঘটনা বাড়ছে। দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির হার ঊর্ধ্বমুখী হলেও এটা নিয়ন্ত্রণে সরকারের তেমন কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। ‘সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮’ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
