বিশ্বকাপের রঙ হলুদ

নিউজ ডেস্ক।।

হলুদ রঙটার মধ্যে কী এমন এক মাহাত্ম্য লুকিয়ে আছে? ক্রিকেট বলুন আর ফুটবল বলুন, হলুদ রঙ মানেই ফেবারিট। চূড়ান্ত সাফল্যে অন্য কেউ চলে আসতে পারে; কিন্তু হলুদকে ফেবারিটের তালিকায় না রাখাটা যেন চরম ভুল।

সেই ভুলটাই এবার ক্রিকেট বোদ্ধা থেকে শুরু করে সাধারণ সমর্থকরাও করেছিল। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে হলুদ রঙের অস্ট্রেলিয়াকে কেউ ফেবারিটের তালিকাতেই আনতে সাহস পায়নি। কেমনে পারবে? টি-টোয়েন্টিতে কী এমন ঐতিহ্য রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার? টানা ৫টি সিরিজ পরাজয়ের পর যারা বিশ্বকাপ খেলতে আসে, তাদেরকে নিয়ে কোন সাহসে বাজি ধরবে বাজিকররা?

কিন্তু ওই যে বলেছিলাম, ভুল? সেই ভুলটার জন্য এখন হয়তো বোদ্ধারা আফসোস করছেন। হয়তো মনে মনে প্রতিজ্ঞা করছেন, যে পরিস্থিতিই হোক- আর কখনো হলুদকে বাদ দিয়ে হিসেব-নিকেশের খাতা খুলবো না।

সেই হলুদেই শেষ পর্যন্ত রাঙাল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং এই প্রথমবারেরমত। ২০০৭ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের যাত্রা শুরুর পর ১৪টি বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে অস্ট্রেলিয়াকে। ২০১০ সালেই সম্ভাবনাটা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ক্রিকেটের জনকদের কাছে সেবার আর পাত্তা পায়নি।

এরপর আরও প্রায় একযুগ। বারবার চেষ্টা করেও যে অধরা শিরোপাটার ছোঁয়া পায়নি, সেটাই অবশেষে পেয়ে গেলো অসিরা। তাও কিভাবে? অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স দিয়ে। গোনায়ও যাদের ধরেনি কেউ, সেই তারাই হলো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।

১৯৭৫ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপ প্রবর্তনের পরও দীর্ঘ একযুগ অপেক্ষা করতে হয়েছিল শিরোপার ছোঁয়া পেতে। ১৯৮৭ সালে এসে অ্যালান বোর্ডারের হাত ধরে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ হয় অস্ট্রেলিয়ার। যদিও তখন কিন্তু রঙটা হলুদ ছিল না। সাদাই ছিল। বিশ্বকাপের রঙিন জার্সির ব্যবহার তো শুরুই হয়েছিল ১৯৯২ সাল থেকে।

১৯৯৬ সালে রানাতুঙ্গা আর অরবিন্দ ডি সিলভার শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে শিরোপা পূনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে, পরের বিশ্বকাপেই, ১৯৯৯ সালে স্টিভ ওয়াহর হাত ধরে অসি রাজত্বের শুরু। এরপর রিকি পন্টিংয়ের হাত ধরে ২০০৩, ২০০৭ সালে বিশ্বকাপের রঙ হয়েছিল হলুদ। ২০১১ বিরতি দিয়ে আবারও মাইকেল ক্লার্কের হাত ধরে ২০১৫ সালে বিশ্বকাপ জিতেছিল অস্ট্রেলিয়া।

ওয়ানডে ফরম্যাটে রাজত্ব করলেও টি-টোয়েন্টিতে ঠিক সাফল্যের সিঁড়িটা খুঁজে পাচ্ছিল না। বিশ্বমানের সব টি-টোয়েন্টি খেলোয়াড় সমৃদ্ধ অস্ট্রেলিয়া দল; কিন্তু সর্বশেষ পরিসংখ্যান দেখুন! ইংল্যান্ডের কাছে ২-১ ব্যবধানে, ভারতের কাছে ২-১ ব্যবধানে, নিউজিল্যান্ডের কাছে ৩-২, ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ৪-১ এবং বাংলাদেশের কাছে সিরিজ হেরেছে ৪-১ ব্যবধানে।

বাংলাদেশের কাছে ৪-১ ব্যবধানে হারের সিরিজে হয়তো কয়েকজন ছিলেন না। কিন্তু অধিকাংশই তো ছিলেন। এই কোচও ছিলেন। সুতরাং, বাংলাদেশের মত দেশের কাছে নাকানি-চুবানি খেয়ে বিশ্বকাপ খেলতে আসার পর তাদেরও আত্মবিশ্বাস ঠিক ছিল কি না সন্দেহ।

যদিও পাকিস্তানকে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়া কোচ জাস্টিন ল্যাঙ্গার বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের কাছে পরাজয়ের কারণে দলের মধ্যে গভীরতা বেড়েছে। ক্রিকেটারদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। সে কারণেই তারা এতদুর আসতে পেরেছে।’

বাংলাদেশের কাছে পরাজয় যদি তাদের এই সাফল্যের কারণ হয়, তাহলে টাইগারদের তারা ধন্যবাদ দিতেই পারে। অন্যদিকে অধিনায়ক অ্যারোন ফিঞ্চ ফাইনালের আগে বলেছিলেন, ‘আমাদেরকে অনেকেই হিসেবের মধ্যে রাখেনি। কিন্তু আমরা আত্মবিশ্বাসী ছিলাম, যে করেই হোক আমাদের জিততে হবে। এই আত্মবিশ্বাস থেকেই আমরা এ পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পেরেছি।’

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয় দিয়ে অভিযান শুরু করলেও মাঝে যখন একটি ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে হেরেছিল অসিরা, তখন তাদের খুব মন খারাপ হয়েছিল। তাদের মধ্যে হতাশা ভর করেছিল। একটি দল সাফল্যের জন্য মরিয়া হলে কতটা উদগ্রিব হয়ে ওঠে, এটা তারই প্রমাণ। এরপর সামনে পেলো বাংলাদেশকে। সেই বাংলাদেশ যাদের কাছে মাত্র কিছুদিন আগে ৪-১ ব্যবধানে হেরে এসেছিল।

কিন্তু এবার আর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদদের সমীহ করলেন না তারা। ৭৩ রানে অলআউট করে মাত্র ৩৮ বলেই জয় তুলে ফেলেছিল তারা। বিশাল ব্যবধানে এই জয়ই দক্ষিণ আফ্রিকার চেয়ে এগিয়ে রেখে অসিদের সেমিতে উঠেছিল অসিরা। সেমিফাইনালে পাকিস্তানের মত উড়তে থাকা দলের বজ্রকঠিন চ্যালেঞ্জকেও তারা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে।

ফাইনালে নিউজিল্যান্ড কী খারাপ খেলেছে? কেন উইলিয়ামসনের রেকর্ড গড়া ইনিংসে দলীয় সংগ্রহেও রেকর্ড গড়েছিল কিউইরা। উইলিয়ামস করেছিলেন ৮৫ রান। নিউজিল্যান্ডের সংগ্রহ ১৭২। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ। এই রানও যখন অনায়াসে পার হযে যায়, অসিরা তখন তো কারো কিছু করার থাকে না।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো অস্ট্রেলিয়ার যে ক্রিকেটাররা আগের সিরিজগুলোতে ছিলেন পুরোপুরি নিষ্প্রভ, তারাই বিশ্বকাপে এসে সবাই জ্বলে উঠলেন। অফ ফর্মের কারণে ডেভিড ওয়ার্নারকে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ নেতৃত্ব থেকেই নয় শুধু, একাদশ থেকেই বাদ দিয়েছিল। সেই ওয়ার্নারই এখন টুর্নামেন্ট সেরা।

কী অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখালেন। ফাইনালেও তার ব্যাট কথা বললো। কিউইদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ৩৮ বলে ৫৩ রান করে আউট হলেন। মিচেল মার্শ বাংলাদেশ সফরেও এসেছিলেন। সেই মিচেল মার্শই আজ ৫০ বলে অপরাজিত ৭৭ রান করে দলকে জেতালেন। গ্লেন ম্যাক্সওয়েল তো ছিলেন ফিনিশার। ১৮ বলে করলেন ২৮। রিভার্স সুইপে বাউন্ডারি মেরে অসিদের জয়ের উল্লাসে ভাসান তিনি।

অন্যদিকে দুর্ভাগ্য নিউজিল্যান্ডের। বারবার ফাইনলে উঠেই স্বপ্নভঙ্গ হচ্ছে তাদের। ২০১৫ বিশ্বকাপের ফাইনালে এই অস্ট্রেলিয়ার কাছেই হেরেছিল তারা। ২০১৯ বিশ্বকাপে না হেরেও শিরোপা জিততে পারেনি অদ্ভূত বাউন্ডারি হিসেবের কারণে। এবার আবারও তারা হারলো অস্ট্রেলিয়ার কাছে। কবে আবার ভাগ্যের সিকে ছিঁড়বে কিউইদের, তা একমাত্র উপরওয়ালাই জানেন।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.