খোলাবাজারে ডলার ৯০ টাকা

নিজস্ব প্রতিনিধি।।

বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকায় দেশে ব্যাপক হারে পণ্য আমদানি বেড়েছে। ফলে বাড়তি চাহিদার কারণে লাফিয়ে বাড়ছে ডলারের দাম। যার বিপরীতে মান হারাচ্ছে টাকা। তিন দিনের ব্যবধানে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের মূল্য আরও ২০ পয়সা বেড়ে ৮৫ টাকা ৭০ পয়সায় উঠেছে। রবিবার খোলাবাজার ও নগদ মূল্যে ডলার ৯০ টাকা ১০ পয়সায় কেনাবেচায় হয়।

যা এ যাবতকালের সর্বোচ্চ মূল্য। ব্যাংকসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় দেশে আমদানি চাপ বেড়েছে। এছাড়া করোনার ভ্যাকসিনের আমদানির অর্থও পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে এসব দায় পরিশোধ করতে গিয়ে বাড়তি ডলারের প্রয়োজন হচ্ছে। অন্যদিকে প্রবাসীদের পাঠানো আয় বা রেমিটেন্স গত তিন মাস ধারাবাহিকভাবে কমছে। আবার প্রত্যাশা অনুযায়ী রফতানি আয় কম। সব মিলিয়ে বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

এতে টাকার বিপরীতে বাড়ছে ডলারের দাম। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা মজুদ রয়েছে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে ব্যাংকগুলোর চাহিদার বিপরীতে ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকার পর চলতি বছরের আগস্টের শুরু থেকে হঠাৎ বাড়তে থাকে ডলারের দাম। যা এখন পর্যন্ত অব্যাহত আছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, রবিবার ব্যাংকগুলোর নিজেদের মধ্যে লেনদেনর জন্য প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮৫ টাকা ৭০ পয়সা। যা এ যাবতকালের সর্বোচ্চ মূল্য। তিন কর্মদিবস আগেও এ দর ছিল ৮৫ টাকা ৫০ পয়সা। সেপ্টেম্বরের শুরুতে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের দাম ছিল ৮৫ টাকা ২০ পয়সা। আগস্টের শুরুতে ছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা। আগস্টের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দুই মাস ১০ দিনের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে ৮০ পয়সা দর হারিয়েছে টাকা। এর আগে ২০২০ সালের জুলাই থেকেই ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা স্থিতিশীল ছিল ডলার।

সর্বশেষ আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য দাঁড়ায় ৮৫ টাকা ৭০ পয়সা। তবে খোলাবাজার ও নগদ মূল্যে ডলার ৮৯ টাকা ৯০ পয়সা থেকে ৯০ টাকা ১০ পয়সায় কেনাবেচা হচ্ছে। বাড্ডার গুডউইল মানি এক্সচেঞ্জের স্বত্বাধিকারী রয়েল শাহরিয়ার বলেন, দীর্ঘদিন ৮৮-৮৯ টাকায় ডলার কেনাবেচার পর গত ৩-৪ দিন ধরে হঠাৎ বেড়ে গেছে ডলারের দাম। বর্তমানে আমরা ৮৯ টাকা ৮০ পয়সায় ডলার কিনছি। বিক্রি করছি ৯০ টাকা ১০ থেকে ২০ পয়সায়। বসুন্ধরার ম্যাক্স মানি এক্সচেঞ্জের স্বত্বাধিকারী আব্দুল শ্যামই অয়ন বলেন, দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকার পর গত মাসের শুরুতে (আগস্ট) হঠাৎ টাকার বিপরীতে বাড়তে শুরু করে ডলারের দাম। যা এখন পর্যন্ত অব্যাহত আছে। আজ সর্বোচ্চ ৯০ টাকা ১০ পয়সায় ডলার বিক্রি হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, যখন বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বেশি ছিল তখন ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন সরবরাহ কমে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ডলার বিক্রি করছে। চলতি অর্থবছরে অর্থাৎ জুলাই থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাজারে ৭৮৬ মিলিয়ন ডলার (৭৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার) বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম জানান, করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকায় দেশে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও পণ্য আমদানি বেড়েছে। এসব পণ্যের দায় পরিশোধ করতে বাড়তি ডলারের প্রয়োজন হচ্ছে। তাই দাম বেড়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা মজুদ রয়েছে।

বাজার স্থিতিশীল রাখতে ব্যাংকগুলোর চাহিদার বিপরীতে ডলার সরবরাহ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। করোনাভাইরাস থেকে দেশের মানুষকে সুরক্ষায় বিভিন্ন দেশ থেকে টিকা কিনছে সরকার। সম্প্রতি কোভিড-১৯-এর টিকা কেনার জন্য ২ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা ছাড় করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ডলার কিনে এ অর্থ ছাড় করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমদানি বাড়ায় ডলারের দাম বাড়তে শুরু করেছে। গত অর্থবছরে প্রচুর রেমিটেন্স আসায় ডলারের সরবরাহ বেড়ে গিয়েছিল। চলতি অর্থবছরে তেমনটি থাকবে বলে মনে হয় না। ইতোমধ্যে তার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রেমিটেন্স বাড়েনি।

গত আগস্ট মাসেও আগের তুলনায় কমেছে। সেপ্টেম্বরেও কমেছে। অন্যদিকে আমদানি অনেক বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘সব মিলিয়ে ডলারের চাহিদা বেড়ে গেছে। আর চাহিদা বাড়লে যে কোন পণ্যের দাম যেমন বাড়ে; ডলারের দামও তেমনি বাড়ছে। এটাই স্বাভাবিক। আর এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে হস্তক্ষেপ করে ডলারের দাম বাড়ার সুযোগ করে দিয়ে ঠিক কাজটিই করছে বলে আমি মনে করি। ‘এর ফলে রফতানি খাতের ব্যবসায়ীরা সুবিধাজনক অবস্থায় আছেন। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। টাকার মান বেড়ে গেলে অর্থনীতির এই দুই সূচকে নেতিবাচক প্রভাব পড়ত।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্টে রেকর্ড পরিমাণ এলসি খোলা হয়েছে। আগস্টে মোট ৭১৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারের এলসি খুলেছেন দেশের ব্যবসায়ীরা। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ৬১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ৫০ পয়সা)।

এদিকে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের দুই মাসের (জুলাই-আগস্ট) হিসেবে এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে ৪৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। এই দুই মাসে বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানির জন্য ১ হাজার ২১৩ কোটি (১২ দশমিক ১৩ বিলিয়ন) ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে খোলা হয়েছিল ৮১৬ কোটি ৩০ লাখ ডলারের এলসি। এর আগে বাজার স্থিতিশীল রাখতে ডলার কেনায় রেকর্ড গড়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০২০-২১ অর্থবছরে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে সব মিলিয়ে প্রায় ৮ বিলিয়ন (৮০০ কোটি) ডলার কিনে। এর আগে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৫ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত অর্থবছরের আগে সেটিই ছিল সর্বোচ্চ ডলার কেনার রেকর্ড। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েও ২০ কোটি ৫০ লাখ ডলার কেনে আর্থিক খাতের এ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

ব্যাংকগুলোর তথ্যানুযায়ী, আমদানি দায় মেটাতে ব্যবসায়ীদের থেকে দেশী ও বিদেশী খাতের বেশিরভাগ ব্যাংক প্রতি ডলারে ৮৫ টাকা ৬০ পয়সা পর্যন্ত নিচ্ছে। তবে নগদ ডলারের মূল্য বেশিরভাগ ব্যাংকে ৮৭ টাকার উপরে রয়েছে। কয়েকটি ব্যাংকে নগদ ডলারের মূল্য ৮৮ টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, করোনা মহামারীর শুরুর দিকে প্রবাসী আয়ের চাঙ্গাভাব চলতি বছরের জুন থেকে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সবশেষ গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ১৭২ কোটি ডলার রেমিটেন্স এসেছে। প্রবাসী আয়ের এ অঙ্ক গত ১৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২০ সালের মে মাসের দেশে ১৫০ কোটি ডলার সর্বনিম্ন রেমিটেন্স আসে।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.