নিউজ ডেস্ক।।
জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনায় ২ হাজার ১২৫ কোটি টাকা (২৫ কোটি ডলার) ক্ষতির মুখে পড়েছে সরকার। তিন জাহাজের মধ্যে একটি ইতিমধ্যে এলএনজি দেশে এসে পৌঁছেছে, বাকি দুটি জাহাজও আসবে। গ্যাস সংকট সামাল দিতে গিয়ে সরকার জরুরি ভিত্তিতে এই এলএনজি কিনেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগের প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার কর্মকর্তা সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
পেট্রোবাংলার দুজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগামীতে এলএনজিসহ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়বে। কারণ চীন আগামী ১০ বছরের এলএনজি আগাম ক্রয় করছে। এতে বিশ্ববাজারে বড় প্রভাব পড়বে। দেশে দুটি এলএনজি টার্মিনাল বছরে ৭ মিলিয়ন টন এলএনজিকে রিগ্যাসিফিকেশন (প্রক্রিয়াকরণ) করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তিতে কাতার এবং ওমানের সঙ্গে চার মিলিয়ন টন এলএনজির সংস্থান রয়েছে। বাকি এলএনজি স্পট মার্কেট থেকে কিনে আনতে হয়। বাংলাদেশ সিঙ্গাপুরের স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি করে থাকে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই এই কারণে যে, বাংলাদেশ সরকার ২০১০ সালে যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মহাপরিকল্পনা করেছিল সেখানে মিশ্র জ্বালানির ব্যবস্থা রেখেছিল। তেল, কয়লা, এলএনজির পাশাপাশি ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ধস নামবে না।
দেশে বর্তমানে দৈনিক ৪২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে গড়ে ৩০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়। আর সরবরাহকৃত গ্যাসের মধ্যে গড়ে ২৭ শতাংশ হলো বিদেশ থেকে আমদানি করা এলএনজি। বাকিটা দেশের গ্যাস কূপ থেকে উত্তোলন করা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু গত বুধবার রাতে টেলিফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুই বছর আগে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ মেয়াদে এলএনজি কেনার চুক্তি করতে চেয়েছিল আমাদের সঙ্গে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তখন দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি চুক্তি করা সম্ভব হয়নি। তখন স্পট মার্কেটে দাম কম ছিল। কিন্তু এখন স্পট মার্কেটে দাম বেড়ে গেছে তিনগুণের বেশি। অথচ তখন দীর্ঘ মেয়াদে চুক্তি করতে পারলে বাংলাদেশ এখন অনেক ভালো অবস্থানে থাকত।
তিনি বলেন, চীন আগামী ১০ বছরের জন্য অগ্রিম এলএনজি কিনছে। এতে বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির দেশ খানিকটা চাপে পড়েছে। আমরা এখন লস ও লাভের কথা ভাবছি না, ভাবছি দেশের শিল্প কলকারখানা বাঁচিয়ে রাখতে। দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে হবে। সে কারণে আমরা লোকসান দিয়ে হলেও এলএনজি আমদানি অব্যাহত রেখেছি।
আট মাসে তিন গুণ দাম বেড়েছে : গত জানুয়ারিতে প্রতি এমএমবিটিইউ (ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) স্পর্ট এলএনজির দাম গড়ে ১০ ডলার ছিল। বর্তমানে এটির দাম বেড়ে তিনগুণের বেশি ৩২ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ হয়েছে। সরকার সম্প্রতি তিন জাহাজ এলএনজি কিনেছে স্পট মার্কেট থেকে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, বাড়তি দামে স্পট মার্কেট থেকে তিন জাহাজে এলএনজি কিনেছে সরকার। এখানে ব্যয় হয়েছে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার বা ২ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা। তিনগুণ দাম বেড়ে যাওয়ায় এখানে বাড়তি ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। দীর্ঘ মেয়াদে এলএনজি কেনার চুক্তি থাকলে বাড়তি এই অর্থ দিতে হতো না।
কর্মকর্তারা আরও বলেন, স্পট মার্কেট হলো এমন বাজার যখন কেনা হবে তখনই তা জাহাজীকরণ করে বাংলাদেশের দিকে রওনা হবে। কিন্তু বাংলাদেশে এলএনজি কিনতে হলে সরকারের নানান জায়গায় অনুমতি নিতে হয়। সর্বশেষ এটি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন নিতে হয়। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে এলএনজির দাম বেড়ে যায়। স্পট মার্কেটেরও সুবিধা নিতে পারে না বাংলাদেশ।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বৈশ্বিক বাজারে এলএনজির বড় ভোক্তা চীন। সম্প্রতি চীন কার্বন নিঃসরণ কমাতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অর্থ দেওয়া বন্ধ করার পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমিয়ে এনেছে। এতে চীনে নজিরবিহীন বিদ্যুৎ বিভ্রাট তৈরি হয়েছে। দেশটি এখন এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়াচ্ছে। সে জন্য আগামী ১০ বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে অগ্রিম এলএনজি কেনা শুরু করেছে চীন। আর এতেই এলএনজির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে ১০ ডলার থেকে ৩২ ডলারে দাঁড়িয়েছে প্রতি ইউনিট।
এ ছাড়া যুক্তরাজ্যও বিদ্যুৎ সংকটে পড়েছে। এ জন্য দেশটির সরকার শিল্প খাতে বিদ্যুৎ রেশনিং করা শুরু করেছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানির এই সংকট এলএনজির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। কভিড ১৯ মহামারীর সংকট কাটিয়ে উঠে শিল্প-কারখানার উৎপাদন ফের চালু হওয়ায় গত দেড় বছরের মধ্যে বর্তমানে জ্বালানির সর্বোচ্চ ব্যবহার হচ্ছে আন্তর্জাতিকভাবে।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি ক্রয় চুক্তি রয়েছে। এ ছাড়া বেশকিছু মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বাংলাদেশের কাছে দীর্ঘ মেয়াদে এলএনজি বিক্রির আগ্রহ জানিয়েছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের সামিট ও টোটাল গ্যাস দীর্ঘ মেয়াদে এলএনজি বিক্রির আগ্রহ জানিয়ে সরকারকে চিঠি দিয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে সামিটের সঙ্গে এ সংক্রান্ত চুক্তি হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ কক্সবাজারের মহেশখালী ও পায়রাতে দুটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করতে চায়। এর মধ্যে ২০১৮ সালে মহেশখালীতে স্থলভাগে দ্রুত এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তিন বছর আগে মহেশখালীতে স্থলভাগে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্রাথমিকভাবে এতে তিনটি প্রতিষ্ঠানের তালিকাও করা হয়। তবে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সব থেকে প্রভাবশালী কোম্পানিটি অকৃতকার্য হলে এই প্রক্রিয়া থেমে যায়। ওই প্রতিষ্ঠানটিকে দরপত্রে প্রাথমিক তালিকায় রাখতে আটটি প্রতিষ্ঠানের নাম ঢুকে পড়ে, কারণ যোগ্যতায় ওই দেশীয় প্রতিষ্ঠানটি অনেক নিচে ছিল। এখন পর্যন্ত স্থলভাগে টার্মিনাল নির্মাণে আর সামনে যেতে পারেনি সরকার। ফলে এলএনজি আমদানি ঘুরেফিরে ১০০ কোটি ঘনফুটের মধ্যেই আটকে আছে।
দেশে বর্তমানে ১২০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস সংকট রয়েছে। গ্যাস সংকট সমাধানে ইতিমধ্যে এলএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস রেশনিং শুরু হয়েছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এটি সমাধান নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, প্রতি বছর দেশে গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে গড়ে ১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) বা ১০০ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) থেকে ১ দশমিক ১ টিসিএফ গ্যাস। এর মধ্যে বিদ্যুতে ব্যবহার হয় ৪৩.২৮ শতাংশ, শিল্প কারখানায় ১৫.৭৯ শতাংশ, বাসা বাড়িতে ১৫.২৫ শতাংশ, শিল্প-কারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র (ক্যাপটিভ পাওয়ার) ১৫.১২ শতাংশ, সার উৎপাদনে ৫.৫৪ শতাংশ, সিএনজি দশমিক ১৬ শতাংশ, বাণিজ্যিক দশমিক ৭৬ শতাংশ ও চা বাগানে দশমিক ১০ শতাংশ। আর এ মুহূর্তে গ্যাসের অভাবে প্রায় ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না।
কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্যাসের সংকট তৈরি করে এলএনজি আমদানিকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে বিশেষভাবে কাউকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। দেশীয় গ্যাসের পর্যাপ্ত অনুসন্ধান ও উত্তোলন নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে আমদানি করা গ্যাস দিয়ে দেশ চালাতে গেলে যে বিপুল আর্থিক ক্ষতির শিকার হবে বাংলাদেশ তার দায় জনগণকে মেটাতে হবে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
