অপরাধ প্রমাণের আগে কারো সন্মানহানী সাংবিধানিক অপরাধ নয় কী?

ফিরোজ আলম।।

সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় সভ্যতা আজ ভুলুন্ঠিত বললেও খুব কম বলা হবে।আইন এবং আইনের প্রয়োগ অনেক সাধারন মানুষের মত অনেক ক্ষেত্রে কর্তা ব্যক্তিদের হাতে ও ভুলুন্ঠিত।ফলে একদিকে যেমন মানুষ তার সাংবিধানিক অধিকার হারাচ্ছে অন্যদিকে আইনের শাসন ও সুশাসন পরিপন্থী রুপ নিচ্ছে।সাম্প্রতিক সময়কালের কয়েকজন আলেমের, কয়েকজন রাজনীতিবিদের,কয়েকজন সাংস্কৃতিক মডেলের এবং কয়েকজন নৈতিকতা বিরোধী অপরাধীর গ্রেফতার সারা দেশের মানুষ লক্ষ্য করেছে।কিন্তু গ্রেফতারকৃত উপরিউক্ত মানুষের বিরুদ্ধে আদালত কতৃক অপরাধ এখনো প্রমান হয়নি কিংবা আদালত কারো সাজা ঘোষনা করেনি।অথচ তার আগেই এদেশের প্রথম সারির কয়েকটি জাতীয় দৈনিক,টেলিভিশন চ্যানেল অধিকাংশ অনলাইন দৈনিক,পুলিশের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এবং কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিরা গ্রেফতারকৃতদের চরিত্র নিয়ে নানা বাজে মন্তব্য করেছেন,তাদের সন্মান হানি করেছেন, এসব কি সংবিধান বিরোধী কাজ নয় কি?

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে বলা আছে, আইন ছাড়া কারও জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সম্পদ, সুনাম এসবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। অথচ হরহামেশাই দেখা যাচ্ছে এদেশের পুলিশ কোন অপরাধীকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর বুকে ‘ধর্ষক’ বা ‘মাদক ব্যবসায়ী’ লেখা কাগজ সাঁটিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে তাঁর সন্মানহানি করছেন যা ৩১ নং অনুচ্ছেদ বিরোধী জঘন্য কাজ।আইনের লোকেরাই যদি আইনের শাসনের পরিপন্থী কাজ করে তাহলে সাংবিধানিক নাগরিক অধিকার ধুলিস্যাৎ হবে সন্দেহ নাই।অন্যদিকে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা নির্দোষ প্রমানিত হলে তো তারা তাদের হারানো সামাজিক, পারিবারিক এবং রাষ্ট্রীয় সন্মান কি ফিরে পাবেন?ভুল গ্রেফতারকারী, ভুল বিচারকারী,অসত্য সংবাদ পরিবেশনকারী এবং চরিত্রহননকারী কাউকে কোনো জবাবদিহির মধ্যে পড়তে হয়েছে কিনা এমন নজির এখনো এদেশে তেমন দেখা যায়না।বোর্টক্লাবের ঘটনায় তিন নারীকে গ্রেপ্তার করে তাঁদের ‘রক্ষিতা’ হিসেবে দেশের মানুষের সামনে পরিচয় করিয়ে দেয় পুলিশ।সাম্প্রতিক কিছু মডেল অভিনেত্রীকে গ্রেফতার করে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় রাতের রানী।অথচ আদালতে এখনো তাদের অপরাধ প্রমানিতই হয়নি।আমি বলছি না যে গ্রেফতারকৃতরা অপরাধী নয়।হতেই পারে।আমি বলছি না পুলিশের গ্রেফতার অপরাধ।পুলিশ যে কাউকে প্রয়োজনে গ্রেফতার করতেই পারে।আমি বলতে চাচ্ছি কাউকে গ্রেফতার মানেই সে অপরাধী নয়।বরং অপরাধ প্রমানের আগে তথ্যপ্রমাণ ছাড়া এসব মানহানিকর বক্তব্য এবং গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির চরিত্র হনন নি:সন্দেহে অপরাধ এবং তা নৈতিকতা বিরোধীও বটে।অন্যদিকে যাদের বাসায় মাদক পাওয়া যায় কিংবা যে মডেলরা আপত্তিকর কাজ করে তাদের কিংবা রাতের রানীদের গ্রেফতার করে যত সহজে চরিত্র হনন করা হয়, ঠিক একই ভাবে রাতের রানীদের আমন্ত্রনে যারা সাড়া দিয়ে অনৈতিকতা বাঁচিয়ে রাখে ঐ সমস্ত রাতের নায়ক যারা আবার দিনের সন্মানীয় কিংবা বিচারক তাদের চরিত্র হনন করতে কোন পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা টেলিভিশন চ্যানেল ,জাতীয় দৈনিক কিংবা কোন কলামিস্ট কে দেখাই যায় না। এতে আইনের শাসনের প্রতি একদিকে অনাস্থা তৈরি করে হচ্ছে
অন্যদিকে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া কিংবা দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিদের প্রতি অনেকেরই অরুচি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে অপরাধীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে, তা অভিযোগ হিসেবেই সংবাদমাধ্যমকে জানাতে হবে। কিন্তু বিচারের আগেই তাঁদের দোষী হিসেবে উপস্থাপন বা তাঁদের চরিত্র হনন থেকে বিরত থাকা আবশ্যক বোধ করি। একইভাবে মাদকের জোগানদাতা, পর্নোগ্রাফি চক্রের পৃষ্ঠপোষক, পার্টনার ও সুবিধাভোগী ,পাপিয়া, পিয়াসা, পরীমনি,মামুনুল হক,হেলেনা জাহাঙ্গীরদের গডফাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অতি আবশ্যক। কারন গডফাদারেরাই রাতের রানীর নায়ক হন এবং দিনের বেলায় সাধু,ভদ্র বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন অনেকটাই।

মনে রাখতে হবে নীতিহীন অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধ করতে হলে অপরাধী নয়, অপরাধ দমনের দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সাথে সাথে মনে রাখতে হবে গণমাধ্যম,দায়িত্বশীল কর্মকর্তা,সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দায়িত্বশীল হলেই সকলের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সম্পদ এবং সুনাম সাংবিধানিকভাবেই অক্ষুন্ন থাকবে।

লেখক ও কলামিস্ট
ফিরোজ আলম,বিভাগীয় প্রধান(অনার্স,এম এ শাখা)।
আয়েশা( রা:) মহিলা কামিল(অনার্স,এম.এ) মাদ্রাসা,সদর,লক্ষীপুর।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.