রাজশাহী সিল্ক এখন জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাচ্ছে

রেশম আবিষ্কারের ইতিহাস বেশ চমকপ্রদ ও কিছুটা রহস্যপূর্ণও বটে। রেশম বা সিল্কের আদিভূমি মূলত চীন দেশে। তুঁত নামের এক ধরনের সবুজ পাতাবিশিষ্ট গাছ থেকে পাওয়া পলু পোকার গুঁটি থেকে প্রক্রিয়াকৃত ও আহরিত সূক্ষ্ম সুতায় তৈরি হয় অনিন্দ-সুন্দর, মসৃণ ও কোমল বস্ত্রসম্ভার রেশম বা সিল্ক।

ইতিহাস ও সময়ের হাত ধরে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে রাজশাহী সিল্ক বিশ্বব্যাপী একটি ঐতিহ্যের নাম হয়ে উঠেছে। এই রাজশাহী সিল্ক আগামী ২৬ এপ্রিল বিশ্ব মেধাস্বত্ব দিবসে ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য (জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন্স) হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে।

তবে এটি বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবে মেধাস্বত্ব পাচ্ছে। এর ফলে রাজশাহী সিল্কের বাজার পরিধি ও চাহিদা যেমন বাড়বে তেমনি বিশ্ববাজারে পণ্যটি ঐতিহ্যের অঙ্গ হয়ে উঠবে। পাশাপাশি বিশ্ববাজারে রাজশাহী সিল্কের দর কষাকষির অধিকার এবং সক্ষমতাও বাড়বে।

উল্লেখ্য, রাজশাহীতেই উৎপাদিত হয় দেশের সিংহভাগ রেশম পণ্য। বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের সদর দপ্তরও রাজশাহীতে। রাজশাহী রেশম কারখানাটি খুঁড়িয়ে চললেও মূলত বেসরকারি উদ্যোগে বিকশিত হয়ে চলেছে রাজশাহী সিল্ক।

এককালে রেশম সুতা থেকে শুধু শাড়ি তৈরি হলেও এখন পণ্যের বৈচিত্র্য ও ডিজাইনের বিস্তৃতি ঘটেছে। এখন সব বয়সী ও শ্রেণীর মানুষের পরিধান উপযোগী নানা ধরনের রেশম বস্ত্র তৈরি হচ্ছে রাজশাহীর বিভিন্ন কারখানায়।

ঐতিহ্যবাহী সিল্কের জিআই স্বীকৃতি শুধু রাজশাহী নয়, সারা দেশের জন্য গর্বের বিষয় বলে উল্লেখ করে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান বলেন, রাজশাহী সিল্ক দেশের গর্ব। এ স্বীকৃতি রাজশাহীর ভাবমূর্তি শুধু দেশেই নয়, বিশ্ব পরিমণ্ডলে আরও উজ্জ্বল করবে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রাজশাহীর মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে।

বিষয়টি দেশের ও রাজশাহীর জন্য একটি বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক (ডিজি) আব্দুল হাকিম। তিনি বলেন, রেশম বা সিল্ক একটি উৎকর্ষ ও মূল্যবান পণ্য হলেও এটি রাজশাহী তথা বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যও বটে। বাংলার রেশম পণ্যের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও যার সুনাম বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত ছিল এককালে। রাজশাহী তথা বাংলাদেশের রেশম বস্ত্র রপ্তানি হতো দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ইউরোপ ও পৃথিবীর অন্য দেশেও। বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রাজশাহী সিল্ক বাংলাদেশের জিআই পণ্য বা নিজস্ব পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। এ স্বীকৃতির অর্থ হচ্ছে রেশম পণ্যটির আদিবাস বাংলাদেশের রাজশাহীতে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী রেশমের জিআই প্যাটেন্ট পেতে ২০১৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ব মেধাস্বত্ব বিষয়ক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচ্যুয়াল প্রোপার্টি রাইটস অর্গানাইজেশনে (ডব্লিউআইপিআরও) আবেদন করে বাংলাদেশ। সুইজ্যারল্যান্ডের জেনেভা শহরে এ সংস্থার সদর দপ্তর।

বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে গত ৬ জানুয়ারি ডব্লিউআইপিআরও রাজশাহী সিল্ককে বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সংস্থার সাময়িকীতে বিষয়টি প্রকাশ করে আপত্তি গ্রহণের জন্য দুই মাস সময় দেওয়া হয়।

তবে শেষপর্যন্ত বিশ্বের কোনো দেশই সিল্কের জিআই স্বত্ব পেতে আপত্তি না দেওয়ায় বাংলাদেশকেই এ বিশেষ পণ্যের স্বীকৃতির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়। আগামী ২৬ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে রাজশাহী সিল্ক একটি বিশ্বব্র্যান্ড হিসেবে বাংলাদেশের জিআই পণ্যের তালিকাভুক্ত হবে। একই দিন ঢাকাই মসলিনকেও বাংলাদেশের জিআই পণ্যের স্বীকৃতি হস্তান্তর করবে ডব্লিউআইপিআরও।

জানা গেছে, এর আগে জামদানি, ইলিশ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরসাপাত আম জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করে। এরই ধারাবাহিকতায় রাজশাহী সিল্ক পাচ্ছে জিআই স্বীকৃতি। ফলে এ পণ্যের প্যাটেন্ট বা ব্র্যান্ড বিশ্ববাজারে বিপণনে নিজেদের পণ্য বলে অন্য কোন দেশ দাবি করতে পারবে না।

আবার রাজশাহী সিল্ক বলে অন্য কোনো দেশও ব্র্যান্ড সুবিধা নিতে পারবে না। ক্রেতারা রেশম পণ্যের অরিজিন্যালিটি হিসেবে বাংলাদেশের রাজশাহীকেই মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করবে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চীনে রেশমের আদি উৎসভূমি হলেও ব্রিটিশদের হাত ধরে অবিভক্ত বাংলার বৃহত্তর রাজশাহীর ভোলাহাট, পশ্চিমবাংলার মালদা ও মুর্শিদাবাদে রেশম শিল্পের গোড়াপত্তন ঘটে ১৯০৫ সালে। ১৯১৪ সালে রেশম পণ্যের উন্নয়নে ব্রিটিশ সরকার অবিভক্ত বাংলায় তুঁত চাষ প্রকল্প গ্রহণ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানে।

দেশ ভাগের আগ পর্যন্ত রাজশাহীর চারঘাট ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটে দুটি রেশম বীজাগার স্থাপন করা হয়। রেশম বস্ত্রের কাঁচামাল পলু পোকার গুঁটি এই দুটি কারখানা থেকেই জোগান হতো। পাকিস্তান আমলে রাজশাহী ও ঠাকুরগাঁও জেলায় দুটি রেশম কারখানা স্থাপন করা হয় সরকারি উদ্যোগে।

তবে সরকারি এ কারখানাগুলোতে এখন নামমাত্র রেশম পণ্য তৈরি হয়। বিভিন্ন বেসরকারি উদ্যোগে রাজশাহীতে রেশম কারখানায় বিভিন্ন ধরনের রেশম পণ্য তৈরি হয়ে বিশ্ববাজারে চলে যাচ্ছে। এসব কারখানার কাঁচামাল রেশম সুতা যদিও কোরিয়া ও চীন থেকে আমদানি করতে হয়। তবে এসব রেশম পণ্য রাজশাহী সিল্ক নামেই সমধিক পরিচিতি ও খ্যাতি পেয়েছে।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.