সরকারি তদন্তে দুর্নীতি ও প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ সংক্রান্ত অভিযোগের প্রমাণ মেলার পরও নিজের চেয়ার দু’মাসেরও বেশি আঁকড়ে ছিলেন প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সবুর খান। তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ‘আইসিটির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার প্রচলন (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের’ পরিচালক। তবে শেষ রক্ষা হলো না। মঙ্গলবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক আদেশে তাকে ওএসডি করা হয়েছে।
সরকারি তদন্তে তার বিরুদ্ধে অন্তত ১৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের পদার্থবিদ্যা বিষয়ের অধ্যাপক।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের উপ-সচিব (কলেজ-২) ড. শ্রীকান্ত কুমার চন্দ স্বাক্ষরিত আদেশে নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না দেওয়া পর্যন্ত প্রকল্পটির উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ জাকির হোসেনকে প্রকল্প পরিচালকের রুটিন দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান ‘পরিদর্শন ও নীরিক্ষা অধিদফতরের’ (ডিআইএ) এক তদন্তে এ প্রকল্প পরিচালকের অর্থ আত্মসাতের ঘটনাটি ধরা পড়ে। এ প্রকল্প পরিচালকের আত্মসাৎ করা ১৭ লাখ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করে গত বছরের অক্টোবর মাসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় ডিআইএ। এখন পর্যন্ত আত্মসাৎ করা অর্থ ফেরতের নির্দেশ না দেওয়া হলেও মঙ্গলবার ড. মো. আব্দুস সবুর খানকে এ প্রকল্প থেকে সরিয়ে দিয়ে ওএসডি করলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
ডিআইএ’র তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পটি ছিল শিক্ষকদের মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নেওয়ার প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত। সরকারি ও সাপ্তাহিক ছুটি বাদ দিয়ে প্রশিক্ষণের সময়কাল ছিল মাত্র ৭৮ দিন। প্রশিক্ষণের ব্যাচ এক হাজার ১২১টি। প্রতি ব্যাচে প্রশিক্ষণার্থী ঠিক করা হয়েছিল ৩০ জন। প্রতিটি প্রশিক্ষণের স্থায়িত্বকাল ছিল ছয় দিন ও ১২ দিন।
ভেন্যু সারাদেশে ২০টি। কিন্তু এই সময়সীমায়ও ওইসব প্রশিক্ষণে উপস্থিত ছিলেন এই প্রকল্প পরিচালক- এমন হাজিরা দেখিয়ে তিনি নিজের সম্মানী বাবদ গ্রহণ করেছেন ১৬ লাখ ৮১ হাজার ৫০০ টাকা। যদিও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্সে তার ভিন্ন ভিন্ন স্বাক্ষর পাওয়া গেছে। সারাদেশের ২০টি ভেন্যুতে গত বছরের ৬ মার্চ থেকে ৩০ জুন অনুষ্ঠিত ওই প্রশিক্ষণে ৩৬টি জেলার ১০০ উপজেলার শিক্ষকরা অংশ নেন।
শুধু প্রশিক্ষণের সম্মানীই নয়, নিয়ম ভেঙে ভেন্যু ভাড়া প্রদান বাবদ সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে দেখানো হয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা। সেই টাকা নিয়মানুযায়ী ব্যাংকেও জমা করা হয়নি। প্রায় সব অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে নিয়ম-কানুনের কোনো তোয়াক্কাই করেননি প্রকল্পের পরিচালক। বিশেষ জরুরি প্রযোজনে বছরে তিনি ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ ছাড় করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত হলেও সেটাও মানেননি, ছাড় করেছেন কোটি কোটি টাকা।
প্রশিক্ষণের জন্য মালপত্র কেনার ক্ষেত্রেও ছিল না কোনো দরপত্রের বালাই। নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান থেকেই কেনা হয়েছে কোটি কোটি টাকার প্রশিক্ষণসামগ্রী। এমনকি প্রশিক্ষণের জন্য যেসব মালপত্র কেনার কাগজপত্র দেখানো হয়েছে, তার সব পৌঁছায়নি প্রশিক্ষণস্থলে।
জানা যায়, এক হাজার ৩৫৩ কোটি টাকার এই আইসিটি প্রকল্প শুরু হয় ২০১৬ সালের জুলাই মাসে। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের জুন মাসে। তবে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু গত অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি হয় মাত্র ৮ শতাংশ। এখনো মূল কাজই শুরু হয়নি।
এ প্রকল্পের অধীনে সারাদেশের তিন হাজার ৩৪০টি স্কুলের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকা আরও প্রায় পাঁচ হাজার বেসরকারি স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করার কথা ছিল। বাস্তবে একটি ক্লাসরুমও আজ পর্যন্ত স্থাপণ করতে পারেনি এই সদ্যবিদায়ী প্রকল্প পরিচালক। মাল্টি মিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন না করেই ক্লাসরুমে পাঠদানের জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের নামে উড়িয়েছেন বিপুল টাকা। করেছেন অর্থ আত্মসাৎও।
প্রতিটি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে একটি করে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, ল্যাপটপ, সাউন্ডবক্স, মডেম ইত্যাদি শিক্ষা উপকরণ সরবরাহের পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কর্মসূচি ছিল এ প্রকল্পে। মাল্টি মিডিয়া ক্লাসরুম তৈরি না করে এই প্রকল্প পরিচালক তিনগুণ দাম দিয়ে তিন হাজার মডেম কেনেন। তবে বিদ্যালয়গুলোতে ল্যাপটপ ও কম্পিউটার না থাকায় এই মডেম তাদের কোনো কাজেই আসেনি।
ডিআইএ’র তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য ম্যানুয়াল, সার্টিফিকেটসহ নানা সামগ্রী কেনাকাটায়ও ব্যাপক অনিয়ম পাওয়া গেছে। নিয়মানুযায়ী সনদ ও ম্যানুয়াল বাবদ ব্যয় আলাদাভাবে দেখানোর কথা থাকলেও তা হয়নি। বিভিন্ন ভেন্যু থেকে পাওয়া ভাউচার পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৩০ জনের প্রতিটি প্রশিক্ষণ কোর্সের ম্যানুয়াল বাবদ ৯ হাজার টাকা, প্রশিক্ষণ ব্যাগ বাবদ ৯ হাজার ৬০০ টাকা, প্রশিক্ষণসামগ্রী বাবদ এক হাজার ৮০০ টাকা এবং প্রতি ব্যাচের প্রশিক্ষণসামগ্রী পৌঁছানোর পরিবহন খরচ মোহাম্মদপুরের আনিশা এন্টারপ্রাইজকে পরিশোধ করা হয়েছে।
এত বিপুল পরিমাণ টাকার প্রশিক্ষণসামগ্রী সরবরাহ করার জন্য কিভাবে আনিশাকে নিযুক্ত করা হলো তার কোনো রেকর্ড নেই। অর্থাৎ কোনো দরপত্র ছাড়াই দুই কোটি ২৫ লাখ দুই হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কেনা মালপত্রের কোনো স্টক এন্ট্রিও করা হয়নি। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণসামগ্রী ভেন্যু কর্তৃপক্ষ না পেলেও বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
