২০২০ সালের অর্থনীতির হালচাল

নিউজ ডেস্ক।।

দেশের অর্থনীতিতে ২০২০ সালের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্যাকেজ ঘোষণা। যা দেশ ও বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। এছাড়া, এ বছরই সরকার আরও ১০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

করোনা মহামারির কারণে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৩ লাখ কর্মী দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। এরমধ্যেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের রিজার্ভ ৪২ বিলিয়ন ডলারের নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। যদিও এসময় নতুন করে ১০ হাজারের বেশি কর্মীকে বিভিন্ন দেশে পাঠানো সম্ভব হয়েছে।

এক দশকব্যাপী ৬.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় ২০১৮-২০১৯ সালে ৮.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যা এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। পাশাপাশি, সামাজিক ক্ষেত্রের বিভিন্ন সূচকেও সাধিত হয়েছে ঈর্ষনীয় অগ্রগতি।

দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত করা, দারিদ্র্য কমানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সরকারি সম্পদ ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বহিঃস্থ ঋণ ধারণ ক্ষমতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছে।

মহামারির প্রাদুর্ভাবে বিশ্বব্যাপী লকডাউন ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে এ সংকট মোকাবিলা ও অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাব উত্তরণে প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্যাকেজ বাস্তবায়ন করা হয়। যা দিয়ে ২১ প্যাকেজে প্রণোদনা দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর কারণে বাংলাদেশ কোভিড-১৯ এর অর্থনৈতিক প্রতিঘাত বেশ ভালোভাবেই মোকাবিলা করতে পেরেছে সরকার।

এসময় সাপ্লাই চেইনে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটার কারণে পেঁয়াজসহ কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়ে গেলে জনগণ সাময়িক কিছুটা ভোগান্তির মুখে পড়ে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার ফলে পেঁয়াজ, ডাল, চাল ও ভোজ্যতেল টিসিবি’র মাধ্যমে খোলা বাজারে বিক্রির ব্যবস্থা করে সরবরাহ চেইন চলমান রাখা হয়।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রধান নির্দেকশ মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, বাজেট ঘাটতি এবং সরকারি ঋণ বা জিডিপি অনুপাত এর অবস্থান সন্তোষজনক ছিল।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে ৫.০৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে রেকর্ড ৮.১৫ শতাংশ হয়। কিন্তু কোভিড-১৯ এর প্রভাবে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে তা কিছুটা কমে ৫.২৪ শতাংশে (সাময়িক হিসাব) দাঁড়িয়েছে বলে অর্থবিভাগ সূত্রে জানা গেছে।

মূল্যস্ফীতি ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরের ৭.৬ শতাংশ থেকে কমে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ৫.৬৫শতাংশ (১২ মাসের গড়) হয়েছে। বাজেট ঘাটতি প্রতি বছর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী জিাডপি’র ৫ শতাংশের নিচে সীমিত ছিল; যদিও ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে করোনার প্রভাবে এ ঘাটতি সামান্য বেশি ৫.২৩ শতাংশ হয়েছে।

ঋণ বা জিডিপি অনুপাত ২০০০-২০০৯ অর্থবছরের ৩৯.৩ শতাংশ থেকে ক্রমশ কমে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে জিডিপি’র ৩৫.৮ শতাংশে (সাময়িক হিসাব অনুযায়ী) নেমে এসেছে।

আমাদানি ব্যয় ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে ২২ হাজার ৫০৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ৫৯ হাজার ৯১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হয়েছে। কিন্তু কোভিড-১৯ এর প্রভাবে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ৮.৬ শতাংশ কমে তা ৫৪ হাজার ৭৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

রপ্তানি আয় ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে ১৫,৫৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে বেড়ে ৪০,৫৩৫ মিলিয়ন ডলার হয়েছে। কিন্তু কোভিড-১৯ এর প্রভাবে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ১৬.৯ শতাংশ কমে তা ৩৩,৬৭৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

প্রবাস আয় ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে ৯,৬৮৯ ডলার থেকে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ১৮,২০৫ মিলিয়ন ডলার হয়েছে। অন্যদিকে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রিজার্ভ।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘আইএমএফসহ সব দাতা সংস্থা বাংলাদেশ সম্পর্কে পূর্বাভাস দিচ্ছে, তাতে একটি বার্তা পরিষ্কার, দেশের অর্থনীতি ইতিবাচক ধারায় আছে। এটি আশাবাদী হওয়ার মতো। পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া সঠিক পথেই আছে। হয়তো প্রবৃদ্ধির সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। গত এপ্রিল-মে মাসের কঠোর বিধিনিষেধের পর সবকিছু খুলে দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিফলন ঘটেছে বিভিন্ন সংস্থার প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে।’

সেলিম রায়হান আরও বলেন, ‘অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি রপ্তানি ও প্রবাসী আয় ভালো অবস্থায় আছে। কিন্তু আমেরিকা ও ইউরোপে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বড় অর্থনীতির দেশগুলো ধাক্কা খাচ্ছে। এতে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় নিয়ে শঙ্কা আছে। আইএমএফের পরবর্তী পর্যালোচনায় বোঝা যাবে, বাংলাদেশের অর্থনীতি কোন দিকে যাচ্ছে।’


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.