মোহাম্মদ শামসুর রহমান ঃ
প্রথমেই শিরোনামের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয়, কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়। তাহলে কী পরিমাণ গবেষণা হলে তাকে আমরা ‘পর্যাপ্ত’ বলব? আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিং প্রকাশ করলে কিছুদিন এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলে। এসব র্যাঙ্কিংয়ের অন্যতম নিয়ামক হচ্ছে গবেষণা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়, গবেষণা থেকে প্রকাশিত প্রবন্ধের সাইটেশন। যেহেতু আমাদের দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এসব র্যাঙ্কিংয়ে সামনের সারিতে আসতে পারে না, তাই ‘পর্যাপ্ত’ গবেষণা না হওয়ার ব্যাপারটি আলোচনায় আসে। কিছুদিন আগে এক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক গবেষণা হতে হবে। সেসব গবেষণা বেশি বেশি প্রকাশের ব্যবস্থাও নিতে হবে। গবেষণা হোক। এ জন্য অর্থ কোনো সমস্যা নয়। প্রয়োজনে আমি নিজেই টাকার ব্যবস্থা করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবে এখন যেটা দেখা যাচ্ছে, গবেষণার বরাদ্দ থাকে, কিন্তু ব্যয় হয় না।’
প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনার পরও পর্যাপ্ত গবেষণা না হওয়ার পেছনের কারণ কী কী? সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে গবেষণায় অনীহা। আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে, কিন্তু সবই কোনো না কোনোভাবে এই কারণটির সঙ্গে জড়িত। কিন্তু কেন এই অনীহা! প্রথমত প্রমোশন নীতিমালা। প্রমোশন নীতিমালায় মূলত শিক্ষকতার সময়কালকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, গবেষণাকে নয়। প্রতি পদে কয়েকটি করে প্রকাশনার প্রয়োজন হয় কিন্তু তাও মানসম্মত প্রকাশনা হতে হবে এমন নয়। তাই গবেষণার ব্যাপারে অনেকেই উদাসীন। পদোন্নতির ক্ষেত্রে যে কয়টি প্রকাশনার প্রয়োজন হয়, তার ক্ষেত্রে পিয়ার রিভিউড, ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর বা আন্তর্জাতিক ইনডেক্সড জার্নালে প্রকাশনার কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকায় অনেকেই পর্যাপ্ত গুরুত্ব দিয়ে গবেষণা করেন না। পর্যাপ্ত গবেষণার অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে মানসম্মত গবেষণা প্রপোজাল লিখে রিসার্চ ফান্ডিং নিয়ে আসা। কিন্তু পদোন্নতি নীতিমালায় একজন শিক্ষক নূ্যনতম কয়টি গবেষণা প্রকল্প সম্পাদন করেছেন, তার প্রয়োজনীয়তা রাখা হয়নি।
বিশেষ কোনো প্রণোদনার ব্যবস্থা না থাকায় অধ্যাপক পদে পদোন্নতির পর অনেকেই গবেষণায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
শিক্ষকদের অনীহার বিষয়টি প্রভাব ফেলে শিক্ষার্থীদের গবেষণার ক্ষেত্রে। অনেক শিক্ষার্থীর মতে, গবেষণার মাধ্যমে যে নতুন কিছু আবিস্কার ও তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা যায়, শিক্ষকরা তা বোঝাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। গবেষণা নিয়ে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকা, কী করবে, কীভাবে করবে- এ ব্যাপারে গাইডলাইন না পাওয়া, গবেষণাকে হাইলাইট করার পর্যাপ্ত অনুষ্ঠান না হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনীহা দেখা দেয়। গবেষণায় উজ্জ্বল ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা কম, তাই সরকারি চাকরির পড়ালেখায় মনোযোগী তারা। শিক্ষার্থীদের গবেষণায় আগ্রহী করার জন্য পর্যাপ্ত প্রণোদনা, ‘অ্যাওয়ার্ড ফর রিসার্চ’ প্রদান করা প্রয়োজন।
গবেষণার পরিবেশ না থাকাও পর্যাপ্ত গবেষণা না হওয়ার পেছনে একটি বড় কারণ। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত স্পেস বরাদ্দ, যন্ত্রপাতি কেনার জন্য টাকার সংস্থান ইত্যাদি ক্ষেত্রে একজন গবেষককে নানাবিধ বাধার সম্মুখীন হতে হয়। গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নূ্যনতম ‘রিসার্চ সেল’ও নেই। পর্যাপ্ত গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ এমফিল, পিএইচডি শিক্ষার্থী প্রয়োজন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশিরভাগই আন্ডার গ্র্যাজুয়েটভিত্তিক, অনেক ক্ষেত্রে ভালো পিএইচডি নীতিমালাও নেই। বেশিরভাগ অধ্যাপকের পর্যাপ্ত সংখ্যক পিএইচডি গবেষক নেই। অথচ সারাবিশ্বে পিএইচডি গবেষকরাই মূলত গবেষণা ও পাবলিকেশন্স করে থাকেন। অধিকন্তু, কোনো শিক্ষক যদি পিএইচডি শিক্ষার্থী নিতে চান তাকে বিভিন্নভাবে বাধা দেওয়া হয়। পিএইচডি ছাড়াও বর্তমানে সারাবিশ্বে আন্ডার গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ নিয়ে অনেক কাজ হচ্ছে, আমাদেরকেও সঠিক নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে স্নাতক পর্যায়ে গবেষণা কার্যক্রম চালু করতে হবে। গবেষণার পরিবেশ তৈরিতে ‘কোলাবোরেটিভ অ্যাপ্রোচ’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেই বললেই চলে। মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিসার্চের ক্ষেত্রে একজন গবেষক, বিভাগ বা প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতি, অবকাঠামো অন্যের সঙ্গে শেয়ার করার মাধ্যমে পর্যাপ্ত গবেষণা করা সম্ভব। তাই গবেষণার পর্যাপ্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
অনেকেই রাজনীতিকে গবেষণা না হওয়ার জন্য দায়ী করেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত মাত্রায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া, রাজনীতি করে শিক্ষকদের প্রমোশন পাওয়া, পর্যাপ্ত গবেষণা না করেও শুধু পলিটিক্স করে বড় বড় পদে নিয়োগ লাভ করা ইত্যাদি কারণে পর্যাপ্ত গবেষণা হয় না। যদিও অনেক ভালো গবেষক আছেন, যারা শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত; কিন্তু এটাও সত্য যে, পর্যাপ্ত গবেষণার জন্য যেহেতু পর্যাপ্ত সময় দেওয়া প্রয়োজন, তাই অতিমাত্রায় রাজনীতি করলে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না।
গবেষণা ফান্ড ও গবেষণা অবকাঠামোর অপ্রতুলতাও পর্যাপ্ত গবেষণা না হওয়ার অন্যতম কারণ। অনেকেই বলে থাকেন, টাকা নেই তাই পর্যাপ্ত গবেষণা হয় না। আবার যে ফান্ড আছে তা মেধাবী ও ডেডিকেটেড গবেষকরা আবেদন করেও পান না, বরং লবিং করে অন্যরা পেয়ে যান। এটা সত্য যে, রকেট সায়েন্স করার জন্য কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা প্রয়োজন, কিন্তু ফান্ডের অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা হয় না, আমি ব্যক্তিগতভাবে তা মনে করি না। গবেষণায় আগ্রহ ও বাধ্যবাধকতা থাকলে ছোট ও মাঝারি মানের যে গবেষণা ফান্ড আছে, তা কাজে লাগানো যেতে পারে। অনেকেই এসব গবেষণায় অনুদান নিয়ে থাকেন কিন্তু বাধ্যবাধকতা না থাকায় ভালোমানের প্রকাশনা করেন না।
গবেষকদের গবেষণায় আগ্রহী করা এবং গবেষণার ফলাফল ভালো মানের জার্নালে প্রকাশের বাধ্যবাধকতার এক অনন্য নজির স্থাপন করতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শতবর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে গবেষণা, বই ছাপানো ও জার্নাল প্রকাশের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক শিক্ষকদের মধ্যে অনুদান প্রদানের কার্যক্রম চলছে। গবেষণা অনুদান হিসেবে এক বছরের জন্য সর্বোচ্চ দশ লাখ টাকা প্রতিযোগিতামূলকভাবে দেওয়া হবে। কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্ত সত্যিকারের গবেষকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। অনুদান নীতিমালার যে দিকটি সবচেয়ে বেশি গবেষণাবান্ধব মনে হয়েছে, তা হচ্ছে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে ফলাফল থেকে দুটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করতে হবে। যার অন্তত একটি আন্তর্জাতিক ইনডেক্সড জার্নালে হতে হবে এবং অন্যটি অনুষদ জার্নালে হতে হবে। এ সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত গবেষণার দ্বার উন্মোচিত হবে।
আমি আশাবাদী এই ভেবে যে, আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণা করি, তারা একদিন ঠিকই ‘গবেষণায় অনীহা’র সঠিক কারণগুলো চিহ্নিত করতে পারব এবং তা দূরীকরণে কার্যকর ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভিশন-২০৪১ অর্জন করে বাংলাদেশকে ‘বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা’ হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হবো।
অধ্যাপক ও গবেষক, মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষাবার্তা/ বিআ
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
