আসুন মানবিক হই, বাড়িয়ে দেই ভালোবাসার হাত শামীমা আক্তার

‘তোমার পৃথিবী রঙিন ভীষণ, রঙিন তোমার দৃষ্টি/ আমার পৃথিবী বিষাদে ভরা গুমরে কাঁদে মন খারাপের বৃষ্টি’। কেমন আছ? এ প্রশ্নটি ইদানীং ইচ্ছে করেই এড়িয়ে চলে সুতপা। মিথ্যে করে বলতে ইচ্ছে করে না ভালো আছি। আর কত! সুতপা আর ভাবতে পারে না। সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। সুতপা নিজেই টের পাচ্ছে সে চরম বিষণ্নতার ভেতরে আছে। রাহুর মতো ক্রমাগত গ্রাস করছে সুতপাকে বিষণ্নতা। কিন্ত এমন তো হবার কথা ছিল না। ভাইয়ের সংসারে মনচাপা কষ্টে বেড়ে উঠা সুতপার একটাই স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া করে শিক্ষিত হয়ে যার ঘরে যাবে তখন পুষিয়ে নিবে শৈশব, কৈশোরের অতৃপ্ত কষ্টগুলো। কিন্তু বিধি বাম।এমনই এক কাটখোট্টা মানুষ তার জীবনসঙ্গী হলো যে রোমান্টিকতার ছিটেফোটাও নেই সেই মানুষটির মাঝে। সুতপার মতো এমন অনেকের জীবনই স্বপ্নভঙ্গের কষ্টে গাঁথা জীবন। কিন্তু মুখ খুলে না সুতপারা। সমাজবিধি, পারিপার্শ্বিকতা আর চক্ষুলজ্জার কারণে। আমরা অনেক সময় মন খারাপ হলেই সেটাকে বিষণ্নতা ভেবে বসি। আসলে আমার, আপনার, আমাদের সবারই মন খারাপ হয়। এই অসংখ্য মন খারাপ ক্রমাগত পুঞ্জীভূত হতে হতে পাহাড়ের ধারে পড়ে থাকা শক্ত পাথরে পরিণত হয়ে কখন যে তা বিষণ্নতায় পরিণত হয় তা আমরা টেরই পাই না। অথবা টের পেলেও যেখানে সেই কষ্ট মূল্যায়ন করে সযতনে ভালোবেসে কেউ হাত বাড়াবে না ভেবে চুপসে যাই আমরা। এই ক্রমাগত অবহেলিত হলেই এক সময় কারো মাথায় আত্মহত্যার চিন্তা ভর করে মাথায়।
আবার কোন শিশু আছে, যার মা- বাবা দুজনই কর্মজীবী। সে বড় হতে থাকে বাসার হেল্পিং হ্যান্ড এর কাছে। এমনকি স্কুল থেকে ফেরার সময়ও সে তার মা- বাবাকে পায় না। অপেক্ষা করে অফিস থেকে ফিরলে দুজনের কাছে স্কুলের মজার ফুলঝুরি নিয়ে বসবে। কিন্ত দেখা গেল মা-বাবা এতটাই ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরছে যে, তাঁদের মনে এটা একেবারেই কাজ করে না বাচ্চাটিকে স্নেহ- ভালোবাসা দিয়ে একটু সময় দিতে হবে। শুধু অর্থ দিয়েই সব দায়িত্ব পালন হয়ে যায় না। এভাবে প্রতিদিন আশাহত এই শিশুটির মনে চরম একাকীত্ব তৈরি হয়। এমনকি শিশুটি কৈশোরে এসে বিপথগামীও হয়ে যায়। তখন আর তার মা- বাবার সান্নিধ্য ভালো লাগে না। মা- বাবা যখন বুঝতে পারে তখন হয়তোবা আর করার কিছুই থাকে না। আবার অনেক সময় কর্মক্ষেত্রে দেখা যায়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারে কিছু কাজের ক্ষেত্রে সুতপাই পারদর্শী। সুতপাই পারবে এ কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে। কারণ সুতপা যে কাজটি করে তা একান্ত নিজের ভেবে অত্যন্ত যত্নের সাথে কাজটি শেষ করে। তখন সুতপা তার সহকর্মীদের কাছে ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সে যতই স্বাভাবিকভাবে মিলেমিশে যেতে চায়, কিন্ত সহকর্মীরা মন থেকে তাকে অত সহজে আলিঙ্গন করে মেনে নেয় না।
এমনও নয় যে, সুতপা এমন সুষ্ঠু কাজের জন্য বসের কাছ থেকে আলাদা কোন সুবিধা পাচ্ছে তাও কিন্তু নয়। সুতপার প্রতি বসের মনে কোন আলাদা ক্ষেত্রও তৈরি হয়নি। শুধু কাজের স্বার্থে ব্যবহৃত হয় সুতপা। সেখানে কোনো সম্মান, স্নেহ ভালোবাসার চুল পরিমাণ স্থান নেই। কিন্তু সুতপা তো মহামানব নয়। কাজের স্বীকৃতি কে না চায়। সেটাও পাচ্ছে না, অন্যদিকে সহকর্মীদের রূঢ় আচরণ প্রচণ্ডভাবে বিষণ্নতায় ভোগায় সুতপাকে।
ঘরে এসেও আবার হাসিমুখে সব সামলাতে হয় সুতপাকে। ছেলেমেয়েরা খুব খুশি মায়ের হাসিমাখা মুখ দেখে এবং চাহিদা অনুযায়ী সব প্রাপ্তিতে। আত্মীয়- স্বজন, বন্ধু – বান্ধব সবার কাছেই সুতপা খুব ভালোবাসার মানুষ। সুতপা প্রতিনিয়ত অভিনয় করে যাচ্ছে। এভাবে অভিনয় করতে করতে এখন ক্লান্ত,পরিশ্রান্ত জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া এক সৈনিক সুতপা। সুতপা জীবন সায়াহ্নে এসে ভাবছে, আমি শুধুই সবার প্রয়োজন মেটানোর জন্য। আমার কথা শুনার মত কেউ নেই পৃথিবীতে। একটি হাত সুতপার মাথায় রেখে বলার কেউ নেই ‘চিন্তা করো না, আমি আছিতো’ ছেলেমেয়েরাও যার যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। বন্ধুদের কাছেও কিছু শেয়ার করেনা সুতপা। কারণ সুতপার অবচেতন মন বুঝে ফেলেছে দু একজন বন্ধু ছাড়া আড়ালে আবডালে খুশিই হবে শুনে। সবার সাথে ক্রমাগত দূরত্ব বাড়ছে সুতপার। আঁধারে ডুবে যাচ্ছে সুতপা। চরম একাকীত্বের মাঝে আমার আমিকে খুঁজে ফিরে সুতপা আজকাল। একলা রাতের নির্জনতার কষ্ট ঝরে পড়ে নরম বালিশের তুলোয়। এক পৃথিবী ক্লান্তি, সাগরসমান একাকীত্ব সুতপাকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। জমাটবাধা বিষণ্নতা সুতপাকে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত করছে। তাই আসুন, আমরা মানবিক হই। সুতপাদের পাশে দাঁড়িয়ে ভালোবাসার হাতটি বাড়িয়ে দেই। তাহলে সুতপাও আমার ফিরে পাবে মনোবল। আলোর পথ খুঁজে পাবে। আমরা এমন বোধ যেন সুতপার মনে জাগাতে পারি, সুতপা বলবে যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল রে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইডেন মহিলা কলেজ।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.