কাজী আবু মোহাম্মদ খালেদ নিজাম।।
বিশ্বজুড়ে চলছে করোনার তাণ্ডব। ক্রমশ বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুের হার। এরই মাঝে ঢাকার রিজেন্ট হাসপাতাল এই করোনার সুযোগ নিয়েই বড় ধরণের জালিয়াতি ঘটিয়েছে। করোনা টেস্টের রিপোর্টে প্রতারণা করে হাতিয়ে নিযেছে বড় অংকের টাকা। শেষমেষ ধরা পড়েছে তাদের এই প্রতারণা। কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে ইতিমধ্যে। যদিও এখনো গ্রেফতার হয়নি রিজেন্টের মালিক শাহেদ। সিলগালা করা হয়েছে তার হাসপাতালটিকে।
প্রতারণার এই খবর সুদুর ইতালির গণমাধ্যমে এসেছে। কারণ, প্রতারণার (করোনার রিপোর্ট জালিয়াতি) শিকার হয়ে এই ইতালী থেকেই একই ফ্লাইটে ফেরত আসতে হয় ১৪৭ বাংলাদেশীকে। এর আগে মিঠু সিন্ডিকেটের মাস্ক ব্যবসার জালিয়াতিও ধরা পড়ে। এভাবে প্রকাশ্যে, আড়ালে-আবডালে চলছে নানা কিসিমের অপরাধ।
প্রশাসনের হাতে ধরা পড়ার আগে এসবের টিকিটিও কেউ জানতে পারেনা। এমনই দুর্ধর্ষ এরা! এভাবে ঘটনা ঘটছে। ঘটনার পর সারাদেশে এগুলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ঠেকে। কিছুদিন যাওয়ার পর নীরবতা নেমে আসে। আবার আরেকটি অপরাধ। বাদ নেই নৃশংসতা, পাশবিকতাও। থামছেইনা অপরাধ। ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে অনেক অপরাধী। ধরা পড়লেও নানা চাপের মুখে থাকতে হয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। অথবা, সঠিক বিচার পাওয়া নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে সংশয়ে থাকতে হয় নিয়ত। থাকতে হয় নিরাপত্তা শংকায়।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হল, অপরাধীর অপরাধকে প্রত্যক্ষ করেও কিছু মানুষের প্রতিবাদ করার সুযোগ এবং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তাদের নিরবতা দেখে। প্রতিবাদের সাহস কি লোপ পেয়েছে নাকি ধৈর্য্যের সক্ষমতা অর্জন হয়েছে ! মানা যায় ?
প্রতারণা, জালিয়াতিসহ নানা অপরাধের ঘটনাগুলো বাড়ছে। বেপরোয়া হয়ে উঠেছে অপরাধীরা। পত্রিকার পাতায় এদের ক্যারিশমাটিক (!) অপরাধের ধরণ ও কৌশল দেখে চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠে। এসব অপরাধের খবর যখন পড়ি তখন গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। শংকিত হয়ে পড়ি। দিন দিন কেন জানি মানুষ অধঃপতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে।এর আগেও মানুষ দেখেছে উন্মত্ততার সাথে উল্লাস আর যন্ত্রণায় কাতর মানুষটিকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে ভিডিও এবং সেলফি তোলা! দেখেছে রাস্তায় প্রকাশ্যে মানুষ হত্যার লোমহর্ষক দৃশ্য। এসব ভাবাচ্ছে সব সচেতন মানুষকে।
নৈতিকতা, সভ্যতা, আন্তরিকতা, ভালোবাসা,
সহমর্মিতা, মানবিক মূল্যবোধ ইত্যাদি গুণ
হারিয়ে যেতে বসেছে। সেখানে জেঁকে বসেছে হিংস্রতা, পাশবিকতা, অনৈতিকতা সহ আর সব খারাপ বৈশিষ্ট্য।
কবে হবে এসবের অবসান তা যেন জানা নেই কারো। কখন মানুষ এসব প্রতারকদের হাত থেকে রক্ষা পাবে, নিরাপদ ও শান্তিতে ঘুমোবে বলা মুশকিল।
‘অপরাধী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাবে,
মানুষ মনুষ্যত্ব ফিরে পাবে’ – এ আশায় দিন গুনে নিরীহ ও অসহায় মানুষগুলো। কেন এই অপরাধ তার মূলে পৌঁছতে হবে। অপরাধ প্রতিরোধ কিংবা সমূলে নির্মূলে কী সল্যুশন বা পন্থা থাকতে পারে তা বের করতে হবে। কেননা বেড়ে চলা এই অপরাধ রোধ করতে না পারলে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের। সমাজ ও রাষ্ট্রের কিংবা রাজনৈতিক সব নেতৃত্বকে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে হবে। দায় এড়াতে পারেন না কেউ।
রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে অনেক সময় বড় অপরাধীও পার পেয়ে যেতে পারে অনায়াসে।
কেন এই অস্থিরতা? আমরা কি পারি না আমাদের এই দেশটাকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে? অপরাধ থেকে উত্তরণে কিছু পদক্ষেপ নেয়া যায়- মানুষের মাঝে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ক্লাব, সামাজিক সংগঠনকে কাজে লাগানো যেতে পারে। বেকার সমস্যা সমাধানে দ্রুততর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
পাঠ্যপুস্তকে চরিত্র গঠন উপযোগী পাঠ সংযুক্তকরণ। নাটক, সিনেমা ইত্যাদিতে সামাজিক ও নানা বাস্তব ঘটনাকে তুলে ধরা এবং সমাধানের উপায় বের করা। অপরাধীকে রাজনৈতিক প্রশ্রয় না দেওয়া, প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে দেওয়া, বিচার প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করা ও মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়া নিশ্চিত করা, শিশু ও নারীর নিরাপত্তা বিধান করা ইত্যাদি।
যুবসমাজকে মাদক ও যাবতীয় নেশা থেকে দূরে রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া, তথ্য প্রযুক্তিকে অপরাধ নির্মূলে কাজে লাগানো সহ আরো যা যা করা যায় তা করা। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হোক অপরাধীর। গড়ে ওঠুক অপরাধ মুক্ত একটি বাংলাদেশ-এই প্রত্যাশা রইল।
লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
