আনিস মালিক :
শুরুতে রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা একটি প্রবাদ বাক্য দিয়েই বলি, “মানুষতো সবার ঘরেই জন্মায়, কিন্তু মানুষত্ত্ব সবার ঘরে জন্মায় না”। সত্যিই দেশে আজ সব ঘরে ঘরে মানুষ আছে তবে সবার মধ্যে মানুষত্বের যে গুন, বোধ, শক্তি ও সাহস থাকা দরকার তা আমাদের মধ্যে নেই। আমরা আজ প্রত্যেকে নিজস্ব স্বার্থবাদী চেতনা বহন করি; কিন্তু ভাবছি না এতে সমাজের অন্য মানুষগুলো কখনো সামান্য কিংবা ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
আমরা দৈনন্দিন এমন কতগুলো কাজ করি যা দ্বারা নিঃসন্দেহে বোঝা যায় দিন দিন আমরা চরম দুর্নীতিবাজ ও স্বৈরাচার এক জাতিতে পরিনত হচ্ছি। রাস্তায় হাটছি তো যত্র তত্র থুথু ও নিশ্চিত স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কফ ফেলছি, দেয়ালে ঠেকিয়ে বা ডোবা নালার পাশে দাড়িয়ে, বসে মল-মুত্র ত্যাগ করছি। ফুটপাত ব্যবহার না করে রাস্তার চলন্ত বাহনের মধ্য দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছি। যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলছি। জনসম্মুখে বিড়ি সিগারেট ধরিয়ে নিকোটিন ছেড়ে প্রকাশ্যে বায়ুকে দুষিত করছি। সাধারন মানুষের কথা না ভেবে যানবাহনে ক্ষতিকর জ্বালানি ব্যবহার করছি। যত্রতত্র গাড়ির হর্ন বাজাচ্ছি এবং রাস্তাকে পার্কিং হিসেবে ব্যবহার করছি। এগুলো তো আমাদের ব্যক্তি অধিকার বা স্বাধীনতা নয়। বরং এসব কাজ থেকে বিরত থাকতে এ সংক্রান্ত দেশে বিদ্যমান আইন আছে যা একদমই মানছি না।
বাসা বাড়িতে যাদের গ্যাসের লাইন আছে তারা আরামছে গ্যাসের অপ্রয়োজনীয় অপব্যবহার করছি। বুঝতে চাইনা পৃথিবীতে জ্বালানী গ্যাসের কি পরিমান চাহিদা রয়েছে যার প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। আমরা ভাগ্যবান জাতি হিসেবে এর অবাধ ব্যবহার করলেও বিশ্বে প্রায় ৯০ কোটি লোক জ্বালানি ও খাদ্যের অভাবে মৃতু্যবরন করছে।
দৈনন্দিন জীবনে সুস্বাদু পানির কি পরিমান অপব্যবহার করি তা সকলেই জানি। বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে এমন একটি দেশ যেখানে খাবার পানি নুন্যতম মুল্যে পাওয়া যায় যা উন্নত বিশ্বে কল্পনাতীত। ইউনিসেফের ঘোষনা অনুযায়ী বিশ্বে আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে শুধু বিশুদ্ধ পানির অভাবে ৬০ কোটি শিশু মারা যাবে। সারা বছর পৃথিবীতে ৪৪ ভাগ মানুষ বিশুদ্ধ খাবার পানি থেকে বঞ্চিত। যে কারনে বহু লোক বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ব্যধিতে মারা যায়। এমনকি দেশে বর্তমানে সুস্বাদু পানি সহজলভ্যা হওয়ায় এবং গভীর নলকুপ ব্যবহার করায় পানির স্তর ৪ থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত নেমে গেছে। যদিও দেশে সরকারি হিসেবে ৮৭ ভাগ মানুষ সুস্বাদু বা নিরাপদ পানির ব্যবহার করে কিন্তু ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে তা ৫৬ শতাংশ। পানি ব্যববহারে মিতব্যয়ী না হলে অচিরেই শতভাগ মানুষকে নদী ও পুকুরের পানি পান করা লাগবে।
এবার বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠনের দিকে তাকাই। যেখানে তাদের সাংগঠনিক আইন কানুন রয়েছে গনতান্ত্রিক পন্থায় নেতা নির্বাচন করা। কিন্তু সেখানে কোন গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই অনুসরন করা হয় না বরং জোর, প্রভাব ও অর্থ ও পেশী শক্তির ঝনঝনানি যার পদ পদবীও তার এই নীতির অনুসরন অবিরত। হোক সে সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল, কেন্দ্র অথবা তৃনমুল পর্যায়। এমনকি পাড়ায় মহললার স্থানীয় পর্যায়ের ক্লাব, পাঠাগার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে এনজিও গুলো পর্যন্ত একই অবস্থা। অথচ এসব চলে সাধারন জনগনের শ্রম, চেষ্টা ও অর্থে। নামে জনসাধারন ও জনকলানের কিন্তু বাস্তবে সংগঠনে তাদের কোন অধিকার বা ভূমিকা নেই।
এছাড়াও পড়শিকে ডিস্টার্ব করে জোড়ে গান শোনা, শীষ দেয়া, চিৎকার চেচামেচি করা, উচ্চ শব্দে মিছিল মিটিং করা; পাশের বিল্ডিং বা ঘর ঠেকিয়ে বাড়ি করে ছাদের পানি প্রতিবেশীর বাড়িতে ফেলা, আপন স্বার্থে ভয় ভীতি প্রদর্শন, যে কোন জনবহুল কাজের মধ্যে সিরিয়াল না মানা, ব্যক্তি ক্ষমতার অপব্যবহার, ডাক্তারের পরামর্শ অথবা ব্যবস্থা পত্র ছাড়া ঔষধ পথ্যাদির অবাধ কেনা বেচা, প্রয়োজনের তুলনায় নিত্যপন্যের অতিরিক্ত ক্রয়-বিক্রয়, সামাজিক, নৈতিক, ধর্মীয় ও প্রযুক্তিগত সমন্বিত শিক্ষাগ্রহন না করা, সবার সাথে বিনিত ব্যবহার না করা, পিতা মাতাসহ আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীর হক বা অধিকার থেকে বঞ্চিত করা এমনকি চরম স্বার্থপরের মত নিজস্ব আমিত্ত্ব প্রকাশ; এগুলি সবই ব্যক্তি দুর্নীতির অংশ। একটি সুষ্ঠ ও সুন্দর গনতান্ত্রিক স্বাধীন দেশে এসব করার অধিকার আমাদের কারো নেই। এ গুলোই মানুষের মধ্যে মানুষত্বের পরিচয়ের বাহক।
ইউরোপ, আমেরিকা বা ওশেনিয়া কিংবা মধ্য এশিয়া অঞ্চলের বিভিন্ন উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখতে পাই যে, সেখানে উপরোল্ল্যিখিত ব্যক্তি দুর্নীতির কোন সুযোগ নেই। বরং তাদের প্রত্যকে নাগরিকই দেশীয় আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং নির্ভার নিজেদের পেশাদার আচরনে। তাহলে, যেখানে আমরা প্রত্যেকেই ব্যক্তি জীবনে এত এত দুর্নীতিগ্রস্ত,সমাজ তথা রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধন করি সেখানে অন্যের দুর্নীতির প্রতিবাদ কিভাবে করব? আসলে, তখন প্রতিবাদী হতে আমাদের আত্মা থঁর থঁর করে কেঁপে ওঠে। উল্লেখিত কর্ম ছাড়াও আরো অনেক কাজ আমরা প্রতিদিন করি যা রাষ্ট্রীয় দুর্নীতিগ্রস্তদের প্রতি ধিক্কার বা প্রতিবাদের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক। তাইতো আমরা আজ মানব সভ্যতার যুগে এসেও নৈতিক প্রস্থানের কারনে ভয়ে ভীত সম্ভ্রস্থ। কেননা নিজ বা ব্যক্তি দুর্নীতি বন্ধ না করে রাষ্ট্র তুষ্ট দুর্নীতিগ্রস্তদের প্রতিবাদ করা সম্ভবপর নয়। সভ্যতার যুগে এসে প্রতিটি ব্যক্তিরই মানুষত্বের পরিচয় প্রদান ছাড়া এটা ভাবাও অমুলক, অর্বাচীন।
লেখক; সাংবাদিক
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
