নিউজ ডেস্ক।।




দালানকোঠা কিংবা টিনশেডের ছাউনি-বেড়া, কোনো কিছুই নেই। ওপরে খোলা আকাশ। নিচে রাস্তার পাশে পথচারীদের হাঁটাচলার ফুটপাথ। রাজধানীর কারওয়ান বাজার সার্কফোয়ারার দক্ষিণ পাশের সেই ফুটপাথের ‘স্কুলে’ চলছে অন্তত অর্ধশত অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুর লেখাপড়া। ফিউচার ন্যাশন ফাউন্ডেশন (এফএনএফ) স্কুল নামে ফুটপাথের এ পাঠশালায় বড় হওয়ার রঙিন স্বপ্ন বুনছে অবহেলিত এসব শিশু শিক্ষার্থী।




তাদের এই স্বপ্নপূরণে যিনি নিজের সবটুকু উজাড় করে দিচ্ছেন তিনি হলেনÑ জাহিদুর রহমান ওরফে জাহিদ সকাল। শুক্রবার সন্ধ্যায় সরেজমিনে ফুটপাথে ‘জাহিদ স্যারের পাঠশালায়’ গিয়ে দেখা যায় প্রায় অর্ধশত শিশুকে লেখাপড়ায় মগ্ন থাকতে। ওদের কারও কারও মা-বাবা কেউই নেই।




কারও কেবল মা আছেন। বাবা কারও থেকেও নেই। মা কিংবা বাবা হয়তো দিনমজুর কিংবা গৃহকর্মী বা ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন চালাচ্ছেন। থাকছেন আশপাশের বস্তিতে বা ফুটপাথে ভাসমান হিসেবে। কথা বলতে গিয়ে জানা যায় প্রায় পাঁচ বছর ধরেই নিয়মিত সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত জাহিদ সকাল এবং তার বন্ধু-সহযোগীরা গুরুত্বপূর্ণ সময় ব্যয় করে এসব অসহায় বাচ্চাদের লেখাপড়া শেখাচ্ছেন।




নিজের ও পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সহযোগিতায় জাহিদ এসব শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য পোশাক, বইখাতা, স্কুলব্যাগ কিনে দেওয়া থেকে শুরু করে তাদের সুস্থতার দিকেও খেয়াল রাখেন। সে কারণে ওইসব বাচ্চাদের হতদরিদ্র অভিভাবকরাও জাহিদের ফুটপাথের পাঠশালায় তাদের বাচ্চাদের নিয়মিত লেখাপড়া করাচ্ছেন। মাঝেমধ্যেই জাহিদ এসব শিশুর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে থাকেন।




বৃষ্টি বা রাস্তায় কাদা হলেও সুযোগ থাকলে পাঠদান বন্ধ থাকে না। বাচ্চারাও বৈরী আবহাওয়াতে হাজির হয়ে যায়। এমনকি ঈদের দিনেও এসব শিশু-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সময় কাটান জাহিদ সকাল। এফএনএফ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা জাহিদুর রহমান ওরফে জাহিদ সকাল সময়ের আলোকে বলেন, এফএনএফ স্কুল নামকরণে এ পাঠশালাটি তিনি পাঁচ বছর ধরে পরিচালিত করছেন। শিশুশ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে তার এ পাঠশালায়। শিক্ষা অধিদফতর থেকে পাঠদানের অনুমোদন নিয়ে এ মহতী কাজটি শুরু করেন। ইতোমধ্যে স্কুলকোডের জন্য আবেদন করেছেন, শিগগিরই পেয়ে যাবেন বলেও আশা করছেন।




তিনি জানান, পাঁচ বছর ধরে নিজের ও বড় বোন রহিমা বেগমের আর্থিক জোগানে এবং দশজন স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষকদের আন্তরিক সহযোগিতায় বাচ্চাদের পাঠদান করিয়ে যাচ্ছেন।




পাশাপাশি বাচ্চাদের পারিবারিক সমস্যা বা বিপদ-আপদে পাশে থাকেন তিনি। তার এ পাঠদানে স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক হিসেবে রয়েছেন তার স্ত্রী ফাহিমা আফরিন, বন্ধু জসিম উদ্দিন, মঈন উদ্দিন, শাহীন, বিপ্লব, তুহিন, মাজহারুল হক মাজু, সবুজ রানা, সুজয় তালুকদার ও আরিফ হোসেন ফাগুন। শুক্রবার কথা হয় প্রথম শ্রেণির ছাত্র মো. ইউনুসের সঙ্গে।




সে জানায়, তার বাবা মারা গেছেন। মা রুবি মানসিকভাবে অসুস্থ। মা মানুষের বাসা থেকে খাবার চেয়ে এনে নিজে ও ছেলেকে খাওয়ান। অসহায় এ শিশুটির পাশে দাঁড়ানোর মতো আর কেউ নেই। কেবল এ স্কুলটিই তার মায়ের ভরসা। দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী শিমা আক্তারের মা পারভীন কাঁঠালবাগান বক্সকার্লভাট এলাকায় পিঠা বিক্রি করেন। বাবা মোতালেব দীর্ঘদিন কোনো খোঁজখবর রাখেন না।




শিমা জানায়, এখানে খোলা আকাশের নিচে ফুটপাথে হলেও পড়াশোনা করতে বেশ ভালোই লাগে তার। বড় হয়ে লেখাপড়া শিখে সে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কথা হয় শিশু-শিক্ষার্থী রেজাউল ইসলাম রেজার সঙ্গে। তাকে ইংলিশে নানা প্রশ্ন করা হলে সে খুব সাবলীলভাবেই ইংরেজিতে জবাব দিচ্ছিল। এ সময় মোস্তাকিন নামে দ্বিতীয় শ্রেণির এক ছাত্রের মা মঞ্জু বেগমও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।




তিনি বলেন, অভাবের সংসারে বাচ্চাদের ভালো স্কুলে পড়াতে পারি না। বস্তিতে থাকি। এ ফুটপাথের স্কুলে পড়লেও বাচ্চারা খুব আনন্দ ও আগ্রহ নিয়ে পড়ছে।




শিক্ষকরাও খুব যত্ম করে স্বেচ্ছায় পড়াচ্ছেন। তাই ছেলেটা (মোস্তাকিন) ঠিকমতো পড়ছে নাকি দুষ্টুমি করছে তা দেখতে মাঝেমধ্যে এখানে আসি।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
