পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে বিশেষ উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলার কারণে যানজট ও দুর্ঘটনা দুটোই ঘটছে। পুরনো ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল আজও বন্ধ হয়নি। যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা বন্ধ না হওয়ায় সড়কে যানজট বাড়ে। একই কারণে দুর্ঘটনাও ঘটে। আছে অতিরিক্ত গতি ও ওভারটেক প্রবণতা। বেতনের পরিবর্তে চালক-হেল্পারদের চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালনা, মানসম্মত গাড়ির অভাবে ব্যক্তিগত গাড়ির আধিক্য বহুদিন ধরে। ব্যস্ততম সড়কে যততত্র কাউন্টার এবং দূরপাল্লার রুটে চালকদের বিশ্রামাগার না থাকাও পুরনো সমস্যা। পরিবহন খাতের এসব সমস্যা সরকারের উচ্চপর্যায়ে সম্প্রতি বৈঠক হয়েছে। সেখানে এসব সমস্যার সমাধানে তিন ধাপে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি এসব পদক্ষেপ পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। এর মধ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নগরীর ব্যস্ততম সড়কে চলাচল গণপরিবহনের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শহরের বাইরে থেকে আসা বিভিন্ন লোক রাইডশেয়ারিং এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় ঝুঁকছে। এমনকি গণপরিবহনের কর্মীদের একটা অংশও বাড়তি আয়ের আশায় বাস ফেলে এটাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। দেশে দক্ষ চালকের অভাব। বিদ্যমান চালকরাও বাস চালানোয় অনাগ্রহী। কারণ আয় কম। অথচ ব্যাটারিচালিত রিকশা যানজট ও দুর্ঘটনাঝুঁকি দুটো বাড়িয়েছে। এমন চিন্তা থেকে চালকদের বিআরটিসি ও বিআরটিএর মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করার চেষ্টা করা হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্স ও স্মার্টকার্ড নিয়ে সাত বছর ধরে চলা হয়রানির বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রধান সড়কে ঝুঁকিপূর্ণ বাহন চলাচল বন্ধ করতে শিগগির কঠোর নির্দেশনা আসতে পারে।

বিআরটিএর কর্মকর্তারা জানান, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবেই বাসটার্মিনালসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে থাকা অবৈধ কাউন্টার উচ্ছেদ কার্যক্রম চলমান। সিটি করপোরেশন, ডিএমপি, বিআরটিএ, ডিটিসিএ ও পরিবহন মালিক সমিতি সব সংস্থা-সংগঠন মিলে পরিবহন খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে একযোগে কাজ করছে। পরিবহন খাতের আরেকটি অসুবিধা ব্যক্তিগত গাড়ির অতিরিক্ত ব্যবহার। মানসম্মত গণপরিবহন না থাকা এর বড় কারণ। তাই উন্নতমানের বাস আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়ার চিন্তা করেছে সরকার। এর পরের ধাপ হচ্ছে রুটভিত্তিক বাড়তি গাড়ির কোম্পানি কমানো। রুটভিত্তিক একক বাস কোম্পানি চালুর চিন্তা করা হয়েছে। এতে করে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে। তা ছাড়া স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে চালকসহ পরিবহকর্মীদের চুক্তিভিত্তিক বেতন প্রথা। তাদের মাসিক বেতন দেওয়া নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলায় পুলিশের চাঁদাবাজির প্রসঙ্গটিও গুরুত্ব পেয়েছে। কতিপয় পুলিশ সদস্যের কারণে গোটা বাহিনীর বদনাম শক্ত হাতে দমন করার কথা।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন হাজার বাস ঢাকার রাস্তায় চলাচল করে। এই নগরে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য বাস রয়েছে মাত্র ৩০টি। উচ্চ চাহিদা থাকায় এখানে বেশি বিনিয়োগ হওয়ার কথা। কিন্তু রুট পারমিট পেতে অপ্রাতিষ্ঠানিক চাঁদা, আবেদনকারীর রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সম্পর্ক, তদবির প্রভৃতি যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়। এসব বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান সরকার গণপরিবহন খাতে জোর দিয়েছে। বাস রুটের অনুমতি দেয় ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে ২০ সদস্যবিশিষ্ট আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি (আরটিসি)। কমিটিতে সরকার এবং পরিবহন মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধি থাকলেও নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব নেই। অনুমতির আগে মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা হয় অনুমানের ভিত্তিতে। এ ক্ষেত্রে কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ না করায় একই রুটে বিভিন্ন কোম্পানির বাস যুগপৎভাবে চলাচল করে। ফলে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ভাড়া আদায়ের বিদ্যমান পদ্ধতিও রাস্তায় বিশৃঙ্খলার জন্য বহুলাংশে দায়ী।

সরকার পরিবহন খাতকে সামনে রেখে আসন্ন বাজেটে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। বিশেষ করে গণপরিবহনে সর্বোচ্চ সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি নতুন যানবাহন রাস্তায় নামাতে শুল্ক ও করকাঠামোয় সমন্বয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। রাস্তায় নতুন গাড়ি এবং গণপরিবহনে জ্বালানির সাশ্রয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপ হিসেবে শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক স্কুলবাস আমদানিতে শুল্ক শূন্যে নামানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। আসন্ন জাতীয় বাজেটের জন্য অপেক্ষা না করেই এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম বলেন, গণপরিবহন খাতে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা দূর করে শৃঙ্খলা ফেরাতে ফ্র্যাঞ্চাইজি ভিত্তিক ব্যবস্থায় যাওয়ার বিকল্প নেই। নির্দিষ্ট রুটে নির্দিষ্ট সংখ্যক বাস, প্রশিক্ষিত চালক এবং সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি কোম্পানির অধীনে সেবা পরিচালনা করতে হবে। পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলট) একটি রুটে ২০০ থেকে ৫০০ বাস নিয়ে এ ধরনের সেবা চালু করা সম্ভব। এতে যাত্রীরা নির্দিষ্ট স্টপেজে সারিবদ্ধভাবে ওঠানামা করবে, ই-টিকিটিং চালু হবে এবং যানজট কমবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকায় যাত্রী ওঠানামার স্থান সব সড়কে সুনির্দিষ্ট করা নেই বা থাকলেও তা কার্যকর নেই। গণপরিবহনের ব্যবস্থাপনার উন্নতি করতে রুট পারমিটের প্রক্রিয়া সংস্কার করা, দক্ষ ও পেশাদার চালক তৈরির পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা; টিকিট কাউন্টার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন ও অনলাইন টিকিটের ব্যবস্থা প্রবর্তন; বিআরটিএকে শক্তিশালী করে গাড়ির মান যাচাই এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির ব্যবস্থা করা; ভালো কোম্পানিকে এ খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা এবং ট্রাফিক আইন মানতে ব্যাপক প্রচারণা চালানোয় জোর দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষাবার্তা /এ/ ১১/০৪/২০২৬

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.