এইমাত্র পাওয়া

বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন পাওয়া কীভাবে সুখনর হয়?

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

সকালে ঘুম থেকে উঠে রহিম স্যার আয়নার সামনে দাঁড়ালেন। চোখের নিচে কালি, চুলে অকাল পাকা, তবু মুখে এক অদ্ভুত হাসি। স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন,
—“আজ এত খুশি কেন?”
স্যার গম্ভীর গলায় বললেন,
—“আজ বড় সুখবর!”

স্ত্রী দৌড়ে এলেন, মনে মনে ভাবলেন—হয়তো বেতন বেড়েছে, কিংবা পদোন্নতি হয়েছে।
—“কি হয়েছে?”
স্যার বুক ফুলিয়ে বললেন,
—“এই মাসের বেতনটা দিয়েছে!”
স্ত্রী থমকে গেলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—“এটা তো তোমার অধিকার…”
স্যার হেসে উঠলেন,
—“না, এটা অধিকার না, এটা সুখবর! পত্রিকায় দেখো—‘শিক্ষকদের জন্য সুখবর: বেতন প্রদান শুরু!’”
পাশের ঘরে বসে থাকা তাদের ছোট ছেলে প্রশ্ন করল,
—“বাবা, তাহলে বেতন না দিলে সেটা কি?”
স্যার একটু থেমে বললেন,
—“ওটা খবরই হয় না বাবা…”

এই ছোট্ট গল্পটা হাসির, কিন্তু হাসির ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা—একজন বেসরকারি শিক্ষক আজ এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে, যেখানে তার ন্যায্য প্রাপ্যও “সুখবর” হয়ে যায়।

সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়—“বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হয়েছে”, “বৈশাখী ভাতা প্রদান”, “উৎসব ভাতা ছাড়”—এসব শিরোনাম। শব্দগুলো এমনভাবে সাজানো যেন কোনো বিশেষ অনুগ্রহ করা হয়েছে। অথচ প্রশ্নটা সহজ—একজন মানুষ সারা মাস কাজ করার পর বেতন পাবে, এটা কি কোনো দয়া, নাকি মৌলিক অধিকার?

রাষ্ট্রের অন্যান্য চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে বেতন পাওয়া কখনোই খবর হয় না। কেউ লিখে না—“সরকারি কর্মকর্তারা বেতন পেলেন, আনন্দে উদ্বেল!” কারণ এটা স্বাভাবিক। কিন্তু বেসরকারি শিক্ষকদের ক্ষেত্রে একই বিষয় হয়ে যায় “সুখবর”।

এখানেই মূল ব্যঙ্গ। এখানে শুধু শব্দের ব্যবহার নয়, দৃষ্টিভঙ্গির বিকৃতি কাজ করে। যেন শিক্ষকরা এমন এক শ্রেণি, যাদের প্রত্যাশা কম রাখতে হবে, আর সামান্য কিছু পেলেই তাদের কৃতজ্ঞ হয়ে থাকতে হবে।

চাকরির শুরুতে ১২,৫০০ টাকা—এই সংখ্যাটা শুনতে ছোট, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক বিশাল সংগ্রাম। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে এই টাকায় একজন মানুষের বেঁচে থাকাই কঠিন, পরিবার চালানো তো দূরের কথা।

একটা হিসাব করা যাক—
ভাড়া, খাবার, যাতায়াত, চিকিৎসা—এই চারটি মৌলিক খরচই একজন মানুষের আয়কে গিলে ফেলে। একজন শিক্ষক, যিনি অন্যকে মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেন, তিনি নিজেই প্রতিদিন বেঁচে থাকার লড়াইয়ে হেরে যান।
তবুও তাকে বলা হয়—
“ধৈর্য ধরুন”,
“সময় আসবে”,
“এটাও তো একটা সুযোগ!”
কিন্তু প্রশ্ন হলো—কতদিন?

শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শিক্ষকদের হাত ধরে। অথচ সেই শিক্ষকই আজ সবচেয়ে অবমূল্যায়িত।

যেখানে একজন শিক্ষককে তার প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হয় না, সেখানে শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। একজন শিক্ষক যদি নিজেই আর্থিক অনিশ্চয়তায় থাকেন, তবে তিনি কিভাবে মানসিকভাবে স্থির থেকে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলবেন? এখানে সমস্যা শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি মর্যাদারও সংকট।

সংবাদমাধ্যম সমাজের আয়না। কিন্তু সেই আয়নাতেই যদি বাস্তবতা বিকৃত হয়ে যায়, তাহলে মানুষ সত্যটা কোথায় দেখবে? যখন “বেতন দেওয়া” হয় “সুখবর”, তখন “কম বেতন” বা “অপর্যাপ্ত সুবিধা” আর আলোচনায় আসে না। বরং একটা ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়—সব ঠিক আছে, সব স্বাভাবিক।

সংবাদমাধ্যমের উচিত ছিল প্রশ্ন তোলা—
কেন একজন শিক্ষক ১২৫০০ টাকায় কাজ শুরু করেন? কেন তার বেতন বাড়ে না সময়মতো? কেন তার জীবনের নিরাপত্তা নেই? কিন্তু তার বদলে তারা শিরোনাম বানায়—“সুখবর”।
এ যেন বাস্তবতাকে আড়াল করার এক সূক্ষ্ম কৌশল।

বছরে একবার বৈশাখী ভাতা, দুইবার উৎসব ভাতা—এসব সুবিধা শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু এগুলো কি সত্যিই সমস্যার সমাধান?
না, এগুলো মূল সমস্যাকে ঢেকে রাখার জন্য এক ধরনের সাময়িক সান্ত্বনা।
যেখানে মাসিক বেতনই যথেষ্ট নয়, সেখানে বছরে এক-দুবার কিছু অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কি জীবনের মান বদলায়?
না, বদলায় না।
বরং এটা এমন এক অনুভূতি তৈরি করে—“যা আছে, তাই নিয়ে খুশি থাকুন।”

একজন বেসরকারি শিক্ষক শুধু আর্থিক নয়, মানসিক চাপেও ভোগেন।
তিনি জানেন—তার অবস্থার পরিবর্তন সহজ নয়।
তিনি প্রতিবাদ করতে ভয় পান—চাকরি হারানোর আশঙ্কায়। ফলে তিনি চুপ থাকেন। এই নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ, যখন একটি শ্রেণি দীর্ঘদিন নীরব থাকে, তখন তাদের কষ্ট স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অবকাঠামো গড়া নয়, মানুষ গড়া। আর সেই মানুষ গড়ার প্রধান কারিগর হচ্ছেন শিক্ষক। তাই শিক্ষকদের প্রতি ন্যায্যতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। ন্যূনতম বেতন, সময়মতো পরিশোধ, সামাজিক নিরাপত্তা—এসব কোনো বিলাসিতা নয়, বরং মৌলিক অধিকার। যদি একজন শিক্ষক তার জীবনের মৌলিক চাহিদাই পূরণ করতে না পারেন, তবে তিনি কিভাবে একটি উন্নত জাতি গঠনে ভূমিকা রাখবেন।

সমস্যার আরেকটি দিক হলো সামাজিক মানসিকতা। অনেকেই মনে করেন—শিক্ষকতা “সেবা”, তাই এখানে বেশি কিছু চাওয়া ঠিক নয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—শিক্ষকরাও মানুষ। তাদেরও পরিবার আছে, স্বপ্ন আছে, প্রয়োজন আছে। শিক্ষকতা সেবা হতে পারে, কিন্তু সেটা বিনিময়হীন নয়।

বেতন পাওয়া যদি সুখবর হয়, তবে সেটা আনন্দের নয়, বরং সতর্কবার্তা। এটা বলে দেয়—আমাদের সিস্টেমে কোথাও বড় সমস্যা আছে। রহিম স্যার আবার আয়নার সামনে দাঁড়ান।এ

ইবার তিনি হাসেন না।নিজেকে প্রশ্ন করেন—“ আমি কি সত্যিই একজন সম্মানিত পেশাজীবী, নাকি শুধু পরিসংখ্যানের একটি সংখ্যা?”

বাইরে তখন খবরের কাগজে বড় শিরোনাম “শিক্ষকদের জন্য সুখবর!”
স্যার ধীরে ধীরে কাগজটা ভাঁজ করে রেখে দেন।
কারণ তিনি জানেন—
এটা সুখবর নয়, এটা তার জীবনের নির্মম ব্যঙ্গ।

লেখা : শিক্ষক ও গবেষক। 

শিক্ষাবার্তা /এ/ ০৬/০৪/২০২৬

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.