এইমাত্র পাওয়া

অর্থনীতির বহুমুখী চাপের মধ্যেও সঞ্চয়পত্রে বাড়ছে বিনিয়োগ

নিউজ ডেস্ক।। 

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতির বহুমুখী চাপের মধ্যেও সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকছে মানুষ। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত জানুয়ারি মাসে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ এসেছে প্রায় ১ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই মাসে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের আসল পরিশোধের পরও এই টাকা ঋণ হিসেবে সরকারের কোষাগারে জমা হয়। তার আগের ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসই সঞ্চয়পত্রের নিট বিনিয়োগ ইতিবাচক ধারায় ছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংক খাতে আস্থাহীনতা এবং দীর্ঘদিন ধরে শেয়ারবাজারে মন্দার কারণে বিনিয়োগকারীরা এখন ঝুঁকিমুক্ত বিকল্প খুঁজছেন। সেই জায়গা থেকেই সঞ্চয়পত্র হয়ে উঠেছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। এ ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতিতেও অনেকে সঞ্চয়পত্রে টাকা খাটাচ্ছেন।

সঞ্চয়পত্র দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্ত মানুষের জন্য নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিক, গৃহিণী ও স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে এটি নিয়মিত আয়ের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস। তবে চলতি অর্থবছরের শুরুতে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদহার কিছুটা কমিয়ে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। অন্যদিকে সর্বশেষ ফেব্রুয়ারি মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ, যা গত কয়েক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে গত বছর মে মাসে এই হার ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে এটি ৯ শতাংশের নিচে থাকলেও গত এপ্রিলে ছিল ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং জুনে নেমে আসে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি ও সুদের হার কমার পরও সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ বাড়ছে।

জানা গেছে, কমানোর পরও সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের তুলনায় সঞ্চয়পত্রের সুদের হার এখনও বেশি। এ ছাড়া সুদের হার কিছুটা কমানো হলেও এ খাতে বিনিয়োগে কড়াকড়ি আগের চেয়ে শিথিল করা হয়েছে। যেমন, চলতি অর্থবছরে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্নের প্রমাণপত্র দাখিলের শর্ত শিথিল করেছে সরকার, আগে এই সীমা ছিল ৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া গত অর্থবছরের মাঝামাঝিতে এসে প্রতিষ্ঠান ব্যতীত ব্যক্তি পর্যায়ের সব সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে মেয়াদ শেষে পুনর্বিনিয়োগ

সুবিধা চালু করা হয়। ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকে মেয়াদি হিসাবের পুনর্বিনিয়োগ সুবিধা আবার চালু করা হয়। ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ডের বিনিয়োগসীমা প্রত্যাহার করা হয়। পেনশনার সঞ্চয়পত্রে মুনাফা তিন মাসের পরিবর্তে প্রতি মাসে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এসব সুবিধার কারণে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে ঝুঁকছেন অনেকে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের সঞ্চয়ের প্রবণতা কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি, বরং উল্টো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে মানুষ নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ মাধ্যম খুঁজছে। যাদের হাতে কিছু সঞ্চয় রয়েছে, তারা তা সঞ্চয়পত্রেই বিনিয়োগ করছেন। তিনি আরও বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিন ধরে শেয়ারবাজারে মন্দার কারণে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে বা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে বিকল্প হিসেবে সঞ্চয়পত্রই তাদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া তুলনামূলকভাবে সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার এখনও বেশি থাকায় বিনিয়োগকারীরা এই খাতকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন।

চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, সর্বশেষ জানুয়ারি মাসে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ এসেছে ১ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। আগের মাসে এসেছিল প্রায় ৩৮৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ এসেছে ৪ হাজার ৩১২ কোটি টাকা। অথচ গত অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক ধারায় ছিল প্রায় ৭ হাজার ১৩ কোটি টাকা। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকার নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে বিক্রিতে নেতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকায় সংশোধিত বাজেটে সেটি কমিয়ে ১৪ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। তারপরও পুরো অর্থবছরে নিট বিক্রি (বিনিয়োগ) ঋণাত্মক হয় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ সঞ্চয়পত্র কেনার চেয়ে ভাঙানোর প্রবণতা বেশি ছিল।

তথ্য পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, তার আগের দুই অর্থবছরেও সঞ্চয়পত্রের নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক ধারায় ছিল। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৮ হাজার কোটি টাকা। তবে বিক্রি ধারাবাহিক কমতে থাকায় সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৭ হাজার ৩১০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছিল। তবে পুরো অর্থবছরে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়েছিল প্রায় ২১ হাজার ১২৪ কোটি টাকা। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হওয়ার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা।

বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীনে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু রয়েছে। এগুলো হলোÑ পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। এর মধ্যে পরিবার সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফার হার এখন ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ। আর সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে এ মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ। পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে পঞ্চম বছর শেষে মুনাফা ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ। আর সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। আর সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ। এ ছাড়া তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এ মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.