নিজস্ব প্রতিবেদক।।
নতুন সরকারের সম্ভাব্য নীতিগত অগ্রাধিকারের আলোচনায় আবারও সামনে এসেছে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের প্রশ্ন। দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে আসা শিক্ষকরা এবার প্রত্যাশা করছেন—নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও রাজনৈতিক আশ্বাস বাস্তবে রূপ নেবে। তবে কেবল শিক্ষক নয়, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যেও এ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামত তৈরি হয়েছে।
শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের যুগ্ম-মহাসচিব এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান বলেন, “এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বছরের পর বছর ধরে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শিকার। একই পাঠদান, একই দায়িত্ব—কিন্তু সুযোগ-সুবিধায় বিস্তর পার্থক্য। জাতীয়করণ হলে শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, যা সরাসরি শিক্ষার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনের পরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের একটি প্রোগ্রামে বলেছেন, বিএনপি আবার সরকার গঠন করলে এমপিও শিক্ষাকে জাতীয়করণ করবো। বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিশ্রুতি বিএনপি সরকার বাস্তবায়ন করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
সায়েদুজ্জামান বলেন, সাবেক সফল শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলন আমাদের শিক্ষকদের বৈষম্য নিয়ে অনেক আলোচনা করেছেন। আমরা আশাকরি তিনি এবার শিক্ষামন্ত্রী হবেন। তিনি শিক্ষকদের দুঃখ দুর্দশা সম্পর্কে জানেন। আমরা আশাকরি ড. মিলন শিক্ষা মন্ত্রী হলে আমাদের ফের দাবি তুলতে হবেনা। তিনি বিএনপি সরকারের কাছে শিক্ষকদের বৈষম্য তুলে ধরে আমাদের প্রত্যাশার বাস্তবায়ন করবেন।” তিনি আরও বলেন, শুধু আশ্বাস নয়—এবার সময় এসেছে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণার।
শিক্ষক নেতা মো: জসিম উদ্দিন মনে করছেন, জাতীয়করণ হলে চাকরির স্থায়িত্ব, পেনশন ও চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত হবে। রাজধানীর একটি এমপিওভুক্ত কলেজের প্রভাষক জানান, “সরকারি শিক্ষকদের মতো কাঠামো পেলে আমরা আরও মনোযোগ দিয়ে পাঠদান করতে পারব। এখন অনিশ্চয়তা কাজ করে।” তবে কেউ কেউ সতর্ক করে বলেন, জাতীয়করণ প্রক্রিয়া যেন জটিল প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে পড়ে দীর্ঘসূত্রতায় না ভোগে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এ বিষয়ে কৌতূহল রয়েছে। একাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলে, “স্যার-ম্যাডামরা যদি মানসিকভাবে নিশ্চিন্ত থাকেন, তাহলে আমাদের পড়াশোনাও ভালো হবে।” তবে কিছু শিক্ষার্থী আশঙ্কা প্রকাশ করেছে—জাতীয়করণের পর ভর্তি নীতিমালা বা ফি কাঠামোয় পরিবর্তন আসবে কি না, তা স্পষ্ট হওয়া দরকার।
অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ। একজন অভিভাবক বলেন, “আমরা চাই শিক্ষার মান উন্নত হোক। যদি জাতীয়করণে শিক্ষকদের জবাবদিহি ও প্রশিক্ষণ বাড়ে, তাহলে ভালো।” তবে তিনি যোগ করেন, সরকারকে বাজেট ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে হঠাৎ করে বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়।
শিক্ষাবিদদের মতে, বিষয়টি কেবল আবেগের নয়, নীতিগত বিশ্লেষণেরও। একজন শিক্ষা বিশ্লেষক বলেন, জাতীয়করণ মানেই সব সমস্যার সমাধান নয়; বরং সমন্বিত শিক্ষা সংস্কার প্রয়োজন। শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও মান নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুর সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। তবে তিনি স্বীকার করেন, দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূরীকরণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জরুরি।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও এ প্রসঙ্গ নতুন নয়। অতীতে বিভিন্ন সময়ে জাতীয়করণের আশ্বাস এসেছে। শিক্ষকরা আশা করছেন, এবারের সরকার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেবে। তাদের মতে, শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে সুস্পষ্ট সময়সূচিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবি এখন কেবল একটি পেশাগত ইস্যু নয়; এটি শিক্ষার মান, ন্যায়সংগত সুযোগ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত একটি জাতীয় আলোচনায় পরিণত হয়েছে। নতুন সরকারের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে—এ প্রত্যাশা বাস্তবতায় রূপ নেবে, নাকি আবারও প্রতিশ্রুতির পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে।
শিক্ষাবার্তা /এ/১৪/০২/২০২৬
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
