।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।
ঢাকার স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান Wills Little Flower School and College–এর সাবেক শিক্ষিকা রওশন আরা’র ইন্তেকালের সংবাদ আমাদের হৃদয়ে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। একজন শিক্ষক চলে গেলে কেবল একজন মানুষই হারিয়ে যান না—হারিয়ে যায় এক টুকরো আলো, এক মমতাময় ছায়া, এক অনুপ্রেরণার উৎস।
রওশন আরা ছিলেন নিভৃতচারী অথচ দৃঢ়চেতা একজন শিক্ষিকা। তাঁর কণ্ঠ ছিল কোমল, কিন্তু নীতিতে ছিলেন অটল। শ্রেণিকক্ষে ঢুকে প্রথমেই তিনি যে হাসিমাখা সম্ভাষণ জানাতেন, তা আজও কানে বাজে। তিনি বিশ্বাস করতেন—শিক্ষা মানে কেবল পাঠ্যবই নয়; শিক্ষা মানে মানুষ হওয়া, মূল্যবোধে দৃঢ় থাকা, সততার পথে চলা।
সহকর্মীরা বলেন, ম্যাম ছিলেন অত্যন্ত সময়নিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল। বিদ্যালয়ের যে কোনো আয়োজন—হোক তা বার্ষিক ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা পরীক্ষার ব্যস্ততা—সব জায়গায় তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। নতুন শিক্ষকরা তাঁর কাছ থেকে শিখেছেন শ্রেণি পরিচালনার কৌশল, শিক্ষার্থীদের মন বুঝে কথা বলার ভাষা। তিনি কাউকে ছোট করতেন না; বরং উৎসাহ দিতেন, পথ দেখাতেন।
শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন ‘কঠোর কিন্তু স্নেহময়’ ম্যাম। ভুল করলে শাসন করতেন, আবার ক্লাস শেষে ডেকে নিয়ে স্নেহভরে বুঝিয়ে দিতেন। অনেক শিক্ষার্থী আজ বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত। তাঁদের মুখে একটাই কথা—“ম্যাম আমাদের শুধু পড়াননি, মানুষ হতে শিখিয়েছেন।” কোনো শিক্ষার্থী পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়লে তিনি আলাদা সময় দিতেন। পরীক্ষার ফল খারাপ হলে নিরুৎসাহ না হয়ে কীভাবে নতুন করে শুরু করতে হয়—সেই সাহস জুগিয়েছেন।
ম্যামের একটি বিশেষ গুণ ছিল—তিনি প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে আলাদা মানুষ হিসেবে দেখতেন। কারো পারিবারিক সমস্যা, কারো মানসিক দুশ্চিন্তা—সবকিছু তিনি মন দিয়ে শুনতেন। অনেক সময় একজন অভিভাবকের ভূমিকাও পালন করতেন। তাই তাঁর প্রস্থান শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়; অসংখ্য হৃদয়ের ব্যক্তিগত বেদনা।
বিদ্যালয়ের করিডোরে আজও যেন ভেসে আসে তাঁর পদচারণা। ব্ল্যাকবোর্ডে চক ঘষার শব্দ, পরীক্ষার খাতা হাতে নিয়ে ধৈর্য ধরে মন্তব্য লেখা—সবই এখন স্মৃতি। সকালের সমাবেশে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তাঁর উপদেশ—“সত্য কথা বলবে, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করবে না”—এই কথাগুলোই ছিল তাঁর জীবনের দর্শন।
একজন শিক্ষক তখনই সফল হন, যখন তাঁর ছাত্রছাত্রীরা তাঁকে মনে রাখে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। রওশন আরা ম্যাম সেই বিরল শিক্ষকদের একজন, যাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্মে স্মরণীয় হয়ে থাকেন। তাঁর ছাত্রছাত্রীরা আজও বলেন, জীবনের কঠিন মুহূর্তে ম্যামের কথা মনে পড়লে সাহস পাই।
মৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু কিছু মানুষ চলে গিয়েও থেকে যান তাঁদের কর্মে, আদর্শে ও স্মৃতিতে। রওশন আরা ম্যাম তেমনই একজন। তিনি হয়তো আর শ্রেণিকক্ষে ফিরবেন না, কিন্তু তাঁর শেখানো মূল্যবোধ, তাঁর স্নেহময় আচরণ এবং তাঁর আদর্শ আমাদের পথ দেখাবে চিরকাল।
আমরা মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি—তিনি যেন রওশন আরা ম্যামকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে ধৈর্য ধারণের শক্তি দান করেন। তাঁর স্মৃতি আমাদের মাঝে চিরউজ্জ্বল থাকুক—একজন আলোকিত মানুষের মতো, যিনি নিঃশব্দে বহু প্রাণে আলো জ্বালিয়ে গেছেন।
শিক্ষাবার্তা /এ/১৩/০২/২০২৬
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল