এইমাত্র পাওয়া

নির্ঘুম প্রাথমিকের ৫ সহস্রাধিক শিক্ষক

নিউজ ডেস্ক।। 

প্রতিস্থাপন জটিলতায় বছরের পর বছর আটকে রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ হাজারের বেশি শিক্ষকের বদলি। বদলির আদেশ হাতে থাকা সত্ত্বেও প্রতিস্থাপক শিক্ষক যোগদান না করায় তারা নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে পারছেন না। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সমন্বিত আদেশ দ্রুত জারি ও মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়ন হলেই এই দীর্ঘদিনের সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী শিক্ষকরা।প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিস্থাপন সাপেক্ষে বদলির আদেশপ্রাপ্ত শিক্ষকের সংখ্যা ৭ হাজার ৯৫ জন। এর মধ্যে অনেকেই প্রতিস্থাপক পেয়ে বদলিকৃত কর্মস্থলে যেতে পেরেছেন। অধিকাংশের বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কায় তাদের বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান করানো যাচ্ছে না। ফলে বদলির আদেশ কাগজে থাকলেও বাস্তবে শিক্ষকরা বছরের পর বছর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দুর্গম চর, হাওর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।সহকারী শিক্ষক মো. মোহসীন বলেন, ২০০৬ সালে চাকরিতে যোগদান করি। বাড়ি থেকে কর্মস্থলের দূরত্ব ৬৫ কিলোমিটার। প্রতিদিন ১৩০ কিলোমিটার যাতায়াত করতে হয়। ফজরের নামাজ পড়ে বের হই, মাগরিবের পর বাসায় ফিরি। আল্লাহর রহমতে ২০২৫ সালের ১৩ জুলাই প্রতিস্থাপন সাপেক্ষে বদলির আদেশ পেলেও বিদ্যালয়ে শিক্ষক কম থাকায় এখনো অবমুক্ত হতে পারছি না।দূর-দূরান্তের এসব এলাকায় কর্মরত শিক্ষকরা জানান, আমাদের কষ্ট দেখার কেউ নেই। প্রশাসনিক জটিলতা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে তাদের বদলি কার্যত স্থবির হয়ে আছে। এতে সিরাজগঞ্জ, নোয়াখালী, হবিগঞ্জ, সিলেট, গাইবান্ধা, পটুয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার হাজারো শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে চরম মানসিক
চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

২০২৪ সালে বদলির আদেশপ্রাপ্ত এক শিক্ষক নাজিউর রহমান বলেন, আমার আদেশের পর নিয়োগ হলেও আমার বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষক পদায়ন দেওয়া হয়নি। এর ফলে আজও সেখানে মানবেতর জীবন যাপন করছি। শিক্ষকরা জানান, বর্তমান ডিজি স্যার আমাদের বিষয়টি মানবিক ও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন একটি সমন্বিত আদেশজারীর বিষয়ে। সম্প্রতি নিয়োগের ভাইভা চলছে, প্রতিস্থাপন আদেশধারীদের পদে নতুন শিক্ষকদের পদায়ন নিশ্চিত না হলে এই সংকটের বাস্তব কোনো সমাধান হবে না। তাদের দাবি, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ঘোষিত সমন্বিত আদেশ যেন কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে।

৭১নং কোনাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাজিপুর, সিরাজগঞ্জের সহকারী শিক্ষক মোহাম্মাদ আলী বলেন, গত ১৮ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে বদলির আদেশ পাই। প্রায় দুই বছর ধরে পরিবার থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে যমুনা নদীর অপর পাড়ে একটি বিদ্যালয়ে কর্মরত আছি। বদলির আদেশ পেয়েও প্রতিস্থাপন না হওয়ায় পরিবারের কাছে যেতে পারছি না। ডিজি স্যারের আশ্বাসের ওপর ভরসা রেখেই আছি।

ধলিপাটা ধোঁয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফুলছড়ি, গাইবান্ধার সহকারী শিক্ষক মোছা. ফাতেমা জান্নাত কেয়া বলেন, আমার কর্মস্থল বাড়ি থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে দুর্গম চর এলাকায়। যোগাযোগ ও সেবা সংকটের কারণে দুই বছরের শিশুকে নিয়ে স্কুলের পাশেই ভাড়া থাকি। এখানে ভালো বাসস্থান, চিকিৎসা, বাজার কিংবা পরিবহন কিছুই নেই। আমার বাম হাত ভাঙা, বর্ষার দিনে শিশুকে কোলে নিয়ে চলাফেরা করাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। এক বছর ধরে প্রতিস্থাপন বদলিতে আটকে আছি।

এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের প্রতিস্থাপক হিসেবে পদায়ন নিশ্চিত করে সমন্বিত আদেশ বাস্তবায়ন করা হলে প্রতিস্থাপন জনিত এই জটিলতার নিরসন সম্ভব হবে। সম্প্রতি নতুন শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে মৌখিক পরীক্ষা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

দক্ষিণ মন্দিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ছাগলনাইয়া, ফেনীর চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বলেন, ১৮ এপ্রিল ২০২৪ সালে বদলির আদেশ পাই। প্রায় দুই বছর ধরে পরিবার থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে কর্মরত আছি। প্রতিস্থাপন না হওয়ায় এখনো বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান করতে পারিনি। আশা করছি, সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ২০২৫-এর পদায়নের আগেই সমন্বিত বদলির আদেশ জারি করে আমাদের অবমুক্ত করা হবে।

আন্তঃবিভাগীয় বদলিতে কর্মরত একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোছা. তৌহিদা খাতুন বলেন, ২০২৫ সালের ২৪ মে থেকে পরিবার থেকে ১২৫ কিলোমিটার দূরে কর্মরত আছি। বদলির আদেশ পেয়েও প্রতিস্থাপন বদলির কারণে পরিবারের কাছে যেতে পারছি না। নতুন নিয়োগের আগে নিঃশর্ত অবমুক্তিই এখন আমাদের শেষ ভরসা।

দুর্গম এলাকার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুক্তার হোসেন বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে পরিবার থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে আছি। বাড়িতে আমার বৃদ্ধ মা-বাবা রয়েছেন, দেখাশোনার কেউ নেই। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোনো সমাধান পাইনি। দেশ রপান্তর 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.