।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
সমাজে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা প্রোথিত হয়ে আছে—কন্যা সন্তান যেন কোনো না কোনোভাবে পরিবারের জন্য “বোঝা” বা “অভিশাপ”। এ ধারণা শুধু অমানবিক নয়, ইসলামের মূল শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধেরও পরিপন্থী। বরং কন্যা সন্তান আল্লাহ তায়ালার এক বিশেষ রহমত, এক অনন্য বরকত। ইসলাম ও মানবসভ্যতার ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যেখানে কন্যা সন্তানকে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, সেই সমাজ হয়েছে আলোকিত; আর যেখানে অবহেলা ও অবমাননা করা হয়েছে, সেই সমাজ ডুবে গেছে অন্ধকারে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি দুই কন্যাকে ভালোভাবে লালন-পালন করবে, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তাকে জান্নাতে আমার সান্নিধ্যে রাখবেন।” (সহিহ মুসলিম)
আরেকটি হাদিসে এসেছে, “যে ব্যক্তি কন্যা সন্তানদের লালন-পালন করবে, তাদের প্রতি উত্তম আচরণ করবে, তার জন্য জান্নাত ফরজ হয়ে যাবে।”
এই বাণীগুলো শুধু একটি ধর্মীয় অনুপ্রেরণা নয়, বরং একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—কন্যা সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও জান্নাতের পথে একটি দরজা। একটি কন্যা শিশুর আগমন মানে ঘরে নেমে আসে আল্লাহর বরকত ও প্রশান্তির আলো।
ইসলাম আগমনের পূর্বে আরব সমাজে কন্যা সন্তান জন্ম ছিল লজ্জা ও অপমানের বিষয়। নবজাতক কন্যাকে জীবন্ত কবর দিয়ে ফেলা হতো। কিন্তু ইসলামের আগমন এই অমানবিক প্রথার অবসান ঘটায়। কুরআনে আল্লাহ বলেন, “আর যখন জীবন্ত কবর দেওয়া মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করা হবে—কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?” (সূরা তাকভীর: ৮-৯)
এই আয়াতই জানিয়ে দেয়—কন্যা সন্তান হত্যা, অবমাননা বা অবহেলা আল্লাহর কঠোর ক্রোধ ডেকে আনে। ইসলাম শুধু এ প্রথার অবসানই ঘটায়নি, কন্যা সন্তানের মর্যাদাকে স্বর্গীয় উচ্চতায় উন্নীত করেছে।
আজও আমাদের সমাজে অনেক পরিবার কন্যা সন্তানের জন্মে মুখ ভার করে। কেউ কেউ আবার লুকিয়ে রাখে এই আনন্দের খবর। অথচ এই সন্তানই একদিন হয়ে উঠতে পারে পরিবারের গর্ব, সমাজের আলোকবর্তিকা।
কন্যা সন্তান পরিবারের জন্য শুধু দায়িত্ব নয়, বরং আশীর্বাদের মতো এক সম্পর্ক। এক সময় মা-বাবার জন্য যেভাবে তারা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সহায় হয়ে ওঠে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। অসংখ্য পরিবারে দেখা যায়—যেখানে ছেলে সন্তান দূরে সরে যায়, সেখানে মেয়েরা থাকে মা-বাবার পাশে, হয়ে ওঠে মানসিক শক্তি।
কন্যারা পরিবারে নিয়ে আসে ভালোবাসা, মমতা ও যত্নের পরিবেশ। তারা শুধু সন্তান নয়, অনেক সময় হয়ে ওঠে বন্ধুও, সেবকও, আশ্রয়ও। আল্লাহ তায়ালা যে কন্যা সন্তান দিয়েছেন, তার ঘরে তিনি দান করেছেন রহমতের ফুল ও বরকতের ছায়া।
একটি কন্যা সন্তানের প্রতি উত্তম আচরণ, সঠিক শিক্ষা, ভালোবাসা ও নিরাপত্তা দেওয়ার মাধ্যমে একজন অভিভাবক শুধু পার্থিব দায়িত্বই পালন করেন না—বরং তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথেও এগিয়ে যান। ইসলাম এ বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কন্যাদের লালন-পালন করবে এবং তাদের সাথে উত্তম আচরণ করবে, সে জান্নাতে আমার সাথে থাকবে।” (তিরমিজি)
এই হাদিস আমাদের শেখায়—কন্যা সন্তান কোনো অভিশাপ নয়, বরং জান্নাতের সোপান।
বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই কন্যা সন্তানের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎকে অবহেলা করার প্রবণতা দেখা যায়। অথচ একটি শিক্ষিত কন্যা সন্তান একটি পরিবার, একটি সমাজ ও একটি জাতিকে পরিবর্তন করে দিতে পারে।
একজন শিক্ষিত মা একটি সচেতন প্রজন্ম গড়ে তোলে—এটি ইতিহাসে বহুবার প্রমাণিত সত্য। তাই কন্যা সন্তানের প্রতি অবহেলা নয়, বরং বিনিয়োগ হওয়া উচিত সর্বোচ্চ। তাদের পড়াশোনা, আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তিকে গড়ে তুলতে হবে আগামীর জন্য।
বিশ্বজুড়ে কন্যারা আজ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে। রাজনীতি, শিক্ষা, বিজ্ঞান, সাহিত্য থেকে শুরু করে সমাজসেবা—সবখানেই তারা অবদান রাখছে গর্বের সঙ্গে।
বাংলাদেশেও অসংখ্য কন্যা সন্তানের সাফল্যের গল্প প্রমাণ করে—তাদের সুযোগ দিলে তারা শুধু ঘর নয়, গোটা জাতিকেই আলোকিত করতে পারে।
এখনও অনেক গ্রামীণ বা রক্ষণশীল সমাজে কন্যা জন্ম মানেই বোঝা—এই ধারণা সমাজকে পেছনে টেনে রাখছে। সময় এসেছে এ মানসিকতার পরিবর্তনের। আমাদের বুঝতে হবে, আল্লাহ কন্যা সন্তান দিয়ে আমাদের পরীক্ষা করেননি, বরং পুরস্কৃত করেছেন।
যে পরিবার কন্যা সন্তানকে ভালোবাসে, সম্মান করে, তাকে সুযোগ দেয়—সেই পরিবারে নেমে আসে মানসিক প্রশান্তি ও বরকত। আর যারা কন্যা সন্তানকে বোঝা ভাবে, তারা আসলে নিজেদের ভাগ্যকে অস্বীকার করে।
ব্যক্তিগত পর্যায়ের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজকেও কন্যা সন্তানের মর্যাদা রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষায় সমান সুযোগ, সামাজিক নিরাপত্তা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
কন্যাদের জন্য একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলাই হবে সবচেয়ে বড় দান, যা শুধু পরিবার নয়, গোটা জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
একজন কন্যা সন্তান কেবল একটি সন্তান নয়, বরং এক অনন্য ভালোবাসা, রহমত ও বরকতের প্রতীক। যিনি এই দান পেয়েছেন, তিনি সত্যিই ভাগ্যবান।
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন, “তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন।” (সূরা আশ-শুরা: ৪৯)
অতএব, কন্যা সন্তান পাওয়া লজ্জার নয়, গর্বের। অভিশাপ নয়, আশীর্বাদ। আর এই আশীর্বাদকে ভালোবাসা, মর্যাদা ও সুযোগ দিয়ে সঠিকভাবে ধারণ করাই আমাদের দায়িত্ব।
কন্যা সন্তানকে সব ধর্মেই আশীর্বাদ, সৌভাগ্য এবং দায়িত্বশীলতা এর প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে।নারী সন্তানকে ঘরে আনে শান্তি, সামাজিক মর্যাদা এবং ঈশ্বরের আশীর্বাদ।
তাই কন্যা সন্তানকে অভিশাপ নয়, বরং আল্লাহ বা ঈশ্বরের অমূল্য দান হিসেবে গ্রহণ করা উচিত
কন্যা সন্তানকে ভালোবাসুন, মর্যাদা দিন, শিক্ষা দিন, সুযোগ দিন—দেখবেন আপনার ঘর, সমাজ ও দেশ আলোকিত হয়ে উঠবে রহমত ও বরকতের আলোয়।
লেখা: শিক্ষক ও গবেষক।।
শিক্ষাবার্তা /এ/০৮/১০/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
