এইমাত্র পাওয়া

বৃষ্টি নামলেই অচল নগরজীবন: জনভোগান্তির শেষ কোথায়?

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।

ঢাকার আকাশে মেঘ জমলেই রাজধানীবাসীর মনে অজানা আতঙ্ক ভর করে। কয়েক মিনিটের টানা বৃষ্টি নামলে পুরো নগরজীবন যেন থমকে দাঁড়ায়। রাস্তাঘাট ডুবে যায় হাঁটু কিংবা কোমরসমান পানিতে, যানজট ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থায়ী হয়, স্কুল-কলেজে অলিখিত ছুটি ঘোষণা করা হয়, অফিসগামী মানুষদের দুর্ভোগের যেন শেষ নেই। শুধু তাই নয়, পানি জমে থাকে দিনের পর দিন; দুর্গন্ধ, মশার উপদ্রব, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নানান সামাজিক সমস্যায় ভোগে নগরবাসী। প্রশ্ন জাগে—প্রতি বর্ষায় একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি কেন? এত উন্নয়ন, এত প্রকল্প, এত বাজেট থাকার পরও সমাধান আসছে না কেন?

প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ঢাকার চিত্র একেবারেই চেনা। কোথাও রাস্তায় গাড়ি অচল হয়ে পড়ে, কোথাও আবার প্রাইভেটকার-রিকশা পানিতে ভেসে বেড়ায়। অনেকে মজা করে ছবিও তোলে, কিন্তু ভুক্তভোগীদের কাছে বিষয়টি একেবারেই আনন্দের নয়। কর্মজীবী মানুষ সময়মতো অফিসে পৌঁছতে পারে না, ছাত্রছাত্রীরা পরীক্ষায় অংশ নিতে ব্যর্থ হয়, অসুস্থ মানুষ হাসপাতালে যাওয়ার পথেই আটকে যায়। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—প্রতিটি খাতেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

জলাবদ্ধতার কারণে ঢাকার রাস্তায় যানজট যে পর্যায়ে পৌঁছায়, তা অনেক সময় কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। অথচ এই শহরেই দেশের প্রধান সরকারি অফিস, আদালত, বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ শহরের অবস্থা যদি কয়েক মিনিটের বৃষ্টিতেই অচল হয়ে যায়, তাহলে এর দায়ভার বহন করবে কে?

ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনো আকস্মিক সমস্যা নয়। এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফল। কয়েকটি প্রধান কারণ হলো—

ড্রেন ও নালা থাকার কথা যথেষ্ট সংখ্যায়, কিন্তু বাস্তবে তা নেই। যেখানে আছে সেখানেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ময়লা-আবর্জনায় ভরে থাকে। ফলে পানি নামার পথ পায় না।

ঢাকার চারপাশে একসময় অসংখ্য খাল ছিল যা দিয়ে স্বাভাবিকভাবে পানি নিষ্কাশন হতো। এখন এসব খালের অধিকাংশ ভরাট হয়ে গেছে, দখল হয়ে গেছে বা অপরিকল্পিত নির্মাণে বিলীন হয়েছে।

গ্রাম থেকে ঢাকায় মানুষের ঢল নামায় বসতবাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্য কেন্দ্র বেড়েছে। কিন্তু নগর পরিকল্পনা হয়নি সেভাবে। ফলে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা বাড়েনি, বরং সংকুচিত হয়েছে।

নতুন সড়ক নির্মাণ বা মেট্রোরেলের মতো প্রকল্পে পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই নতুন সড়কগুলোও পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে।

ডিএনসিসি, ডিএসসিসি, ওয়াসা, রাজউক, পরিবেশ অধিদপ্তর—সব প্রতিষ্ঠানের কাজ রয়েছে জলাবদ্ধতা নিরসনে। কিন্তু তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এতটাই প্রকট যে সমস্যা সমাধানের বদলে আরও জটিল হচ্ছে।

জলাবদ্ধতা কারণে প্রতিদিন লাখো মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে উৎপাদনশীল সময় নষ্ট করে। ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়।

স্কুল-কলেজে অলিখিত ছুটি পড়ে। পরীক্ষার দিন হলে শিক্ষার্থীরা মারাত্মক সমস্যায় পড়ে।

পানিবাহিত রোগ যেমন ডায়রিয়া, টাইফয়েড, ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেড়ে যায়। ময়লা-আবর্জনায় ভরা পানি দুর্গন্ধ ছড়ায়, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে।

কর্মজীবী মানুষদের সময়মতো কর্মস্থলে না পৌঁছাতে পারা, গৃহকর্মীদের কাজে যেতে না পারা, অ্যাম্বুলেন্স আটকে যাওয়া—সব মিলিয়ে সামাজিক জীবন অচল হয়ে পড়ে।

প্রশ্ন উঠছে, দায় নেবে কে? রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তর—প্রত্যেকেই দায় এড়িয়ে চলে। কিন্তু ঢাকার ২ কোটি মানুষের দুর্ভোগে দায়ভার তাদেরই নিতে হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোও সমস্যাটিকে ভোটের ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করে, কিন্তু কার্যকর সমাধানে খুব কমই উদ্যোগ নেয়।

ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনো জটিল বৈজ্ঞানিক সমস্যা নয়; এটি মূলত রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সুশাসনের অভাবের ফল। সমাধানের জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ হলো—খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার: দখলমুক্ত করে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন পথ ফিরিয়ে আনতে হবে।

 কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা: আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন ড্রেন তৈরি ও পুরোনো ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।

নগর পরিকল্পনায় সমন্বয়: সব প্রতিষ্ঠানকে এক ছাতার নিচে এনে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

আইনি পদক্ষেপ: জলাশয় দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

নাগরিক সচেতনতা: জনগণকেও আবর্জনা ড্রেনে না ফেলার বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

স্মার্ট সিটি পরিকল্পনা: উন্নয়নের নাম করে শুধুই ফ্লাইওভার নয়, বর্ষণ সহনীয় নগর অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনো নতুন সমস্যা নয়, বরং এটি প্রতিদিনের নাগরিক দুঃস্বপ্ন। একদিনের বৃষ্টিতে যদি রাজধানী অচল হয়ে পড়ে, তাহলে আগামী দিনে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা আরও কঠিন হবে। উন্নয়ন প্রকল্প, উজ্জ্বল বিজ্ঞাপন বা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে নাগরিক দুর্ভোগ লুকানো সম্ভব নয়।

ঢাকাকে যদি সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য নগরী বানাতে হয়, তবে অবিলম্বে জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় প্রতি বর্ষায় নগরবাসীকে একই প্রশ্ন করতে হবে—“বৃষ্টি নামলেই অচল নগরজীবন, জনভোগান্তির শেষ কোথায়?

লেখক : শিক্ষক ও গবেষক। 

শিক্ষাবার্তা/এ/২৩/০৯/২৫


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.