এইমাত্র পাওয়া

ধর্মের নামে সহিংসতা: ইসলামের সঙ্গে প্রতারণা

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

বিশ্বের প্রায় প্রতিটি সমাজই আজ বিদ্বেষ, সহিংসতা ও চরমপন্থার মারাত্মক পরিণতির শিকার। ধর্মের নামে সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদ এবং রাষ্ট্রীয় আগ্রাসন—সবই মানবসভ্যতাকে ক্রমে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ ইসলাম, যা একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, তার মৌল শিক্ষা হলো—শান্তি, ন্যায়, ভ্রাতৃত্ব এবং মানবকল্যাণ। তাই বিদ্বেষ ছড়ানো বা অন্যায়ের পথে হেঁটে নিরপরাধদের ক্ষতি করা ইসলামের শিক্ষা নয়, বরং ইসলামের মূল আদর্শের পরিপন্থি।

ইসলামের মূল অর্থই শান্তি। একজন মুসলমানের পরিচয় কেবল তার নাম বা আচার-অনুষ্ঠানে নয়, বরং তার আচরণে, ন্যায়বোধে, অন্যের প্রতি ভালোবাসা ও দয়া প্রদর্শনে। মহান আল্লাহতায়ালা বার বার  আল কুরআনে শান্তি প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। মুসলমানরা কখনোই অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাসকে অবমাননা করতে পারে না। বরং সহনশীলতা, উদারতা ও ন্যায়পরায়ণতা প্রদর্শন করা ইসলামের বৈশিষ্ট্য।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’—সর্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য শান্তি, কল্যাণ ও করুণার দূত। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় প্রমাণ করে যে, বিদ্বেষ নয়, বরং ভালোবাসা, ন্যায়বিচার ও শান্তিই ইসলামি শিক্ষার ভিত্তি।

ইসলাম যুদ্ধকে প্রাধান্য দেয়নি বরং একান্ত প্রয়োজনে আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধ করার অনুমতি দিয়েছে। তবে সেই যুদ্ধে রয়েছে কঠোর নীতিমালা। কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে—“আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন না যারা সীমালঙ্ঘন করে।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯০)। অর্থাৎ আত্মরক্ষার জন্য লড়াই করা যেতে পারে, কিন্তু অকারণে কারো ওপর আক্রমণ করা যাবে না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) যুদ্ধের সময়ও নারীদের, শিশুদের, বৃদ্ধদের এবং ধর্মীয় নেতাদের হত্যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রেও গাছ কাটা, পশু হত্যা বা শস্য ধ্বংস করাকে ইসলাম নিন্দা করেছে। আজকের আত্মঘাতী হামলা, নির্বিচারে বোমাবর্ষণ, বা শহর ধ্বংসের মতো কর্মকাণ্ড ইসলামের সাথে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এগুলো বরং সরাসরি ইসলামের শিক্ষার বিরোধিতা করে।

বিদ্বেষ বা ঘৃণা মানুষের অন্তরকে কলুষিত করে। বিদ্বেষের বীজ একবার হৃদয়ে স্থান নিলে তা মানুষকে ন্যায় থেকে বিচ্যুত করে, অপরাধ ও সহিংসতায় প্ররোচিত করে। মহানবি (সা.) বিদ্বেষকে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর রোগ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন—“বিদ্বেষ মানুষের ধর্ম শেষ করে দেয়।” (তিরমিজি)।

শত্রুর প্রতি প্রতিশোধ নয়, বরং ন্যায়পরায়ণ আচরণ করতে ইসলাম শিক্ষা দেয়। কুরআনে বলা হয়েছে, “কোনো জাতির শত্রুতা যেন তোমাদেরকে অবিচারের দিকে প্ররোচিত না করে।” (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৮)। এ আয়াতই প্রমাণ করে যে, ইসলামে বিদ্বেষ ও অন্যায় একেবারেই স্থান পায় না।

আজকের বিশ্বে বিদ্বেষের নানা চেহারা দেখা যায়। কখনো তা ধর্মীয় উগ্রবাদ, কখনো জাতিগত বৈষম্য, কখনো আবার সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন। উন্নত বিশ্বের কিছু রাষ্ট্র নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে দরিদ্র দেশগুলোর সম্পদ লুটে নিচ্ছে। অন্যদিকে, কিছু গোষ্ঠী ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের প্রতিযোগিতা বিশ্বকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিরোশিমা ও নাগাসাকির ভয়াবহতা মানবসভ্যতাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। তবুও আজো রাষ্ট্রগুলো থামেনি; বরং আরও আধুনিক ও ধ্বংসাত্মক অস্ত্র উদ্ভাবনে ব্যস্ত। অথচ ইসলাম স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছে—নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হত্যা করার চেয়েও ভয়ঙ্কর অপরাধ। কারণ এতে শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষতি হয় না, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ক্ষতবিক্ষত হয়।

পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে—“তারা যদি সন্ধির জন্য হাত বাড়ায়, তবে তুমিও হাত বাড়াও এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করো।” (সুরা আনফাল, আয়াত: ৬১)। অর্থাৎ ইসলাম সবসময় শান্তি চায়। যুদ্ধ বাধলে তা কেবল প্রতিরক্ষামূলক এবং সীমিত পরিসরে হতে পারে।

আল্লাহতায়ালা আরও বলেছেন, “তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হও।” (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৮)। শত্রু হলেও তার প্রতি ন্যায়বিচার করা ইসলামের শিক্ষা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর শত্রুদের প্রতিও দয়া, সহানুভূতি ও ন্যায় প্রদর্শন করেছেন। হুদাইবিয়ার সন্ধি কিংবা মক্কা বিজয়ের সময় তাঁর ক্ষমাশীলতা বিশ্ব ইতিহাসের অনন্য নজির।

একবার সাহাবিরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, শ্রেষ্ঠ মানুষ কে? তিনি বলেছিলেন, “যার অন্তর পরিচ্ছন্ন এবং যে সত্যবাদী।” সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, পরিচ্ছন্ন অন্তর কাকে বলে? নবিজি উত্তর দিলেন—“যার মনে হিংসা নেই, বিদ্বেষ নেই, অন্যের অনিষ্টের চিন্তা নেই।” (ইবন মাজাহ)।

এই শিক্ষাই মুসলমানদের জন্য মূলনীতি হওয়া উচিত। বিদ্বেষ, হিংসা বা ঘৃণা মানুষের অন্তরকে অন্ধকার করে দেয়; অন্যদিকে দয়া, ক্ষমাশীলতা ও ন্যায়পরায়ণতা অন্তরকে পরিচ্ছন্ন রাখে।

আজকের মুসলমানরা যদি সত্যিই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা মেনে চলে, তবে কোনো সন্ত্রাসবাদ, আত্মঘাতী হামলা বা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ সমাজে ছড়াতে পারে না। ইসলামের মূল শিক্ষা হলো—মানবতার কল্যাণ, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কিছু চরমপন্থি গোষ্ঠী ইসলামের নাম ব্যবহার করে সহিংসতা চালাচ্ছে। তারা শিশু, নারী, বৃদ্ধ নির্বিশেষে সবাইকে হত্যা করছে। অন্যদিকে, ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থে অন্য দেশের ওপর আগ্রাসন চালাচ্ছে। উভয়ই ইসলামের শিক্ষার সম্পূর্ণ বিরোধী।

তাই আমাদের কর্তব্য হলো—ধর্মকে বিদ্বেষের হাতিয়ার না বানিয়ে, বরং শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

বিদ্বেষ ছড়ানো কোনো ধর্মের শিক্ষা হতে পারে না, বিশেষ করে ইসলামের নয়। ইসলাম মানবতার ধর্ম, শান্তির ধর্ম। এর শিক্ষা হলো—ন্যায়বিচার, সহনশীলতা ও মানবিকতা। আত্মঘাতী হামলা, রাষ্ট্রীয় আগ্রাসন বা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ইসলাম কখনো অনুমোদন করেনি।

আজ মানবসভ্যতা অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও বিদ্বেষপূর্ণ রাজনীতির কারণে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। তাই আমাদের উচিত কুরআন ও সুন্নাহর প্রকৃত শিক্ষা অনুসরণ করে শান্তি, ন্যায় এবং মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা।

আসুন, আমরা বিদ্বেষ ছড়ানোর পরিবর্তে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করি। আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ন্যায়বিচার ও তাকওয়া অবলম্বন করি। তাহলে সমাজে শান্তি ফিরবে, মানবসভ্যতা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা বুঝার, তা মেনে চলার এবং বিদ্বেষের পরিবর্তে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণের তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: সম্পাদক,  শিক্ষাবার্তা।

শিক্ষাবার্তা/এ/২০/০৯/২৫


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.