নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদের জন্য শিক্ষা উপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল আবরারকে এক কোটি টাকা ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাবকারী উল্লেখ করে মাউশির মনিটরিং এন্ড ইভালুয়েশান উইংয়ের পরিচালক কাজী মোঃ আবু কাইয়ুম শিশিরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে তাকে মাউশি থেকে অপসারণ ও চাকুরিচ্যুতি করার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে ঐক্যবদ্ধ শিক্ষক-কর্মচারী প্লাটফর্মের আহবায়ক ও বিএনপির শিক্ষক সংগঠন শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটোর মহাসচিব জাকির হোসেন।
সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর আহমেদ চৌধুরী হলে ঐক্যবদ্ধ শিক্ষক-কর্মচারী প্লাটফর্মের ব্যানারে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। দ্রুত অপসারণ না করা হলে বৃহৎ কর্মসূচীরও ঘোষণা দেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের করা এক প্রশ্নের জবাবে জাকির হোসেন বলেন, গত জুন মাসে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের জন্য শিক্ষা উপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল আবরারকে এক কোটি টাকা ঘুষের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন। যদিও পদের ও পদায়ন পেতে ঘুস দিতে চাওয়া ব্যক্তির নাম তিনি উল্লেখ করেননি। এই পদ ছিল মাউশি ডিজি পদ এবং ঘুস দিতে চেয়েছিলেন অধ্যাপক কাজী কাইয়ুম শিশির। যা তিনি নিজেই বিভিন্ন দপ্তর ও কর্মকর্তার কাছে বলেছেন। যা এখন শিক্ষক কর্মকর্তাদের মুখে মুখে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, গত ১৯ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হাজারও ছাত্র-জনতার রক্তের মধ্য দিয়ে আমরা স্বৈরাচার, খুনি শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের পদত্যাগ নিশ্চিত করতে পেরেছি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল তারা দায়িত্ব নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ দেখতে পাব। শিক্ষা ক্ষেত্রে আসবে এক নতুন সম্ভাবনা, শিক্ষার দপ্তরগুলোতে মুক্ত হবে অনিয়ম ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দৌড়াত্ব। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে শিক্ষা প্রশাসনে এখনও সেই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দৌড়াত্ব বহাল আছে।
তিনি বলেন আমরা দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক জনাব আবু কাইয়ুম শিশির (মনিটরিং এন্ড ইভ্যালুয়েশান উইং) শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্বশীল পদে থেকেও নৈতিকতা ও স্বচ্ছতার পরিপন্থী নানা কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়েছেন। একাধিক অনিয়ম অপকর্ম করেও আগস্ট পরবর্তীতে উপহার স্বরূপ একের পর এক দপ্তরের দায়িত্ব পেয়েছেন যা শিক্ষা প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে। আপনাদের মাধ্যমে আবু কাইয়ুম শিশিরের নানা অনিয়মের ফিরিস্তি তুলে ধরছি।
অভিযোগ সমূহঃ
১. কাজী আবু কাইয়ুম ওরফে শিশির বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ১৪তম ব্যাচের একজন ইংরেজি শিক্ষক। পতিত শেখ হাসিনার পতনের মাসেই অর্থ্যাৎ ২৪ আগস্ট ২০২৪ ইং তারিখে শিক্ষা সেক্টরের মিনিস্ট্রি অডিট খ্যাত পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক পদে পদায়ন পান। ফ্যাসিবাদী আগামী শাসনের ১৭ বছর পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর ছিল বেসরকরি শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে এক আতংকের নাম। মিনিস্ট্রি অডিটের নামে শিক্ষক-কর্মচারীদের এক মাসের এমপিও’র টাকা আদায় করা ছিল ঘতাবিক ঘটনা। স্বৈরাচার পতনের পর এই দপ্তরকে অধ্যাপক শিশির একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেন। মিনিস্ট্রি অডিট শিক্ষকদের কাছে হয়ে উঠে এক মুর্তমান আতঙ্ক। মাত্র তিন মাসে এই দপ্তর থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন অধ্যাপক শিশির। অন্তরবর্তী সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়লে অধ্যাপক শিশিরকে মাত্র তিন মাসের মধ্যে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর থেকে বদল করে ময়মনসিংহে মমিনুন্নেছা সরকারি মহিলা কলেজে বদলি করা হয়। তিনি মন্ত্রণালয়ের এই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেন যা শিক্ষা প্রশাসনের ইতিহাসে প্রথম এবং গুন্ডাপান্ডা ভাড়া করে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের তাঁর চেয়ার দখল করতে আসেন। তাঁর বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় নিরাপত্তা চেয়ে অভিযোগ করেন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর। সে সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সেই মামলা আপিল করে তাঁর বদলির আদেশ বহাল রাখেন। যা গণমাধ্যমের সংবাদের মাধ্যমে পুরো দেশবাসী দেখেছেন জেনেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বদলির আদেশ বহাল থাকলেও তিনি মমিনুন্নেছা মহিলা কলেজে একদিনের জন্য উপস্থিত হননি। দুর্নীতির দায়ে বদলি, বদলি ঠেকাতে মন্ত্রণালয়ের আদেশের বিরুদ্ধে মামলা করেও পরবর্তীতে তাকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মনিটরিং এন্ড ইভ্যালুয়েশান উইংয়ের পরিচালক পদে পদায়ন করে।
২. শিশিরের বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিভাগীয় মামলা, সাদচরণ ও সরকারি চাকরি বিধি লঙ্ঘনের দায়ে গুরুদন্ড প্রদান অথবা চাকুরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত নিলেও তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। বিভাগীয় মামলা থাকা কোন কর্মকর্তাকে তা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পদায়নের সুযোগ না থাকলেও তাকে দুই দুইটি দপ্তরের পরিচালক করা হয়েছে। যা পুরোপুরি চাকরিবিধি লঙ্ঘনের শামিল।
৩. তার দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে একাধিক জাতীয় ও অনলাইন গণমাধ্যমে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। তথ্য প্রমাণসহ শিক্ষা বিষয়ক পত্রিকা শিক্ষাবার্তা রিপোর্ট প্রকাশ করলে এই নিউজকে ম্যানেজ করতে না পারায় পত্রিকার সম্পাদক, প্রকাশক ও প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার বানোয়াট মানহানীর মামলা করেন। সংবিধানে আছে কোন সরকারি কর্মকর্তা কারো বিরুদ্ধে মামলা করতে হলে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু শিশির তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া অধিদপ্তরের পক্ষে মামলা করেন যা বানোয়াট মামলা।
৪. এনসিটিবির চেয়ারম্যান পদের জন্যও শিক্ষা উপদেষ্টাকে এক কোটি টাকা ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল যা গত ৪ জুন সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা উপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল আবরার জনিয়েছিলেন। তিনি নাম প্রকাশ না করলেও শিক্ষার ব্যক্তিবর্গ জানিয়েছিলেন এই ঘুষ অফারকারি অধ্যাপক কাইয়ুম শিশির। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি তিনি মাউশির পরিচালক পদে বহাল তবিয়তে আছেন। এখন তদবির করছেন মাউশির মহাপরিচালক পদের জন্য। কোমর বেধে লেগেছেন বলে বিভিন্ন সুত্রে জানা যায়।
৫. গত মঙ্গলবার (১০ সেপ্টেম্বর) মাউশির ফরহাদ মজাহার এক অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় তাঁর শিক্ষা ভাবনা শেয়ার করলে সেই আলোচনাকে মিটিং উল্লেখ করে বউ কোটায় ইউনুস সরকারের উপদেষ্টা উল্লেখ করে ফরহাদ মজাহারের বিরুদ্ধে প্রোপ্যাগান্ডা চালান অধ্যাপক শিশির।
৬. নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে তাকে ঢাকা অফিসার্স ক্লাব থেকে বহিষ্কার করা হয়।
৭.কোন বিখ্যাত ব্যক্তি বা রাজনৈতিক নেতার উপর বই লিখতে হলে তার বা তাঁর পরিবারের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন কিন্তু শিশির অনুমতি না নিয়ে তিনবারের সাবেক সফল প্রধানমন্ত্রী ও গণতন্ত্রের মা বেগম খালেদা জিয়ার উপর বই লিখেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর সেই বইয়ের মোড়ক উম্মোচনের জন্য এক কোটি টাকার প্রয়োজন মর্মে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ চিঠি দিয়ে চাঁদা দাবি করেন। এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে রমনা থানায় চাঁদাবাজির মামলা করেন এক ব্যবসায়ী। মামলা নং ২ তারিখ ০৯/১০/২০২৪।
৮. সরকারি চাকরিজীবী সরকারি চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় নিজের নামে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান করতে পারেননা কিন্তু শিশির নিজের নামে ৭ টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। আওয়ামী লীগের শেষ আমলে তিনি খাদ্য অধিদপ্তরের এক নম্বর ঠিকাদার হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশ ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খাদ্য সামগ্রী সরবরাহ করতেন। পতিত সরকারের অন্যতম সহযোগী ছিলেন তিনি। শুধু তাই নয় নিজেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কখনও সহ সভাপতি পরিচয় দিয়ে বিএনপি সাজার চেষ্টা করলেও মূলত তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়া কালীন এরশাদ সরকারের জাতীয় ছাত্র সমাজের সাংগঠনিক নেতা ছিলেন।
৯. তিনি এলাকায় বালুর ব্যবসা করে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে পরিশোধ না করায় ভুক্তভোগী লোকজন তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করে।
১০. কর ফাঁকি মামলায় এনবিআরের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করছেন।
১১ . দুর্নীতি ও অবৈধ কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত চলমান রয়েছে।
১২. মাউশির মনিটরিং এন্ড ইভ্যালুয়েশান উইংয়ের পরিচালক পদে থেকে পদাধিকার বলে অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তার দায়িত্ব পেয়ে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজ দপ্তরে অভিযোগ নিয়ে তদন্তের নামে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
১৩. তাঁর বিরুদ্ধে মাউশি, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একাধিক অভিযোগ মাউশি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জমা পড়েছে।
১৪. শিশিরের স্ত্রী ঢাকা স্টেট কলেজের ইংরেজি শিক্ষক। স্ত্রী লন্ডনে বসবাস করলেও তাঁর ইএফটির মাধ্যমে সেই বেতন তুলছেন শিশির নিজে।
১৫. পদোন্নতি ও বদলিতে অনিয়ম: যোগ্যতা ও সিনিয়রিটি উপেক্ষা করে ঘনিষ্ঠ ও সুবিধাভোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়া।
১৬. আর্থিক অনিয়ম: বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডার ও বরাদ্দে স্বজনপ্রীতি ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ।
১৭. ক্ষমতার অপব্যবহার: ভিন্নমত পোষণকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রতি হুমকি-ধামকি ও হয়রানি করেন।
১৮. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব: গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গোপনে গ্রহণ, নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ফাইল অনুমোদন করেন। ১৯. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজে হস্তক্ষেপ: প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি ও প্রধানদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করেন।
এসময় দাবি জানানো হয়
*অবিলম্বে মাউশি থেকে তাকে প্রত্যাহার করতে হবে।
*তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গুরুদন্ড প্রদান বা চাকরিচ্যুতির যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
*শিক্ষা খাতের সুশাসন ও স্বচ্ছতা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে যেন কোন কর্মকর্তা ভবিষ্যতে অধ্যাপক শিশির হয়ে উঠতে না পারে।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
