।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
বাংলাদেশে বর্তমানে নিত্যপণ্যের দাম এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে যে স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষদের জন্য সংসার চালানো কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠেছে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কোনো মিল নেই, যার কারণে সাধারণ মানুষ প্রতিদিন নতুন করে সংগ্রামের মুখোমুখি হচ্ছে। একদিকে আয় স্থবির, অন্যদিকে প্রতিনিয়ত দাম বাড়ছে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, মাছ, মুরগি, সবজি, ডিমসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের। ফলে সংসারের এক দিক সামলাতে গিয়ে অন্য দিকে টান পড়ছে। এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকভাবেও ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে নিত্যপণ্যের দাম ১৫ থেকে ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। দেশি পেঁয়াজ কেজিতে ৩৬ শতাংশ বেড়ে ৮০ টাকা, মসুর ডাল কেজিতে ১৪ শতাংশ বেড়ে ১৬০ টাকা, ডজন ডিম ১৪৫ টাকা, সোনালি মুরগি কেজিতে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা, মাঝারি আকারের রুই মাছ ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবজির দামও লাগামছাড়া। বেগুন ১৬০ টাকা, টমেটো ১৫০-১৬০ টাকা, বরবটি ১২০ টাকা, করলা ১০০-১২০ টাকা। বাজারে এখন একমাত্র তুলনামূলক সস্তা সবজি হচ্ছে আলু (২৫-৩০ টাকা) ও পেঁপে (৩৫-৪০ টাকা)।
একজন স্বল্প আয়ের মানুষ মাসিক ১৫-২০ হাজার টাকা আয় করলে বর্তমান বাজারে খাবার জোগাড় করতেই ৮০ শতাংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। অথচ এই আয়ের ওপরই নির্ভর করছে ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, সন্তানের পড়ালেখা ও চিকিৎসার খরচ। ফলে সংসার চালাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষরা। প্রতিদিনের খাবারের খরচ সামলাতে গিয়ে অনেককে ঋণ করতে হচ্ছে। মধ্যবিত্তরা যদিও লজ্জায় প্রকাশ্যে কিছু বলেন না, তবে তাদের অবস্থাও কম করুণ নয়। আগে যারা বাজার থেকে ১০০০ টাকায় সপ্তাহের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারতেন, এখন সেই খরচ দাঁড়াচ্ছে দ্বিগুণেরও বেশি।
ঢাকার মহাখালী কাঁচাবাজারে এক ক্রেতা হেলাল উদ্দিন বলেন, “বাজারে সরকারের কোনো নজর নেই। বিক্রেতারা নানা অজুহাতে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। সীমিত আয়ের মানুষদের প্রতি মাসেই ঋণ করতে হচ্ছে। মাছ-মাংস কেনা এখন স্বপ্নের মতো।”
এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং সমষ্টিগতভাবে মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করছে।
মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ হিসেবে বাজার সংশ্লিষ্টরা দেখাচ্ছেন ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ও বাজার তদারকির দুর্বলতা। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কম দামে কিনে এনে রাজধানীতে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে পণ্য। কৃষকরা ন্যায্য দাম পাচ্ছে না, অথচ মধ্যস্বত্বভোগীরা মুনাফার বড় অংশ লুটে নিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, নরসিংদীতে যে বেগুনের দাম ৬০-৬৫ টাকা, ঢাকায় এসে তা হয়ে যাচ্ছে ১৫০-১৮০ টাকা।
ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখছে না। শুধু মৌসুমি বা সংকটকালীন সময়ে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়, কিন্তু তা ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হয় না। এর ফলে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বারবার সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং ভোক্তারা বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়ে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, টানা বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার কারণে অনেক কৃষকের ক্ষেত নষ্ট হয়েছে, ফলে সবজির সরবরাহ কমে গেছে। সরবরাহ কমলে দাম বাড়বেই। তবে প্রশ্ন হলো—সরবরাহে সাময়িক ঘাটতি থাকলেও কেন দাম এক ধাক্কায় দ্বিগুণ হয়ে যায়? এর জবাব কেউ দিতে পারছেন না।
এছাড়া আমদানিকৃত পণ্যের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবও পড়ছে। ভারত থেকে আসা টমেটোর দাম গত দুই মাসে ৬০-৮৭ শতাংশ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামের ওঠানামা দেশীয় বাজারকেও অস্থির করে তুলছে।
সরকার মাঝে মধ্যে টিসিবির মাধ্যমে সীমিত আকারে নিত্যপণ্য বিক্রি করে থাকে। তবে এটি সাময়িক সমাধান, স্থায়ী নয়। ভোক্তারা মনে করেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না।
ভুক্তভোগী একজন বলেন, “যখন বাজার অস্থির হয়, তখন তা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। চালের মৌসুমেই চালের দাম বেড়ে যাওয়া সরকারের ব্যর্থতার প্রমাণ। বাজারে নিয়মিত ও স্থায়ীভাবে হস্তক্ষেপ চালু না করলে ভোক্তাদের অসহায়ত্ব দূর হবে না।”
নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি আজ দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। আয় না বাড়লেও ব্যয় প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এর পেছনে রয়েছে বাজার তদারকির অভাব, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারসাজি ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা। সরকার যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই সংকট আরো গভীর হবে।
কৃষক পর্যায় থেকে খুচরা পর্যন্ত কঠোর তদারকি, বাজারে নিয়মিত সরকারি হস্তক্ষেপ এবং সিন্ডিকেট ভাঙতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। না হলে স্বল্প আয়ের মানুষকে প্রতিদিন আরও বেশি হিমশিম খেতে হবে এবং সমাজে বৈষম্য বাড়তে থাকবে।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
