।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন, দ্বিমুখী অবস্থান এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের তারকাদের রাজনৈতিক মঞ্চে দেখা যাওয়া নতুন কিছু নয়। তবে সম্প্রতি ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়িকা অপু বিশ্বাসকে কুষ্টিয়ার খোকসায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে বক্তব্য দিতে দেখা গেলে রাজনৈতিক মহলসহ সাধারণ কর্মীদের মধ্যে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। কারণ, কিছুদিন আগেই একই অপু বিশ্বাস প্রকাশ্যে বলেছিলেন— “শেখ হাসিনা সরকার বারবার দরকার”। এমনকি তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন চেয়েছিলেন বলেও গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছিল। ফলে বিএনপির মঞ্চে তার উপস্থিতি দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের কাছে এক ধরনের রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও বিভ্রান্তির প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অপু বিশ্বাস দীর্ঘদিন চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত থেকে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। বাংলাদেশে রাজনীতির মাঠে শিল্পী-অভিনেতাদের ব্যবহার করা বরাবরই প্রচলিত একটি কৌশল। আওয়ামী লীগ বহু নির্বাচনে চিত্রনায়ক-নায়িকাদের দিয়ে প্রচারণা চালিয়েছে, তাদেরকে প্রার্থীও করেছে। অপু বিশ্বাস সেই ধারা থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেছেন। প্রকাশ্যে শেখ হাসিনাকে ‘আম্মা’ বলে সম্বোধন করা কিংবা আওয়ামী লীগের হয়ে প্রচারণায় অংশ নেওয়া তার রাজনৈতিক অবস্থানকে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছিল।
কিন্তু এই প্রেক্ষাপটে হঠাৎ বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মঞ্চে তার উপস্থিতি অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর, এমনকি প্রশ্নবিদ্ধ মনে হয়েছে।
বিএনপির মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে নানা দমন-পীড়ন, মামলা, হামলা এবং কারাবরণ সহ্য করে দলের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন। তাদের ত্যাগ ও সংগ্রামের বিপরীতে একজন পূর্বে আওয়ামী লীগ সমর্থিত নায়িকা কীভাবে হঠাৎ বিএনপির মঞ্চে উঠে আসতে পারেন, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিক্রিয়াগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরে যে, বিএনপির সাধারণ কর্মীরা বিষয়টিকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখছেন।
কেউ কেউ বলেছেন, আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী একজন শিল্পীকে ডেকে আনা মানে দলের প্রতি অবমাননা।
অনেকেই দাবি করেছেন, যারা অপু বিশ্বাসকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, তাদের বহিষ্কার করা উচিত।
আবার কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, বিএনপি যদি আওয়ামী লীগের মতোই ভাড়াটে শিল্পী দিয়ে সমাবেশ চাঙ্গা করতে চায়, তাহলে তাদের রাজনৈতিক স্বকীয়তার পার্থক্য কোথায়?
অপু বিশ্বাসের মঞ্চে অংশগ্রহণের ঘটনাকে কেউ কেউ ব্যক্তিগত চরিত্রহীনতা বলেছেন। অর্থাৎ, তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি— যে দলই হোক, তাদের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারেন। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায়, এটি কেবল একজন শিল্পীর অবস্থান নয়, বরং বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা ও দূরদর্শিতার অভাবকেও প্রকাশ করছে।
বাংলাদেশের আরেক আলোচিত নায়িকা পরী মনি লিখেছেন – দিদি ৬ মাস হিন্দু ৬ মাস মুসলমান। দিদি ৬ আ. লীগ আবার ৬ মাস বিএনপি।
একটি দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে অতিথি নির্বাচন খুবই সংবেদনশীল বিষয়। সেখানে যদি এমন একজনকে ডাকা হয়, যিনি সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রশংসা করে এসেছেন, তবে তা শুধু রাজনৈতিক অস্বচ্ছতা নয়, বরং দলের প্রতি আস্থাহীনতার ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল— আওয়ামী লীগ ও বিএনপি— বহু দিক থেকেই ভিন্ন হলেও সাংগঠনিক কার্যক্রমে অনেক মিল দেখা যায়। বিশেষ করে বড় সমাবেশগুলোতে ‘তারকা নির্ভরতা’ তৈরি করা এখন একটি সাধারণ প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বিএনপির জন্য এই প্রবণতা বিপজ্জনক হতে পারে।
সমালোচকরা বলেছেন- মাঠে যারা বছরের পর বছর সংগ্রাম করেছেন, তাদের বাদ দিয়ে বাইরের একজন বিতর্কিত অতিথিকে সামনে আনা কর্মীদের মনোবল ভেঙে দিতে পারে। একজন আওয়ামী লীগ সমর্থক নায়িকার উপস্থিতি সাধারণ জনগণের কাছে বিএনপির অবস্থানকে অস্পষ্ট ও দুর্বল করে তুলবে। এ ঘটনা প্রমাণ করে, স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা জনপ্রিয়তার মোহে পড়ে অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
অনেকে মনে করেন- রাজনীতিতে শিল্পী-অভিনেতাদের সম্পৃক্ততা নতুন কিছু নয়। তবে তাদের ব্যবহার করতে গেলে রাজনৈতিক আদর্শ, দলীয় অবস্থান এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা— এই বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। নইলে তা উল্টো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
অপু বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বিএনপি সেই ভুল করেছে। যেখানে তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিএনপি সমর্থক শিল্পী ও কর্মী রয়েছে, সেখানে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ নায়িকাকে ডাকা ছিল আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
বিভিন্ন মন্তব্যে দেখা গেছে, অনেকে সরাসরি তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাদের দাবি, যারা অপু বিশ্বাসকে অনুষ্ঠানে ডেকেছে, তাদের বহিষ্কার করতে হবে। কেউ কেউ এমনকি কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির পুরো কমিটি বিলুপ্ত করার কথাও বলেছেন। এসব বক্তব্যের ভেতর দিয়ে বিএনপির ভেতরে আস্থা সংকট ও অসন্তোষ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
যদি নেতৃত্ব এই ঘটনাকে গুরুত্ব না দেয়, তবে ভবিষ্যতে এমন আরো ঘটনা ঘটতে পারে, যা বিএনপির আন্দোলন ও জনসমর্থনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অপু বিশ্বাসের অবস্থান নিয়ে দ্বিধা থেকেই যায়। তিনি কি কেবল জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে দুই দলের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইছেন? নাকি এটি কোনো কৌশলগত পরিকল্পনা, যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ভেতর থেকেও বিএনপিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হতে পারে?
যাই হোক না কেন, একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য বিএনপি যদি নিজের অবস্থান দুর্বল করে, তবে তা দলের জন্য ক্ষতির কারণই হবে।
অপু বিশ্বাস আওয়ামী লীগ সমর্থিত নায়িকা হওয়া সত্ত্বেও বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে অতিথি হওয়া ছিল অনুচিত। এ ঘটনায় বিএনপির সাংগঠনিক দূরদর্শিতার অভাব প্রকাশ পেয়েছে।সাধারণ কর্মীরা বিষয়টিকে তাদের ত্যাগ-সংগ্রামের প্রতি অবমূল্যায়ন হিসেবে দেখছেন।তারকা নির্ভর রাজনীতি দলীয় স্বকীয়তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।যদি কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে দলের ভেতরে আস্থা সংকট আরও বাড়বে।
অপু বিশ্বাসকে বিএনপির মঞ্চে বসানো কেবল একজন নায়িকার উপস্থিতি নয়, বরং এটি ছিল রাজনৈতিক কৌশলগত ব্যর্থতা। এতে বিএনপির সাংগঠনিক দূর্বলতা, অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব সংকট এবং ত্যাগী কর্মীদের প্রতি অবহেলা প্রকাশ পেয়েছে। একটি দলের জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি তার কর্মীরা। যদি তাদের মনোবল ভেঙে যায়, তবে সেই দল কখনোই আন্দোলনে সফল হতে পারে না।
সুতরাং বিএনপির জন্য জরুরি হলো— জনপ্রিয়তার মোহ ত্যাগ করে দলীয় স্বকীয়তা, আদর্শ এবং কর্মীদের ত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করা। অন্যথায় অপু বিশ্বাসের মতো ছোট একটি ঘটনা ভবিষ্যতে বড় সংকটে রূপ নেবে এবং দলের রাজনীতি জনআস্থার জায়গা থেকে আরও সরে যাবে।
লেখক : সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা।
শিক্ষাবার্তা /এ/০ ৬/০৯/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
