এইমাত্র পাওয়া

সংস্কারের বদলে আরও অগোছালো শিক্ষা খাত

নিউজ ডেস্ক।।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এক বছর পার হলেও শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কারের কাক্সিক্ষত কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। তবে পাঠ্যবইসহ কিছু বিষয়ে নীতিগত পরিবর্তন এলেও ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তন, প্রশাসনিক জটিলতা এবং শিক্ষা প্রশাসনে সিদ্ধান্তহীনতা এবং নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নে গড়িমসি দেখা গেছে। ফলে শিক্ষা খাত সংস্কার-প্রত্যাশার বদলে আরও অগোছাল হয়ে পড়ছে।

গত এক বছরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে তিনজন সচিব পরিবর্তিত হয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর প্রথমে এ বিভাগে সিনিয়র সচিব পদে চুক্তিভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয় অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ আবদুর রশীদকে। পরে তাকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব করা হলে আরেক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিদ্দিক জোবায়েরকে এই বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব পদে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

রাত ৩টায় এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্তের ঘটনায় শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয় সরকার। এরপর রুটিন দায়িত্ব পালন করেন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মজিবুর রহমান। সর্বশেষ সচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন রেহানা পারভিন।

গত মার্চে নতুন শিক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সি আর আবরারকে। তখন শিক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক এম আমিনুল ইসলাম পদত্যাগ করেন। আর শিক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদকে সরিয়ে শুধু পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রাখা হয়। এই ঘন ঘন পরিবর্তনের ফলে মন্ত্রণালয়ে নীতির ধারাবাহিকতা হারিয়েছে শিক্ষা খাত। কাঠামোগত সংস্কারের পথ বন্ধ হয়ে দৈনন্দিন কাজকর্মেও শ্লথগতি দেখা দেয়।

ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রভাব শিক্ষানীতির বাস্তবায়নে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ঘোষণা দিয়েছিল, শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অসঙ্গতি দূর করতে এবং আধুনিকায়নের জন্য সমন্বিত সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু সচিব পরিবর্তনের ফলে প্রতিবারই নীতির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে। একজন সচিব যেটি শুরু করেছেন, তার উত্তরসূরি তা অগ্রাধিকার দেননি, বরং নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষাক্ষেত্রে নীতির ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচিব পরিবর্তন হলে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনিশ্চয়তায় পড়ে যান। এতে কার্যকর কোনো অগ্রগতি হয় না, বরং আগের কাজগুলোও থমকে থাকে।’

শুধু নীতি সংস্কার নয়, চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোও নেতৃত্ব পরিবর্তনের ধাক্কায় স্থবির হয়ে পড়েছে। মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে কয়েকটি বড় প্রকল্প কাগজে আছে, কিন্তু মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে মাঠপর্যায়ে তা শুরু হয়নি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘প্রতিবার নতুন সচিব এলে তিনি আগের অগ্রাধিকারের চেয়ে নতুন কিছুতে মনোযোগ দেন। এতে প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের গতি কমে যায়। আমলারা বুঝতে পারেন না কোন কাজে আগে এগোতে হবে।’

প্রশাসনিক অস্থিরতার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট, পাঠ্যবই সরবরাহে বিলম্ব, পরীক্ষার সময়সূচিতে অনিশ্চয়তা- এসব সমস্যার সমাধানে হিমশিম খায় মন্ত্রণালয়।

রাজধানীর একটি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ‘প্রশাসনে স্থিতিশীলতা না থাকলে মাঠে সঠিক দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় না। পরীক্ষার ক্যালেন্ডার থেকে পাঠ্যবই বিতরণ- সবকিছুতেই সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়। এতে শিক্ষার্থীরা মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েন।’

মিরপুরের একজন অভিভাবক রুবিনা হক বলেন, ‘আমার মেয়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। অথচ রাত ৩টায় সরকার সিদ্ধান্ত দেয় পরদিন পরীক্ষা হবে না। এরূপ আগে কখনো দেখি না। শিক্ষার বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি হলো কোচিং বাণিজ্য। এ নিয়ে কোনো কিছুই করছে না মন্ত্রণালয়। এত সংস্কার এখন; কিন্তু শিক্ষার সংস্কার কোথায়?’

শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থবিরতার উদাহরণ রয়েছে ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতির ক্ষেত্রে। অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, শিক্ষানীতি হালনাগাদ করে প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষতাভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু সচিব পরিবর্তনের কারণে নীতিমালা প্রণয়নের কাজ থমকে গেছে।

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে অবহেলা হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত সংস্কারের পথে প্রধান বাধা তিনটি- নেতৃত্বে ধারাবাহিকতার অভাব, নীতি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং প্রশাসনিক জটিলতা। এর মধ্যে সচিব ও উপদেষ্টার পরিবর্তন এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে। ফলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা অগোছাল হয়ে পড়েছে।’

শিক্ষানীতি গবেষক খায়রুল আলম বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন হবে না, ততক্ষণ কোনো টেকসই সংস্কার সম্ভব নয়। অন্যদিকে ঘন ঘন সচিব পরিবর্তন শিক্ষার প্রশাসনিক দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।’

অন্যদিকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয়করণের দাবি জানিয়ে আসছেন। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও পদোন্নতির সমস্যা সমাধান হয়নি। শিক্ষক সংগঠনগুলো আন্দোলন করলেও মন্ত্রণালয় সাড়া দিতে পারেনি। বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘স্থায়ী নেতৃত্ব না থাকায় আমাদের দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনাও এগোয় না। নতুন সচিব আসলে সবকিছু পুনরায় ব্যাখ্যা দিতে হয়। ফলে সমাধানহীনতা চরমে পৌঁছায়।’

উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন, জনপ্রশাসন, গণমাধ্যম, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য খাত, শ্রম খাত ও নারী বিষয়ে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করে প্রতিবেদন প্রকাশ ও সুপারিশ প্রণয়ন এবং আলাপ-আলোচনার পর বাস্তবায়নের পর্যায়ে এলেও শিক্ষা খাত সংস্কারে কোনো কমিশন গঠন করেনি। আমাদের সময়

শিক্ষাবার্তা /এ/২০/০৮/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.