নিজস্ব প্রতিবেদক।।
দেশের বেশির ভাগ সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নির্ধারিত বেডের তুলনায় বেশি রোগীকে ভর্তি থাকতে দেখা যায়। বিশেষ করে ঢাকা জেলার বাইরে অবস্থিত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর চাপ অনেক বেশি। রোগীর এ বাড়তি চাপ সামলাতে অনেক সময় হিমশিম খেতে হয় হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের। শয্যা সংখ্যা ও জনবল সংকটে মানসম্মত সেবা দিতে পারছে না বেশির ভাগ সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুসারে, মেডিকেল কলেজগুলোর শয্যা সংখ্যা পূরণের হার ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৩৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২১৫ দশমিক ৪১, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৯৪ দশমিক ৫৮, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৮১ দশমিক ৩০, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৭৪ দশমিক ৪৬, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৬২ দশমিক ৬২, শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৩৯ দশমিক ৮৫, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৩২ দশমিক ৫০, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২৪ দশমিক ৮৩, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১৭ দশমিক ৪৬ ও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওপরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেড অকুপেন্সি রেট বা শয্যা পূরণের হারের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সক্ষমতার তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ রোগীকে সেবা দিচ্ছে হাসপাতালটি। এ হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা এক হাজার। শয্যা পূরণের হার ২৩৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এ পরিসংখ্যান ২০২৪ সালের। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ বুলেটিন ২০২৩-এর তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালটিতে বেড অকুপেন্সি রেট ৩২৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ ২০২৩ সালে এখানে প্রতিদিন গড়ে রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন শয্যা সংখ্যার সোয়া তিন গুণেরও বেশি।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে ২০২৪ সালে চিকিৎসা নিয়েছে ১৫ লাখ ৩২ হাজার ৫৩৫ রোগী। এর মধ্যে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ৩ লাখ ২১ হাজার ৫২৪। আউটডোরে চিকিৎসা নিয়েছে ১১ লাখ ৩৯ হাজার ও জরুরি বিভাগে ৭১ হাজার ৮০০ জন।
সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। বারান্দার দুই পাশে রোগী ভর্তি থাকায় হেঁটে চলাও দায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, এক হাজার শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন রোগী ভর্তি থাকে প্রায় চার হাজার। এছাড়া হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দালাল আর শয্যা সংকটের কারণে রোগীদের সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
মমেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মাইন উদ্দিন খান বলেন, ‘এত বেশি রোগীর চিকিৎসা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়। এরপর রয়েছে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারী সংকট।’
মমেক হাসপাতালের উপপরিচালক (প্রশাসন) ডা. জাকিউল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি সেবা দেয়ার। রোগীর চাপের কারণে হিমশিম খেতে হয়। কয়েকটি ভবনের কাজ চলছে। কাজ শেষ হলে ভোগান্তি কিছুটা কমবে।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে গড়ে প্রতি বছর বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ ও হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ১০-১২ লাখের বেশি রোগী চিকিৎসা নেয়। হাসপাতালের ২ হাজার ২০০টি সাধারণ শয্যার বিপরীতে প্রতি বছর এ বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দিচ্ছেন কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সরা। চমেকে আইসিইউ শয্যা এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতির সংকট রয়েছে।
দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মধ্যে শয্য সংখ্যার বিবেচনায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবস্থান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরেই। চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলার রোগীদের চিকিৎসার সবচেয়ে বড় গন্তব্য চমেক হাসপাতাল। কয়েক বছর ধরেই এ হাসপাতালে শয্যার বিপরীতে দেড় গুণের বেশি রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। এমনকি চমেকের জরুরি ও বহির্বিভাগে রোগীর চাপ বাংলাদেশের অন্যান্য সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তুলনায় বেশি। আশপাশের অনেক জেলা থেকে রোগী আসায় অনেকে বাংলাদেশের ব্যস্ততম হাসপাতালের তকমা দিয়েছেন এ হাসপাতালকে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দীন বলেন, ‘চমেক হাসপাতালের বাজেট দেশের অন্য হাসপাতালের তুলনায় কম। হাসপাতালের অনেক যন্ত্রপাতি অকেজো পড়ে আছে। আমরা সেগুলো সংস্কার করছি। চিকিৎসকেরও সংকট আছে। এত সংকটের পরও চমেকের চিকিৎসকরা ওয়ার্ড থেকে শুরু করে জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগে সর্বোচ্চ দায়িত্বসহকারে সেবা দিচ্ছেন। শয্যা সংখ্যার তুলনায় রোগীর চাপ এখানে বেশি। চমেকে বার্ন ইউনিটের নির্মাণকাজ চলছে। এই বিশেষায়িত ইউনিট হলে আমরা কিছু সমস্যা সমাধান করতে পারব।’
বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল (শজিমেক) কলেজ হাসপাতালে শয্যা পূরণের হার ২১৫ দশমিক ৪১। শজিমেক পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ রোগী এ হাসপাতালে ভর্তি থাকে। বগুড়ার রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে ৫০০ শয্যা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ২০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় লোকবল না থাকায় এ নতুন শয্যা চালু হয়নি। বর্ধিত শয্যার জন্য লোকবল নিয়োগের পর আরো বেশি মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেয়া যাবে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সিলেট বিভাগের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল ৯০০ শয্যাবিশিষ্ট সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। হাসপাতালটির বেড অকুপেন্সি রেট ১৮১ দশমিক ৩০ শতাংশ। এ হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন তিন-চার হাজার রোগী সেবা নেয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ২০২৪ সালে কতজন রোগী সেবা নিয়েছে সে তথ্য দিতে না পারলেও আনুমানিক ১৫ লাখ রোগী চিকিৎসা নেয়ার কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে ভর্তি ও জরুরি বহির্বিভাগের রোগীও রয়েছে।
সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার জেলার রোগী ছাড়াও পার্শ্ববর্তী অন্য জেলার রোগীরাও এ হাসপাতালে আসে। সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের গাইনি, শিশু, কার্ডিওলজি, অর্থোপেডিকসহ প্রায় সবক’টি বিভাগের ওয়ার্ডের বাইরে রোগীরা বারান্দার মেঝেতে শুয়ে আছে। হাসপাতালের দুটি ভবনের সর্বত্র রোগীর ভিড়।
কম জনবল নিয়েও রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানান হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সৌমিত্র চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‘৯০০ বেডের হলেও হাসপাতালে মাত্র ৫০০ বেডের সুযোগ-সুবিধা আছে। ধারণক্ষমতা না থাকায় কোনো রোগী কিন্তু ফিরে যায় না। গড়ে প্রতিদিন তিন-চার হাজার রোগী চিকিৎসাসেবা নিয়ে থাকে। কম জনবল নিয়ে আমরা আন্তরিক সেবা দিয়ে যাচ্ছি।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঘাটতি সব ক্ষেত্রেই আছে। অনেক হাসপাতালে শয্যা থাকলেও লোকবলের অভাবে তা চালু করা যাচ্ছে না। লোকবলের অভাব পূরণে চলতি মাসে একটি স্পেশাল বিসিএস নেয়া হবে। এর আগের বিসিএসেও অনেক চিকিৎসক নেয়া হয়েছে।
এর মাধ্যমে দেশে যে চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে তা কিছুটা হলেও পূরণ হবে। স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী দেশে এখনো ১২ হাজার চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে। একবারে তো সব ঘাটতি পূরণ সম্ভব না। আমরা পর্যায়ক্রমে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা করছি।’
শিক্ষাবার্তা /এ/০৬/০৭/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
