ঢাকাঃ গত বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে ১৯৬ জন উপসচিবকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। তবে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বারবার পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তারা এবারও বঞ্চিত হয়েছেন। অথচ গত সরকারের সুবিধাভোগী কিছু কর্মকর্তা ঠিকই পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়েছেন।
পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একজন বিসিএস (প্রশাসন) ২৪ ব্যাচের কর্মকর্তা রাসেল মনজুর। শিক্ষা জীবনের প্রতিটি স্তরে তার প্রথম স্থান রয়েছে। বিগত সরকারের আমলে রাজশাহী বিভাগের একটি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন। তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার ও পরবর্তী সময় সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদের অন্যায় আবদার না শোনায় বিএনপি-জামায়াত ট্যাগ দিয়ে এবং ‘অসদাচরণের’ অজুহাত দিয়ে তার বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে বিরূপ মন্তব্য লেখা হয়। শুধু তাই নয়, ২০১৬ সালের জুনে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় বিভাগীয় মামলা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা শাখা দীর্ঘ তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে আনা অসদাচরণের অভিযোগ সম্পর্কে কোনো প্রমাণ খুঁজে পায়নি। পরে ২০১৭ সালে নির্দোষ হিসেবে তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপরও বিভিন্ন সময় অন্যান্য ব্যাচের (তার জুনিয়র ২৫, ২৭, ২৮ ও ২৯ ব্যাচ) কর্মকর্তাদের উপসচিব পদোন্নতি দেওয়া হলেও তাকে পদোন্নতিবঞ্চিত করা হয়। অবশেষে গত আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বঞ্চিত হিসেবে তাকে সিনিয়রিটি দিয়ে উপসচিব পদোন্নতি দেওয়া হয়। পরে ২৪ ব্যাচের উপসচিবদের যুগ্ম সচিব পদোন্নতির জন্য বিবেচনায় আনা হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ২০ মার্চ যুগ্ম সচিব পদোন্নতি দেওয়া হলে তার ভাগ্যে এবারও নিয়মিত পদোন্নতি জোটেনি। এ রকম অনেক কর্মকর্তা যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতিবঞ্চিত হয়েছেন।
এবারের পদোন্নতিতে বিসিএস (প্রশাসন) ২৪ ব্যাচকে নিয়মিত হিসেবে বিচেনায় নিয়ে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। পদোন্নতি দিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) দফায় দফায় বৈঠক করেছে। বৈঠকে পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের আমলনামা বিশেষভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তাদের চাকরি জীবন, ব্যক্তিগত ও পারিবারিকসহ অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে তথ্য চাওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন সভায় পর্যালোচনা করে বিবেচনায় নিয়ে পদোন্নতিযোগ্য বলে চূড়ান্ত করা হয়। এরপরও ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রীদের একান্ত সচিব ছিলেন বা জেলা প্রশাসক (ডিসি) ছিলেন- এমন কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ মহলে আলোচনা চলছে। আলোচনা হচ্ছে বঞ্চিতদের নিয়েও। তাই বঞ্চিত কর্মকর্তারা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করে আবেদন করতে পারেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রমতে, যুগ্ম সচিব পদোন্নতির তালিকায় অনেকেই ফ্যাসিস্ট সরকারের মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রীর পিএস ও বৈদেশিক মিশনে আওয়ামী পরিচয়ে সুবিধাভোগী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কর্মরত (উপসচিব) ড. চিত্রলেখা নাজনিন। তিনি ২০২২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আস্থাভাজন হওয়ার সুবাদে রংপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে নিয়োগ পান। রংপুর রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক তাকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন না করায় ওই শিক্ষককে অপমান ও হেনস্তা হতে হয় ওই সময়। এ নিয়ে তীব্র সমালোচনার জেরে ক্ষমা চেয়ে পার পান। তিনিও এবার পদোন্নতি পেয়েছেন। একই সময় জামালপুরের জেলা প্রশাসক ছিলেন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সচিব (উপসচিব) শ্রাবন্তী রায়। বিগত সরকারের সুবিধাভোগী এ কর্মকর্তাও যুগ্ম সচিব পদোন্নতি পান।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের একান্ত সচিব (পিএস) ছিলেন উপসচিব (বিসিএস ২৪ ব্যাচ) আবু সালেহ মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ। তিনি যেমন পদোন্নতি পেয়েছেন, প্রথম ধাপে তেমনি তৎকালীন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর একান্ত সচিব (উপসচিব) মোহা. আমিনুর রহমানের পদোন্নতি নিয়েও বিস্তর সমালোচনা চলছে প্রশাসনে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মিজ সাহেলা আক্তার ছিলেন শেরপুরের জেলা প্রশাসক। তিনিও পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। একইভাবে সুবিধা পান গাইবান্ধার সাবেক ডিসি অলিউর রহমান, ঝিনাইদহের সাবেক ডিসি মনিরা বেগম কর্মকর্তারা। যুগ্ম সচিব পদোন্নতি পাওয়া উপসচিব তানভীর আহমেদ সাবেক আইন সচিব জহিরুল ইসলামের পিএস ছিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পুনরায় ক্ষমতায় আনতে মোনাজাত করে বিতর্কিত হওয়া সাবেক ডিসি মোমিনুর রশিদের ভাগ্নে তানভীর।
এবারও সেসব কর্মকর্তা বঞ্চিত হওয়ায় ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। গেল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো কারণ ছাড়াই রাজনৈতিক কারণ দেখিয়ে অসংখ্য মেধাবী কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বঞ্চিত করা হয়েছিল।
বর্তমানে প্রশাসনে যুগ্ম সচিবের সংখ্যা হলো ১ হাজার ৩৫ জন। ২০০৪ সালের বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২৪ ব্যাচে ৩৩৬ কর্মকর্তা যোগদান করেন। এর মধ্যে ১৫৫ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হলো। বাদ পড়লেন ১৮৮ কর্মকর্তা। এ ছাড়াও বিসিএস ইকোনোমিক ক্যাডারের পদোন্নতিযোগ্য ছিলেন ২০ কর্মকর্তা। এর মধ্যে পদোন্নতি পেলেন ১৬ জন। বাদ পড়েন ৪ কর্মকর্তা।
যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ও ৩০ শতাংশ অন্যান্য ক্যাডারের উপসচিব পদে কর্মরতদের বিবেচনায় নেওয়ার নিয়ম রয়েছে।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/২৩/০৩/২০২৫
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল