শিক্ষার বাজেট পুনর্বিবেচনার পরামর্শ শিক্ষাবিদদের

শিক্ষাবার্তা ডেস্ক, ঢাকাঃ জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো মনে করে, একটি দেশের মোট জিডিপির ৬ শতাংশ কিংবা বাজেটের অন্তত ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় হওয়া উচিত। তবে বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছর ধরে শিক্ষায় বরাদ্দ বাজেটের ১২ শতাংশের ওপর উঠছে না। এমনকি জিডিপির বিপরীতে এ খাতে বরাদ্দ ক্রমেই কমছে। এ অবস্থায় শিক্ষা খাতের স্বার্থে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে চলতি অর্থবছরের বাজেট পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। এ খাতে নেয়া প্রকল্পগুলোর যথার্থতা যাচাই এবং এগুলো কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা নেয়া হয়েছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা উচিত বলে মনে করছেন তারা।

সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ ছিল জিডিপির ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

জাতীয় সংসদে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব করা হয় গত ৬ জুন। এ বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয় ৯৪ হাজার ৭১০ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ। শিক্ষা খাতের আওতাভুক্ত দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩৮ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য ৪৪ হাজার ১০৮ কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য ১০ হাজার ৬০২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, জিডিপির বিপরীতে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বিবেচনায় বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা ১৫টি দেশের মধ্যে ১৩তম। এ তালিকায় বাংলাদেশের নিচে থাকা দেশগুলোর অধিকাংশই অতিদরিদ্র।

দক্ষিণ এশিয়ায় জিডিপির বিপরীতে শিক্ষা খাতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে ভুটান। দেশটিতে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ মোট জিডিপির ৮ দশমিক ১ শতাংশ। এছাড়া এ বরাদ্দের হার ভারত ও মালদ্বীপে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং আফগানিস্তানে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বরাদ্দ কম রাখাই একমাত্র সমস্যা নয়। যে বরাদ্দ দেয়া হয়, সেটাও সঠিকভাবে ব্যয় হয় না। বাজেটের একটি বড় অংশই ব্যয় হয় অবকাঠামো নির্মাণে। কিন্তু এর বিপরীতে শিক্ষার মান উন্নয়নে তেমন কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না।

শিক্ষার বাজেট নিয়ে গবেষণা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু ইউসুফ।  তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে শিক্ষা ও প্রযুক্তির বরাদ্দ একসঙ্গে দেয়া হয়, এটি উচিত নয়। শিক্ষার জন্য বরাদ্দ আলাদাভাবে দেয়া উচিত। ইউনেস্কো শিক্ষা খাতে যে পরিমাণ বরাদ্দের পরামর্শ দেয়, বর্তমানে আমাদের দেশে শিক্ষায় বরাদ্দ সে তুলনায় অর্ধেক। এ বরাদ্দের একটি বড় অংশ আবার ব্যয় হয় অবকাঠামো নির্মাণে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বা শিক্ষার মান উন্নয়নে উদ্যোগ কম দেখা যায়। এছাড়া অনেক সময় রাজনৈতিক বিবেচনায়ও প্রকল্প নেয়া হয়। শিক্ষা খাতের উন্নয়ন চাইলে এসব বিষয়ে পরিবর্তন আনতে হবে।

তিনি আরো বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত বাজেট পুনর্বিবেচনা করা। শিক্ষার ক্ষেত্রে যেসব প্রকল্প নেয়া হয়েছে, সেগুলোর ব্যয় সঠিকভাবে নিরূপণ করা হয়েছে কিনা এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো প্রকল্প নেয়া হয়েছে কিনা, সেটি দেখা দরকার। যদি কোথাও ব্যয় কমানোর সুযোগ থাকে, তবে সেটি কমিয়ে গবেষণা বা শিক্ষার মান উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। এছাড়া শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নির্ধারণ করা উচিত বর্তমান বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। শিক্ষকদের জন্য একটি স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো বিবেচনা করাও জরুরি।’

এদিকে চলতি অর্থবছরের এডিপি অনুযায়ী, শিক্ষা খাতের দুই মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৬৫টি প্রকল্প রয়েছে, যার ৫৯টি ভবন নির্মাণসংক্রান্ত। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ৫৮টি প্রকল্পের মধ্যে ভবন নির্মাণসংক্রান্ত ৫৫টি। আর প্রাথমিক ও গণশিক্ষার সাতটির মধ্যে ভবন নির্মাণের প্রকল্প চারটি।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অধীনে যেসব প্রকল্প রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে দুটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের প্রকল্পও রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি জেলায় একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে শিক্ষাবিদরা বলছেন, গত এক দশকে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করা হয়েছে, প্রায় সবগুলোই শিক্ষক সংকটসহ বিভিন্ন সংকটে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের বিষয়ও পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আক্তার বানু বলেন, ‘শিক্ষায় আমাদের বাজেট একেবারেই কম। এটি আরো অনেক বাড়ানো প্রয়োজন। শুধু বাজেট বাড়ালেই হবে না, উপযুক্ত খাতও বের করতে হবে। যেমন—জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা নেই বললেই চলে। এ অর্থ যদি গবেষণা বা শিক্ষার মান উন্নয়নে ব্যয় করা যেত, তখনই শিক্ষায় পরিপূর্ণতা খুঁজে পাওয়া যেত। তবে আরো অধিক শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার সু্যোগ দিতে আমরা চাইলে স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আসনসংখ্যা বাড়িয়ে ডাবল শিফটে ক্লাস শুরুর উদ্যোগ নিতে পারি। এছাড়া শিক্ষকতায় মেধাবী শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তুলতে বেতন-ভাতা এবং সুযোগ-সুবিধাও বাড়াতে হবে।’ সূত্রঃ বণিক বার্তা

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/১৮/০৮/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.