এইমাত্র পাওয়া

নতুন কাস্টমস আইনের কিছু ধারা নিয়ে অসন্তোষ

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

রাজস্ব সংগ্রহ ও বাণিজ্য সহজীকরণের লক্ষ্যে নতুনভাবে কাস্টমস আইন ২০২৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। এজন্য কাস্টমস অ্যাক্ট ১৯৬৯ রহিত করা হয়েছে। গত ৬ জুন এ আইনটি কার্যকর হয়। রাজস্ব সংগ্রহ ও বাণিজ্য সহজীকরণে নতুন আইনে ২৬৯টি ধারা সংযুক্ত করা হয়েছে। এ আইনে শুল্ক ফাঁকি রোধ, বন্দরে কন্টেইনার জট এড়ানো, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানি প্রতিরোধে আগের তুলনায় কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু আইনটির ধারা ৮২ দফা (ঘ) এবং ১৭১ এর উপধারা (১) এর ক্রমিক নং-৯ এ উল্লেখিত বিধান নিয়ে সিঅ্যান্ড এফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে সিঅ্যান্ড এফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন ধারাটি বাতিলের জন্য সভা-সমাবেশসহ অর্থমন্ত্রী ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করেছে।

আলোচিত সেই কাস্টমস আইন ২০২৩ এর ৮২ ও ধারা ১৭১ এর উপধারায় (১) রয়েছে মূলত আমদানিকারক ও রফতানিকারকের দায়িত্ব। এতে বলা হয়- আমদানি বা রফতানির জন্য পণ্য ঘোষণাকারী বা যার পক্ষে উক্তরূপ ঘোষণা প্রদান করা হয়েছে, এরূপ ব্যক্তি নিম্নলিখিত বিষয়সমূহের জন্য দায়বদ্ধ থাকবেন, যথা-

(ক) পণ্য ঘোষণার প্রদত্ত তথ্যের সঠিকতা এবং সম্পূর্ণতা।

(খ) উপস্থাপিত যে কোনো দলিলের সত্যতা।

(গ) প্রযোজ্য ক্ষেত্রে, প্রদেয় সকল শুল্ক, কর ও অন্যান্য চার্জ পরিশোধ এবং প্রাসঙ্গিক কাস্টমস পদ্ধতির অধীন সংশ্লিষ্ট পণ্য ন্যস্ত করা সম্পর্কিত অন্যান্য সকল বাধ্যবাধকতা প্রতিপালন; এবং

(ঘ) যথাযথ কর্মকর্তার অনুরোধে এবং উক্ত কর্মকর্তা কর্তৃক নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কোনো উপযুক্ত ফরমে চাহিদামত সকল দলিল ও তথ্য দাখিল এবং আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন বা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় সকল সহায়তা প্রদান; তবে শর্ত থাকে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কোনো এজেন্ট কর্তৃক উক্ত ঘোষণা প্রদান করার ক্ষেত্রে, উক্ত এজেন্টও উপরিউক্ত দফা (ক), (খ) ও (ঘ) তে উল্লিখিত বাধ্যবাধকতার জন্য দায়ী থাকিবেন।

১৭১ এর উপধারা (১) এর ক্রমিক নং-৯- এ যা আছে:

কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে আমদানি/রফতানির বিষয়ে অসত্য বিবৃতি প্রদান বা দলিলপত্র দাখিল করলে শুল্ক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফাঁকিকৃত শুল্ক করের অন্যূন দ্বিগুণ কিন্তু অনধিক চারগুণ পরিমাণ অর্থ জরিমানাসহ সংশ্লিষ্ট পণ্য বাজেয়াপ্ত করা হবে; অথবা আদালত কর্তৃক দোষী প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অনধিক ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ফাঁকিকৃত করের অন্যূন দিগুণ অনধিক চারগুণ পরিমাণ অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং সংশ্লিষ্ট পণ্য বাজেয়াপ্ত হবে।

সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন যা বলছে:

ক। কাস্টমস এজেন্টস লাইসেন্সিং বিধিমালা-২০২০ অনুযায়ী কাস্টমস কর্তৃপক্ষ লাইসেন্স প্রদান করেন ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসগণ লাইসেন্স গ্রহণ করেন। সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স প্রাপ্ত এজেন্টসগণ আমদানিকৃত পণ্য খালাস ও রফতানিতব্য পণ্য চালান রফতানির জন্য আমদানিকারক বা রফতানিকারক কর্তৃক প্রদত্ত দলিলাদের ভিত্তিতেই কাস্টমস আইন, ২০২৩ ধারা ৮১ এর উপ-ধারা (১) এর দফা (ক) , (খ) ও (গ) অনুসারে রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত ফরম ও পদ্ধতিতে কম্পিউটার সিস্টেমে অথবা ইলেকট্রিক সিস্টেম না থাকলে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আমদানিকারক বা রফতানিকারকের পক্ষে পণ্য ঘোষণা দাখিল করে। আমদানিকারক বা রফতানিকারক কর্তৃক সরবরাহকৃত জাহাজীকরণ দলিলাদি এবং ঋণপত্র সংক্রান্ত ব্যাংকের কাগজপত্রের ভিত্তিতেই সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কর্তৃক বিল অব এন্ট্রি দাখিল বা ঘোষণা প্রদান করা হয়।

খ) উক্ত ঘোষণা দাখিলের সময় এর সত্যতা সম্পর্কে একজন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এর পক্ষে কোনোভাবে নিশ্চিত হওয়ার বাস্তবভিত্তিক কোনো সুযোগ থাকে না; যতক্ষণ পর্যন্ত না কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কর্তৃক উক্ত পণ্যের কায়িক পরীক্ষা করা হয়। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এর কার্যাবলী সম্পর্কে সম্যক ধারণা ব্যতিরেকে কাস্টমস আইন, ২০২৩ এর ধারা ৮২ দফা (ঘ) এর ২য় প্যারায় ভ্রান্তভাবে আমদানিকারক বা রফতানিকারকের দায় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এর ওপর আরোপ করা হয়েছে, যা অযৌক্তিক।

গ) চুক্তি আইন, ১৮৭২ এর ধারা ১৮২ এর বিধান অনুসারে এজেন্ট হলো এমন একজন ব্যক্তি, যিনি অন্যের জন্য কোনো কাজ করতে বা তৃতীয় ব্যক্তির সঙ্গে লেনদেনে অন্যের প্রতিনিধিত্ব করতে নিযুক্ত হন। সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্টসগণ আমদানিকৃত পণ্য চালান খালাস বা রফতানিতব্য পণ্য চালান রফতানির জন্য আমদানিকারক বা রফতানিকারক কর্তৃক নিযুক্ত হন।

ঘ) চুক্তি আইন, ১৮৭২ এর ধারা ২২২ এর বিধান মতে মালিক কর্তৃক এজেন্টকে আইনসম্মত কাজের ফলাফল হতে নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে। কাস্টমস আইন, ২০২৩ এর ধারা ৮২ দফা (ঘ) এর ২য় প্যারা অনুসারে আমদানিকারক বা রফতানিকারকের দায় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এর ওপর আরোপ করা হলে তা চুক্তি আইন, ১৮৭২ এর ধারা ২২২ এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।

ঙ) বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪০-এ যে কোনো নাগরিককে যে কোনো আইনসঙ্গত কারবার বা ব্যবসা পরিচালনা করার অধিকার প্রদান করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের নাগরিকের একটি মৌলিক অধিকার। কাস্টমস আইন, ২০২৩ এর ধারা ৮২ দফা (ঘ) এর ২য় প্যারা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টগণের আইনসঙ্গত কারবার বা ব্যবসা পরিচালনা করার মৌলিক অধিকার ভোগ করতে প্রবিন্ধকতা সৃষ্টি করছে এবং এটি বাংলাদেশের সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

চ) বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ এর উপ-অনুচ্ছেদ (২) অনুসারে কোনো আইন যদি সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে সে আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হয়ে যাবে।

ছ) বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৬ এর উপ-অনুচ্ছেদ (২) অনুসারে রাষ্ট্র মৌলিক অধিকারের সহিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ আইন প্রণয়ন করিবে না এবং অনুরূপ কোনো আইন পরিণত হলে তা মৌলিক অধিকারের সহিত যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইয়া যাবে।

জ) কাস্টমস আইন, ২০২৩ এর ধারা ৮২ দফা (ঘ) এর ২য় প্যারা যেহেতু বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪০ এর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, অনুচ্ছেদ ৭ এর উপ-অনুচ্ছেদ (২) এবং অনুচ্ছেদ ২৬ এর উপ- অনুচ্ছেদ (২) অনুসারে উক্ত ২য় প্যারা বাতিল হইয়া যাবে।

শিক্ষাবার্তা ডটকম/জামান/০২/০৭/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.