বিভক্তির প্রশ্নটা হচ্ছে, আমরা কি ছাত্রদের শেখাব কীভাবে দায়িত্বশীলভাবে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করতে হয় নাকি এটার ব্যবহার নিষিদ্ধ করব (যার আরেকটা অর্থ হচ্ছে, ছাত্রছাত্রীদের লুকিয়ে চ্যাটজিপিটির ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া এবং তাদের আনুষঙ্গিক ঝুঁকিতে ঠেলে দেওয়া)। সংশ্লিষ্ট সবাই সতর্কতার সঙ্গে বুঝতে চাচ্ছেন, এই প্রযুক্তি কি সত্যিই যুগান্তকারী বা আমূল পরিবর্তনের ক্ষমতা রাখে, নাকি অন্য অনেক কিছুর মতোই কিছু সাময়িক সুবিধা এনে দিচ্ছে কেবল।
২০২৩ সালের শুরুতে আমেরিকার স্কুলগুলো নড়েচড়ে বসল। বেশ কয়েক জায়গায়, ক্লাসরুমে চ্যাটজিপিটি নিষিদ্ধ করা হলো এই বলে যে যতক্ষণ না এর ব্যবহার নিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা তৈরি হচ্ছে, ততক্ষণ এর ব্যবহার বন্ধ থাকাই সমীচীন। এর মধ্যে দেখা গেল মরিয়া হয়ে শিক্ষকেরা সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে এক জোট হচ্ছেন—তাঁরা চ্যাটজিপিটি শিখতে চাচ্ছেন, বুঝতে চাচ্ছেন কী করে একে শিক্ষার কাজে ভালোভাবে ব্যবহার করা যায়।
প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ শিক্ষকই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তাঁরা ভাবছেন, চ্যাটজিপিটি এলে ছাত্রছাত্রীদের নকল করার আর প্লেজিয়ারিজম করার একটা প্রযুক্তি ছাড়া আর কিছুই না।
যাঁরা ঘরের কোণে বা ক্লাসরুমে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়া এআইকে এককথায় বাতিল করার পক্ষে না, তাঁরা বলছেন এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ইন্টারনেট বা ক্যালকুলেটর আসার পরও প্রথম প্রথম ঠিক এমনই গেল গেল রব উঠেছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, ইন্টারনেট ছাত্রছাত্রীদের শেখার ইচ্ছা বা ক্ষমতা নষ্ট করে দেবে আর ক্যালকুলেটর তো গুনতে আর হিসাব করাই ভুলিয়ে দেবে একেবারে। বাস্তবে ঘটনা আসলে তেমনটা হয়নি।
টাইম ম্যাগাজিন এই লেখা তৈরির জন্য অনেক শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। দেখা যাচ্ছে, শ্রেণিকক্ষে এআই কীভাবে ব্যবহার করা যায় সেটা বুঝতে-শিখতেই যে শিক্ষকেরা উঠেপড়ে লেগেছেন তা নয়, কী কী উপায়ে এআইয়ের ব্যবহার শিক্ষার ক্ষেত্রে ক্ষতিকর হতে পারে, সে ব্যাপারেও ব্যাপক অনুসন্ধান চলছে।
ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন কাজে এআই অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করতে শুরু করেছে—যেভাবে নিজেদের কাজ সহজ বা পরিশ্রম লাঘব করা যায়, মূল নজর সেদিকেই। যেমন ‘ফটোম্যাথ’ দিয়ে যেকোনো গাণিতিক সমস্যার ছবি আপলোড করলেই সেটা কীভাবে সমাধান করা যাবে, তার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যাবে। ‘টোমে’ দিয়ে ক্লাসনোট থেকে রচনা বা প্রেজেন্টেশন তৈরি করার উপযোগী বর্ণনা বানানো যাবে। ‘রিডওয়াইজ’ পিডিএফ ডকুমেন্ট পড়ে শুধু দরকারি অংশগুলো চিহ্নিত করে দেবে, যেন কষ্ট করে পুরোটা পড়তে না হয়।
একজন শিক্ষক মজার একটা মন্তব্য করেছেন যে তাঁর মনে হয়েছে, ছাত্রছাত্রীর অনেকেই এআই নিজেদের কাজে ব্যবহার করছে অনেকটা একঘেয়েমি কাটানোর জন্য। তারা যে খুব আদাজল খেয়ে লেগেপড়ে এআই ব্যবহার শুরু করেছে, তেমনটা নয়, এর ব্যবহারের কি ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে ওদের খুব একটা মাথাব্যথা নেই।
অনেক শিক্ষক মনে করছেন যে এই ‘মাথাব্যথা’ ফিরিয়ে আনতে বা এআই ব্যবহারের ভালো-খারাপ দুটি দিকই ছাত্রছাত্রীরা যেন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে, সেটি নিশ্চিত করতে হলে, চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের সক্রিয় উদ্যোগ নেওয়া বিকল্প নেই।
গেল বছর যুক্তরাষ্ট্রের একটা সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৭৩ শতাংশ শিক্ষক চ্যাটজিপিটির নাম শুনেছেন, ৩৩ শতাংশ এটাকে পাঠ–পরিকল্পনা তৈরির কাজে ব্যবহার করেছেন আর ৩০ শতাংশ ব্যবহার করেছেন, ক্লাসরুমে কীভাবে আরও আকর্ষণীয়, আগ্রহ–উদ্দীপক ও শিক্ষণীয় পাঠদান করা যায়, সে রকম উদ্ভাবনী উপায় তৈরি করতে।
কী রকম হতে পারে সেই উদ্ভাবনী উপায়গুলো? সিয়াটলের একটি স্কুলে আমাদের দেশের গণিত অলিম্পিয়াডের মতো প্রতিযোগিতা হচ্ছিল। দুটি দল, চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে বিখ্যাত র্যাপার কেনি ওয়েস্টের আদলে র্যাপ গান বানিয়ে পরিবেশন করল, যা দিয়ে ভেক্টর, ত্রিকোণমিতি ও জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ইংরেজি সাহিত্যের একজন শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের অনুমতি দিলেন—তারা যেন চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে শেক্সপিয়ারের ওথেলো এখনকার আধুনিক ইংরেজিতে পুনর্লিখন করে পড়তে পারে। এতে ছাত্রছাত্রীরা শেক্সপিয়ারের কঠিন পুরোনো ইংরেজি নিয়ে শ্রম এবং সময় ব্যয় না করে, ওথেলো বুঝে এসে, ক্লাসরুমের সময়টা দিতে পারল প্রাণবন্ত আলোচনার জন্য।
সমসাময়িক ঘটনাবলি পড়ান, স্কটল্যান্ডের এমন একজন শিক্ষক, ‘সন্ত্রাসবাদের কারণ ও উৎপত্তি’র মতো জটিল বিষয় পড়াতে গিয়ে সমস্যায় পড়লেন। কারণ, তাঁর ক্লাসের ১৪-১৫ বছর বয়সী বাচ্চাদের মাতৃভাষা ইংরেজি ছিল না। চ্যাটজিপিটি তাঁকে বিভিন্ন মেধা ও পাঠের স্তরের উপযোগী করে সহজবোধ্য পড়ার উপকরণ তৈরি করে দিল।
চ্যাটজিপিটির যে সব ভালো নয় এবং তা যে চোখ বন্ধ করে ব্যবহার করা যাবে না, এ ব্যাপারে ছাত্রছাত্রীদের সচেতন করতে শিক্ষকেরা বেশ ভালো ভালো উদ্যোগ নিচ্ছেন। যেমন ছাত্রছাত্রীদের কাজ দেওয়া হচ্ছে যেন তারা চ্যাটজিপিটির লেখা রচনায় তথ্যগত ভুল আছে কি না, সেটা খুঁজে বের করে।
পানামার এক শিক্ষক বিভিন্ন সাহিত্যকর্মের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে চ্যাটজিপিটির তৈরি করা লেখার সমালোচনা করতে দিয়েছেন তাঁর ছাত্রছাত্রীদের। এই উদ্যোগগুলোর ফলে এক দিকে ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের জানা-বোঝা যাচাই হচ্ছে, অন্য দিকে তারা বুঝতে পারছে যে চ্যাটজিপিটি সব সময় সঠিক তথ্য বা বিশ্লেষণ না–ও দিতে পারে।
চ্যাটজিপিটির বিশ্লেষণের সমালোচনা করা ছাত্রছাত্রীদের কাজে শিক্ষকেরা মুগ্ধ—‘শেক্সপিয়ারের রোমিও জুলিয়েট নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের এমন আগ্রহ ও গভীর চিন্তা আমি আগে দেখিনি। তারা যখন চ্যাটজিপিটির লেখা রচনাকে নিজেদের বিশ্লেষণ দিয়ে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলছিল, তখন আমার মনে হয়েছে, “কম্পিউটারের কাছে আমরা হারব না” এ রকম একটা প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তাদের মধ্যে কাজ করেছে।’
শিক্ষকেরা বলছেন, ক্লাসরুমের বাইরে তাঁদের যে কাজগুলো করতে হয়, চ্যাটজিপিটি সেখানে অনেক সময় বাঁচিয়ে দিচ্ছে। একজন বলেছেন, ‘ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার ভর্তির জন্য আমাকে নিয়মিত যে অসংখ্য প্রশংসাপত্র লিখতে হয়, তার জন্য আমি এখন এআইয়ের সাহায্য নিই। চ্যাটজিপিটি আমাকে যে খসড়া করে দিচ্ছে, আমি নিজে লিখলে তা কখনোই এত ভালো হতো না।’
শিক্ষার্থী ও শিক্ষক দুই তরফেই, এআই বন্ধুর মতো বেশ উপযোগী একজন সহযোগী হতে পারে। একটা নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর থিসিস বা গবেষণার জন্য কী কী বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত, বিতর্কের প্রস্তুতির জন্য প্রতিপক্ষ কী কী যুক্তি দিতে পারে, সেগুলোর সবচেয়ে ভালো প্রত্যুত্তর কী হতে পারে, ভিন্ন ভাষা শিখতে যার যার উপযোগী করে সাহায্য করা, ক্লাসে পড়ানোর প্রস্তুতিতে সবচেয়ে উপযুক্ত ছবি, নকশা, ফ্লো-চার্ট তৈরি, উত্তরপত্র পরীক্ষা করে নম্বর দেওয়া এসব কাজে চ্যাটজিপিটি, গুগল বার্ড, কিউরিপড—এমন সব এআই অ্যাপ্লিকেশন এখন হরদম ব্যবহৃত হচ্ছে।
এআই শিক্ষাক্ষেত্রে একটা বড়সড় পরিবর্তনের ঢেউ এনেছে এবং আনতে যাচ্ছে—এই ব্যাপারে দ্বিমত কম; কিন্তু ঠিক কোন জায়গায় বা কী মাত্রায় ও গভীরতায় পরিবর্তন হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে গবেষক, সিদ্ধান্ত প্রণেতা ও চিন্তকদের মধ্যে মতের পার্থক্য আছে।
একটা মত হচ্ছে, শিগগিরই স্কুলগুলোর সনাতনী শিক্ষাপদ্ধতি ও কার্যক্রম অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে, যুগোপযোগী থাকবে না। অন্যরা ভাবছেন যে এআই অনেক সুবিধা এনে দিলেও শিক্ষার প্রাথমিক বা বনিয়াদি বিষয়গুলো মোটেও পাল্টাবে না।
শিক্ষার উপকরণ ও প্রযুক্তির ইতিহাস নিয়ে কাজ করেন এমন কিছু গবেষক বলছেন, এআই নিয়ে যে উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে এবং সবার মনোযোগ যে সেদিকে গেছে, এটা সাময়িক। তাঁদের মতে জেনারেটিভ এআই শিক্ষাক্ষেত্রে যে পরিবর্তন আনছে তা রূপান্তরকারী নয়।
মনে করা হচ্ছে, এআই ব্যবহারের ফলে বেশ কয়েকভাবে বৈষম্য এবং বায়াসের ঝুঁকি তৈরি হবে। প্রথমত, যেসব ছাত্রছাত্রীর পরিবার দ্রুতগতির ইন্টারনেট ব্যবস্থা করতে পারবে না, তারা পিছিয়ে পড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, চ্যাটজিপিটির মধ্যে যে বায়াস বা পক্ষপাত ঢুকে আছে (এই সিরিজের আগের এক পর্বে এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে) এর সাহায্যে তৈরি করা উত্তরপত্র বা সমাধানগুলোতে একই বায়াস থাকবে, শিক্ষার্থীরা সেগুলো শিখবে।
তৃতীয়ত, যেহেতু এআইয়ের ইন্টারনেটভিত্তিক প্রশিক্ষণ তথ্যভান্ডারে পশ্চিমা দেশগুলোর তথ্যের পরিমাণ বেশি, তাই তার তৈরি করা উত্তরে বহু অঞ্চল বা জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, দৃষ্টিভঙ্গি ও ইতিহাস সঠিকভাবে প্রতিফলিত হবে না।
শিক্ষকদের জন্য এআইয়ের এ যুগে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব এবং বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কীভাবে একদিকে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাঁরা শিক্ষার্থীদের অনুসন্ধিৎসু মন তৈরি করে তাদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা বাড়ানো অব্যাহত রাখবেন, অন্য দিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যোগাযোগ ও বিনিময় থেকে যে মানবিক মূল্য তৈরি হয়, সেটিকেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেবেন না।
যেমন সাম্প্রতিক কোভিড মহামারির সময় যে বহুসংখ৵ক শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়েছে, তাদের অন্যদের সারিতে নিয়ে আসতে হলে মানুষ-শিক্ষকদেরই সাহায্য ও সহমর্মিতা লাগবে। শিক্ষা তো শুধু বইপত্র, বিশ্লেষণী লেখা ও তথ্য সামনে হাজির করাই নয়, এগুলোর মর্মার্থকে শিক্ষার্থীর অন্তরে প্রোথিত করাই শিক্ষার উদ্দেশ্য।
শুধু এ জন্যই মানুষ-শিক্ষক ও মানুষ-শিক্ষার্থীর মধ্যকার যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই।
মিশিগানের এক হাইস্কুলের শিক্ষক বলছেন, ‘আমি যখন আমার পুরোনো ছাত্রছাত্রীদের বিয়ের অনুষ্ঠানে বা তাদের মা–বাবার শেষকৃত্যে যাই, তখন আমি তাদের জড়িয়ে ধরি, তাদের সঙ্গে উল্লাস করি, তাদের দুঃখে কাঁদি—এটা যন্ত্র কোনো দিন করবে না, যন্ত্রের পক্ষে তা করা সম্ভব নয়।’
ইশতিয়াক মান্নান আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত বিশেষজ্ঞ
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
