কিশোরগঞ্জ: কাগজে কলমে ১২০ জন শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে শ্রেণীকক্ষে উপস্থিত নেই কোনো শিক্ষার্থী।দপ্তরির দিতে হয়না ঘন্টা।বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে নেই প্রধান শিক্ষক,মোট ৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৩ জন সহকারি শিক্ষক সময় পার করছে গল্পগুজবে।তবে শিক্ষার্থীরা আসে মাঝে মধ্যে। স্কুলের হাজিরা খাতায় সন্তোষজনক উপস্থিতি লিখে রাখলেও রবিবার দিন হাজিরা খাতা শ্রেণী কক্ষে নিতে মনে ছিলোনা জানান শিক্ষকবৃন্দরা।এখানেই শেষ নয়,ছাত্রছাত্রীরা সুবিধা অনুয়ায়ী বাড়িতে বসে পরীক্ষা ও দিতে পারে।উপবৃত্তি ও সরকারি স্কুলের সার্টিফিকেট দেওয়ার প্রলোভনে ভর্তি করানোরও অভিযোগ ওঠেছে বিদ্যালয়টির শিক্ষকদের বিরুদ্ধে।
এমন চিত্র কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার পাইক লক্ষীয়া গ্রামের হাজী মোঃ মাছিম উদ্দীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের।
তবে সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিদ্যালয়টির প্রতিষ্টাতা প্রধান শিক্ষক নূরুল আফসার।তার দাবি স্থানীয় একটা পক্ষ বিভিন্ন কারনে বিদ্যালয়টিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন।এদিকে শীঘ্রই তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা।
জানা গেছে,১৯৯০ সালে পাইক লক্ষীয়া গ্রামে প্রতিষ্ঠা করা হয় বিদ্যালয়টি।২০১৩ ইং সালে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ করা হয়।প্রতিষ্টার পর থেকেই বিদ্যালয়টির এমন দৈন্যদশা বলে জানান এলাকাবাসী।
বিদ্যালয়টিতে প্রধান শিক্ষক নূরুল আফসার সহ শিক্ষক রয়েছেন আরো ৫ জন।বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষকের স্ত্রী জোসনা আক্তার সহকারি শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্বরত।অপর সহকারী শিক্ষিকা হোসনে আরা বেগম ঝরনার ছেলে মাহমুদুল হাসান রাসেল বিদ্যালয় কমিটির সভাপতি।দুই পরিবারের আধিপত্য থাকায় এলাকাবাসীর কেউ কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিকে পারিবারিক বিদ্যালয় বলে ট্রল করে থাকে।
যদিও প্রধান শিক্ষক বল্লেন ছাত্রছাত্রী প্রায় ১২০ জন,এলাকাবাসী জানান ৩০ জনের বেশি হবেনা।এছাড়াও দীর্ঘ দিন ধরেই বিদ্যালয়ে আসে না শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষকরাও নিজেদের মতো করে বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা করেন। এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত (৯জুন) রবিবার ভরদুপুরে সরজমিনে বিদ্যালয়ে গেলে দেখা যায়,জাতীয় পতাকা উড়ছে।জনশূন্য বিদ্যালয় মাট।একটু দূর হতে দেখে মনে হতে পারে পরীক্ষা চলছে।কিন্তু ভিতরেও গিয়ে দেখা গেলো অন্যরকম চিত্র।ভরদুপুরে শ্রেনীকক্ষে ছিলোনা কোনো শিক্ষার্থী।শুধু সাপ্তাহিক প্রথম কর্মদিবস রবিবারই নয়,দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার বেহাল অবস্থা এই বিদ্যালয়টিতে।
এলাকাবাসী ও অভিবাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়,বিদ্যালয়টির অনেক শিক্ষার্থী মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্টেনে পড়ে।তারা বিদ্যালয়ে এসে ক্লাস না করেই পরীক্ষার সময় বাড়িতে বসেই পরীক্ষা দেই বেশীরভাগ ছাত্রছাত্রী।
আবু কাউসার নামের একজন অভিভাবক জানান,তার মেয়ে পাকুন্দিয়া মডেল মাদ্রাসায় চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে।হাজী মাছিম উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুপারিশ করে তার মেয়েকে স্কুলটিতে ভর্তি দেখিয়ে রেখেছেন, কিন্তু সে ক্লাস করে মাদ্রাসায়।তিনি জানান, প্রধান শিক্ষক বলেছেন, মেয়ে মডেল মাদ্রাসায় পড়ুক,এখান থেকে সরকারি একটা সার্টিফিকেট নিয়ে রাখলে ভালো হবে।ওই অভিভাবক আরও জানান,তিনি প্রধান শিক্ষককে প্রশ্ন করেন একই সময়ে যদি দুই প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা হয়,তখন কী করবেন।শিক্ষক বলেন,সঠিক সময়ে মাদ্রাসায় পরীক্ষা দেবে,আর স্কুলেরটা দেবে বাসায় বসে। শিক্ষকের কথা অনুযায়ী মেয়েটি বাসায় বসেই দিতে পারে পরীক্ষা।
ফয়সাল হক রাকিব নামের একজন জানান,স্কুলটিতে ১৫ জন শিক্ষার্থীও পাওয়া যাবে না,তবে স্কুলের খাতায় অনেক বেশি দেখা যাবে।আর বিভিন্ন কর্মকর্তারা যখন বিদ্যালয় পরিদর্শনে আসেন,তখন অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীদের ডেকে আনেন শিক্ষকরা।
জালাল মিয়া নামে স্থানীয় আরেক বাসিন্দা জানান, স্কুলের শিক্ষকরা উপবৃত্তির কথা বলে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করেন।পরে আর ক্লাস করাতে দেখা যায় না।তিনি বলেন, ‘স্কুলটা সবসময় খালিই থাকে।শিক্ষকরাও মাঝেমধ্যে এসে ঘুরেফিরে চলে যান।’
জালালের সঙ্গে কথা শেষ হতেই অমিত হাসান নামের এক যুবক জানান,বিভিন্ন সময়ে খেলাধুলা থাকলে শিক্ষার্থীদের দেখা যায়,তবে শ্রেণিকক্ষে তেমন কাউকে দেখা যায় না।
গত (৯জুন) স্কুলে শিক্ষার্থী না থাকার বিষয়ে হাজী মোঃ মাছিম উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূরুল আফসার জানান, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম শ্রেণির ক্লাস ছুটি হয়ে গেছে।
কারও হাজিরা না থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভুলে হাজিরা খাতা ক্লাসে নেয়া হয়নি।’ওই সময় তিনি দ্বিতীয় শ্রেণির হাজিরা খাতায় ছয়জন শিক্ষার্থীর হাজিরা দেখান।
অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীরা কোথায় জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে।’
এ প্রতিবেদক স্কুলের পুরো কর্মঘণ্টা থেকেও কোনো শিক্ষার্থীকে আর আসতে দেখেননি।
শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির বিষয়ে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় কাউন্সিলর মাহমুদুল হাসান রাসেল জানান,এ স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কিন্ডারগার্টেনে পড়ে।তাদের রেজিস্ট্রেশন এখানে থাকলেও ক্লাস করে ওইখানে। তিনি আরো বলেন, ‘এই রকম সব স্কুলেই হয়।এ ছাড়াও কিন্ডারগার্টেনগুলোর তো পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ নেই।’
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মজিব আলম জানান, বিষয়টি তিনি জানার পরই উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন।ওই প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেয়া হয়েছে।এ বিষয়ে শীঘ্রই তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/২২/০৬/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
