এইমাত্র পাওয়া

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যেভাবে ভাবা হয়নি

ড. ফজলুল হক সৈকত।।

দেশের সর্ববৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন নতুন চিন্তা; স্বপ্নভঙ্গের ভয় আর স্বপ্নডানায় ভাসবার শিহরনে দুলছেন অনেকে, কেউ কেউ কথা বলছেন জাতীয় এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ভাঙাগড়ার কৌশল নির্ধারণ প্রসঙ্গে।

১৯৯২ সালের ২১ অক্টোবর মহান জাতীয় সংসদে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনকল্পে যে আইন (৩৭ নম্বর আইন) অনুমোদন লাভ করে, তাতে এটি প্রতিষ্ঠার পরিপ্রেক্ষিত প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘যেহেতু কলেজ শিক্ষার স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পাঠদান ও পাঠ্যসূচির আধুনিকীকরণ ও উন্নতিসাধন, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা বৃদ্ধিসহ কলেজের যাবতীয় বিষয় ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ন্যস্ত করা সমীচীন ও প্রয়োজন।

’ অতএব অনুধাবন করা যায়, সে সময় ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কার্যক্রম চলতে থাকা অধিভুক্ত সারা দেশের কলেজসমূহকে স্বতন্ত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে দেওয়া বিশেষ দরকার ছিল। হয়তো এর প্রধান কারণ ছিল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষকদের যোগ্যতার ও সংখ্যার তারতম্য, অবকাঠামো ও উপকরণের সুযোগ-সুবিধাগত বৈষম্য, প্রশাসনিক জটিলতা এবং অপ্রত্যাশিত সেশনজট। উদ্যোগটির লক্ষ্য যে ইতিবাচক ছিল, তাতে কোনো সংশয় নেই। কিন্তু প্রায় ৩২ বছরেও সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টি পৌঁছাতে পারেনি। তাই বর্তমানে এর অবস্থিতির প্রাসঙ্গিকতা কিংবা সংস্কারের চিন্তাটি নতুন করে উপস্থিত হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নাকি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। আমরা কি মনে করতে পারি যে, ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ বলতে ইট-বালু-সিমেন্ট-কাঠের তৈরি কয়েকটি ভবনমাত্র; যদি এমনটি না বুঝি, তবে অর্পিত দায়িত্ব পালন করবেন নিশ্চয় ব্যক্তিবর্গ, যেমন—উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, ডিন, রেজিস্ট্রার, কলেজ পরিদর্শক, গ্রন্থাগারিক, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, অর্থ ও হিসাব পরিচালক, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন পরিচালক এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী।

আর সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা পালন করবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষসমূহ—সিনেট, সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল বিভিন্ন স্কুল-কেন্দ্র-কমিটি ও বোর্ড। উল্লে­­খ্য, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যাত্রালগ্ন থেকে প্রায় আট বছর কোনো শিক্ষক না থাকায় (কেবল একজন প্রভাষক ছিলেন) এবং বর্তমানেও শিক্ষকস্বল্পতার কারণে সিনেট-সিন্ডিকেটসহ গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোতে শিক্ষকদের তেমন কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই; অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের অতিপ্রয়োজনীয় অ্যাকাডেমিক মনিটরিংয়ে বিরাজ করছে বিপুল স্থবিরতা। উপ-উপাচার্যের একাধিক পদ থাকলেও বেশির ভাগ সময়েই দায়িত্ব পালন করেছেন একজন উপ-উপাচার্য। প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ এবং দায়িত্ব প্রদানের দায় ও ব্যর্থতা কি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়টির? সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কি কোনো দায় নেই?

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রায় তিন দশকে পাঠদান ও ডিগ্রি প্রদানের বিষয় সংখ্যা, অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। কিন্তু সে অনুযায়ী বাড়েনি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক, উল্লেখযোগ্যভাবে অগ্রসর হয়নি অবকাঠামো ও উপকরণগত অবস্থা। কলেজ প্রতিষ্ঠা, বিষয় অধিভুক্তি, আসনবৃদ্ধি প্রভৃতি ঘটনায় সরকার এবং রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিবর্গের প্রভাব নানাভাবে ক্রিয়াশীল থাকলেও এখন সব ভার-অর্জন এবং দুর্দশার জন্য দায় চাপানোর চেষ্টা চলছে কেবল এই প্রতিষ্ঠান আর এখানে কর্মরত ব্যক্তিদের ওপর। অথচ বিস্ময়ের ব্যাপার, অধিভুক্তি প্রদান ছাড়া এসংক্রান্ত আনুষঙ্গিক ব্যাপারাদি, যেমন—নিয়োগ-পদোন্নতি-বদলি, বেতন-ভাতাদি প্রদান, জমি বরাদ্দ, ভবন নির্মাণ প্রভৃতি বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তবত কোনো করণীয় নেই। বিষয়গুলো সমন্বয় করার জন্য এ পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি), মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মধ্যে কোনো উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি কিংবা লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়নি; কোনো যুক্ত সভাও অনুষ্ঠিত হয়নি। বছরে কতটি প্রতিষ্ঠান নতুনভাবে অধিভুক্ত করা যেতে পারে, কতটি আসন বৃদ্ধি করা সম্ভব; এ ব্যাপারে সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা কী; প্রাসঙ্গিক নতুন কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগ আদৌ আছে কি না, থাকলে তা কী পরিমাণ, শিক্ষার উন্নয়নের জন্য বাত্সরিক বাজেট পরিকল্পনার প্রকৃত অবস্থা কী—এ ধরনের চিন্তা এবং উদ্যোগ-পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় দিনে দিনে জমেছে পাহাড়সম সমস্যা।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা ও দুর্দশা নিরসনে প্রথমে ভেবে দেখা দরকার এর স্থবিরতার কারণ; অতঃপর, কারণসমূহ চিহ্নিত হলে তা সমাধানের জন্য গ্রহণ করা যেতে পারে প্রাথমিক উদ্যোগ। পূর্বের মতো অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সারা দেশের কলেজ ও ইনস্টিটিউট পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বণ্টন করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে পরিপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাকেন্দ্রে রূপান্তর করা কিংবা কিছু প্রতিষ্ঠান কমিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভার লাঘব করা অথবা বিভাগীয় পর্যায়ে নতুন আটটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে কলেজ শিক্ষা তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেওয়া প্রভৃতি যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে প্রয়োজন বর্তমান অবস্থানে পরিস্থিতির ব্যাপক পর্যালোচনা ও দরকারি পদক্ষেপ বিবেচনা। কাঠামো ঠিক রেখে বিনির্মাণ করা গেলে অন্তত অনাগত নতুন নতুন প্রতিকূলতা থেকে দূরে থাকা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় ও যথেষ্টসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ, গাজীপুরে নিজস্ব ক্যাম্পাসে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পাঠদান কার্যক্রম সম্প্রসারণ, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত পদোন্নতি ও পদোন্নয়ন, অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহে নিয়মিত একাডেমিক মনিটরিং, অস্বাভাবিক-অবাস্তবভাবে বেড়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠান ও আসনসংখ্যা হ্রাস করার উপায়-অন্বেষা, অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের একাডেমিক ও প্রশাসনিক যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নির্ধারণ (অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে) নিয়োগ-পদ সৃষ্টি-বদলির প্রক্রিয়া এবং অবকাঠামো-উপকরণগত সুবিধা উন্নয়ন ও পর্যালোচনা, প্রশিক্ষণ-গবেষণা-প্রকাশনার ক্ষেত্র প্রসারণ ও সংস্কার এবং দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।

জাতি হিসেবে বাঙালি যে খুবই আবেগি, তা বোধ করি পুনর্বার প্রমাণিত হতে চলেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নামক একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে গড়ার সাম্প্রতিক উদ্যোগ-প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের এই সর্ববৃহত্ ও বিপুল সম্ভাবনাময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নানান অনিয়ম আর স্থবিরতার অভিযোগ উত্থাপিত হয়ে আসছে। বিস্ময়ের ব্যাপার, বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা ও করণীয় বিবেচনা না করে সরাসরি এর কাঠামো পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের দিকে অগ্রসর হচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি। আবার সম্প্রতি ইউজিসি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স কোর্স চালু করার বিষয়ে আপত্তি তুলেছে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান আইন অনুযায়ীই গাজীপুর ক্যাম্পাসে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করার সুযোগ রয়েছে (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ধারা ৪১-এ পাঠক্রমে ভর্তি বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘এই আইন ও সংবিধির বিধান সাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজসমূহে স্নাতক-পূর্ব, স্নাতকোত্তর ও অন্যান্য পাঠক্রমে ছাত্র ভর্তি একাডেমিক কাউন্সিল কর্তৃক এতদুদ্দেশ্যে নিযুক্ত ভর্তি কমিটি কর্তৃক প্রণীত বিধি দ্বারা পারচালিত হইবে’)। কাজেই, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সংক্রান্ত চলমান চিন্তা ও কর্ম প্রক্রিয়ায় বাস্তবতার বদলে আবেগই বেশি ক্রিয়াশীল বলে মনে হয়। আইনটির ধারা ৪-এ বর্ণিত আছে, ‘এক্তিয়ার। বিশ্ববিদ্যালয় সমগ্র বাংলাদেশে এই আইন দ্বারা বা ইহার অধীন অর্পিত সমুদয় ক্ষমতা প্রয়োগ করিবে :তবে শর্ত থাকে যে, কোনো কৃষি, চিকিত্সা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ আইনের কিছুই প্রযোজ্য হইবে না।’ আবার, ধারা ৫ জানাচ্ছে, ‘এই আইনের বিধান অনুযায়ী গাজীপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় (National University) নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হইবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়, উহার বিবেচনায় উপযুক্ত, বাংলাদেশের অন্য যে কোনো স্থানে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কেন্দ্র বা ক্যাম্পাস স্থাপন করিতে পারিবে।’ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয়সংখ্যক আঞ্চলিক কেন্দ্র বা ক্যাম্পাস স্থাপন করার সুযোগ থাকতে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা নেওয়ার কী প্রয়োজন পড়ল? আর ঐ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের নিজ নিজ সমস্যায় এখনো ভারাক্রান্ত; নতুনভাবে বর্ধিত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পড়বে বিচিত্র জটিলতা এবং অপ্রতিরোধ্য সেশনজটের কবলে। জাতির সামনে উপস্থিত হবে শিক্ষাক্ষেত্রের অনাকাঙ্ক্ষিত মহাবিভীষিকা!

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে একটি কথা খুব প্রচলিত হয়ে গেছে, তা হলো, প্রতিষ্ঠানটি নাকি একটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মতো শুধু পরীক্ষাগ্রহণ আর সার্টিফিকেট প্রদানের কাজ করছে। তথ্য না জেনে যারা ঢালাওভাবে এ ধরনের ক্ষোভ-উদ্দীপক মন্তব্য করেন, তারা বোধ হয় বিবেচনা করেন না এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজের পরিধি এবং চলমান কর্মকাণ্ডসমূহ; কোনো শিক্ষা বোর্ড নিশ্চয়ই শিক্ষক প্রশিক্ষণ, জার্নাল প্রকাশ এবং অনার্স, মাস্টার্স, এমফিল ও পিএইচডি প্রোগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও একাডেমিক দায়িত্ব পালন করে না, যা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় করছে।

আমরা দিন বদলের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি; বদল মানে পেছনে ফিরে যাওয়া নয়, প্রাসঙ্গিক সমূহ অগ্রসর-প্রবণতাকে আত্মস্থ করে সামনের দিকে ধাবমান হওয়া। তাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সংক্রান্ত সাম্প্রতিক চিন্তামালা পুনর্বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানটির চলমান অবস্থা পর্যালোচনা ও বিবেচনায় রেখে এর অগ্রগতির কৌশল-নির্ধারণ সমীচীন হবে বলে মনে করি।

লেখক :শিক্ষক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক সাধারণ

সম্পাদক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি

শিক্ষাবার্তা ডট কম/জামান/১/০৪/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading