বেতন-বোনাস বৈশাখী ভাতা ও ছুটি: বেসরকারি চাকুরেদের সব কিছুতেই কম

ঢাকাঃ গ্রামাঞ্চলে একটি প্রবাদ বাক্য প্রচলিত আছে-‘সরকারি চাকরি দুধে-ভাতে, সে যত ছোট পদই হোক।’ ‘দুধে-ভাতে’ বলতে বোঝানো হয়েছে-ভালো-মন্দ খেয়ে, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটানো। অর্থাৎ সরকারি চাকরি হলে নিশ্চিন্ত জীবন। মাসের প্রথম দিনে বেতন, ঈদ বোনাস, উৎসব বোনাস, জিপি ফান্ড, অবসরে গেলে এককালীন মোটা অঙ্কের টাকা, আরও কত কী! উপরি পাওনার কথা নাই বা টানা হলো। সেই সঙ্গে সপ্তাহে দুই দিনের ছুটি, দুই ঈদে লম্বা ছুটি। আবার এই ছুটি, সেই ছুটি তো আছেই। যেমন এবার রোজার ঈদে সরকারি ছুটি মিলছে ৮ দিন। শুরুর দিকে দুই দিন ‘ম্যানেজ’ করে নিতে পারলে এই ছুটি টানা ১০ দিনে দাঁড়াবে।

কিন্তু বেসরকারি চাকরিজীবীরা এত লম্বা ছুটি পান না। সপ্তাহে দুই দিন ছুটিও নেই। শীর্ষ কিছু পদ ছাড়া অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতনও সন্তোষজনক নয়। এক ঈদে বোনাস মেলে তো আরেক ঈদে নেই। বৈশাখী ভাতার প্রশ্নই আসে না। এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে বলা যায়, বেসরকারি চাকরিজীবীরা বেতন-বোনাস, বৈশাখী ভাতা এবং ছুটি সবকিছুই কম পেয়ে থাকেন।

জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে মানুষ কাজ করে। কেউ সরকারি চাকরি, কেউ বেসরকারি। সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও বেসরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা বিপুল। অথচ সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীর পাওয়া সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য আকাশ-পাতাল। অনেক ক্ষেত্রে আবার বেসরকারি চাকরিজীবীরা অবহেলিত ও বঞ্চিত। এদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ও অন্যান্য সুবিধা দফায় দফায় বাড়লেও বেসরকারি খাতের কর্মীদের বেতন ও অন্য সুবিধা তেমন বাড়ছে না। বেসরকারি খাতে যারা চাকরি করেন, উচ্চমূল্যের এই বাজারে তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়। সময় উপযোগী সুবিধা তো দূরের কথা, অধিকাংশ কোম্পানির নেই এইচআর নীতিমালা। ফলে যে যেমন খুশি বেতন দেয়। বেসরকারি চাকরিজীবীরা সরকারের রাজস্ব বাড়াতে বড় অবদান রাখলেও সুবিধা ভোগ করেন অন্যরা।

এবারের রোজার ঈদের ছুটি বিশ্লেষণ করলে দেখা গেছে, সরকারি চাকরিজীবীরা ৮ থেকে ১০ দিনের লম্বা ছুটি পেলেও বেসরকারি চাকরিজীবীদের অনেক ক্ষেত্রে কাজ করতে হয় ঈদের আগের দিন পর্যন্ত। সরকারি চাকরিজীবীরা যেখানে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদের তিন-চার দিন আগে গ্রামের বাড়ি গিয়ে ঈদ আনন্দ উদযাপন করেন, সেখানে বেসরকারি খাতের অনেক চাকরিজীবীর সেই সুযোগ নেই।

দেশে বেসরকারি খাতের মধ্যে সবচেয়ে বড় খাত তৈরি পোশাক শিল্প। এই খাতের তিন হাজারের বেশি কারখানায় কাজ করছেন প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক। ঈদের আগে এই খাতের অনেক কারখানায় বেতন-বোনাসের জন্য শ্রমিকদের করতে হয় আন্দোলন। আবার ছোট-মাঝারি কারখানাগুলোর অধিকাংশ মালিক বেতন দিতে পারলেও বোনাস দিতে পারেন না। যারা দেন, তারাও দেন অনেকটা নামকাওয়াস্তে। ফলে বেতন-বোনাস এবং ছুটি নিয়ে এই খাতের শ্রমিকদের সবসময় বঞ্চিত হতে হয়।

এবারের ঈদে সরকারি চাকরিজীবীরা যে লম্বা ছুটি পাচ্ছেন, গার্মেন্টস খাতের শ্রমিকরা তা পাচ্ছেন না। গার্মেন্টস খাতের শ্রমিকদের ঈদের ছুটিতে যাওয়ার আগে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারও কারখানায় কাজ করানো হয়।

বিজিএমইএ সহ-সভাপতি ও সাদমা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির উদ্দিন  বলেন, যেসব কারখানায় প্রচুর কাজ থাকে, ঈদের আগ দিয়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারেও সেসব কারখানা খোলা রাখা হয় এবং শ্রমিকরা কাজ করেন। শ্রমিকরা অবশ্য স্বেচ্ছায় ছুটির দিনে কাজ করেন। কারণ এই ছুটি তারা ঈদের ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে নেন। গার্মেন্টস খাতের শ্রমিকদের ছুটি এবং বেতন-বোনাস সরকারি আইন ও মজুরি কাঠামো অনুযায়ী দেওয়া হয়।

এবারের ঈদে গার্মেন্টস খাতের ছুটির বিষয়ে নাসির উদ্দিন বলেন, এবার গার্মেন্টস খাতের শ্রমিকরাও বেশ লম্বা ছুটি পাবেন। এ খাতের শ্রমিকরা ৭ এপ্রিল থেকে ধাপে ধাপে ছুটিতে যাবেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, একেক কারখানা মালিক তাদের কাজের চাপ ও ধরন অনুযায়ী একেক দিন ছুটি দেবেন। সে হিসেবে ৭ এপ্রিল থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত তিন দিন ধাপে ধাপে ছুটি হবে গার্মেন্টস খাতে। আমরা বিজিএমইএ থেকে মৌখিকভাবে গার্মেন্টস শিল্প মালিকদের সে রকমই নির্দেশনা দিয়েছি। ঈদের ছুটির পরপরই যেহেতু পহেলা বৈশাখের ছুটি রয়েছে, তাই ১৫ এপ্রিলের আগে গার্মেন্টস কারখানা খোলার সম্ভাবনা নেই।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, নিত্যপণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষ এমনিতেই চাপে আছে। ঈদের আগেই শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ করা উচিত। তা হলে তারা পরিবার নিয়ে ঈদ উদযাপন করতে পারবে। আর যদি কোনো প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের বেতন-বোনাস না দেয় তা হলে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

তিনি বলেন, সরকারি-বেসরকারি চাকরির সুযোগ-সুবিধার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এটা থাকবেই। উন্নত বিশ্বে যে ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে বাংলাদেশে তা নেই। যতদিন ব্যবস্থার পরিবর্তন না হচ্ছে ততদিন এই বৈষম্য থাকবেই।

শ্রম প্রতিমন্ত্রী মো. নজরুল ইসলাম চৌধুরীও নির্দেশ দিয়েছেন, এবার গার্মেন্টসসহ বেসরকারি শিল্প খাতের ছুটি সরকারি ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে দিতে হবে। তবে সরকারের এই নির্দেশনা গার্মেন্টস খাতে পুরোপুরি মানা হচ্ছে না। কারণ কারখানা মালিকরা তাদের কাজের চাপ অনুযায়ী নিজেদের মতো করে একেক এলাকার কারখানায় একেক দিন ছুটি দেবেন।

ফলে সাড়ে ১২ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতন-বোনাস, বিভিন্ন ভাতা ও ছুটি যেভাবে ভোগ করেন, বেসরকারি খাতের প্রায় দেড় কোটি কর্মকর্তা-কর্মচারী সেভাবে ভোগ করার সুযোগ পান না। সময়ের আলো

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/৩১/০৩/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.