এইমাত্র পাওয়া

আরও ১৫৬ শিক্ষকের জাল সনদ শনাক্ত

ঢাকাঃ দেশের আট বিভাগের আরও ১৫৬ জন শিক্ষকের জাল সনদ শনাক্ত করেছে শিক্ষা পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। দীর্ঘদিন চাকরির সুবাদে এসব শিক্ষক জাল সনদে সরকার থেকে প্রায় ১৫ কোটি টাকা বেতন বাবদ উত্তোলন করেছেন। তদন্ত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই অর্থ শিক্ষকদের সরকারি কোষাগারে ফিরিয়ে দিতে হবে। মঙ্গলবার জাল সনদধারী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শিক্ষামন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি। মন্ত্রণালায়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কার্যকরী প্রদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
স্কুল-কলেজের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাল সনদে শিক্ষকদের চাকরি করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

সম্প্রতি শিক্ষা পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তৎপরতায় নিয়মিতই শিক্ষকদের জাল সনদ পাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সনদ, এনটিআরসিএর সনদ ও কম্পিউটার সনদ জাল করে শিক্ষকরা দীর্ঘদিন এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। এর ফলে সরকারি অর্থ ভোগ করছেন তারা। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও উদ্যোগী হয়ে এসব অর্থ সরকারের ঘরে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

কাগজপত্র যাচাই করে জানা যায়, ১৫৬ জন জাল সনদধারী শিক্ষকের মধ্যে ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের মোট ২৯ শিক্ষকের জাল সনদ শনাক্ত করা হয়েছে। এরমধ্যে ভুয়া নিবন্ধন সনদ (এসটিআরসিএ) ১৪টি, কম্পিউটার সনদ ১২টি ও অন্যান্য সনদ রয়েছে আরও তিনটি।

চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের মোট ১০টি জাল সনদের মধ্যে নিবন্ধন সনদ ৪টি, কম্পিউটার সনদ ৩টি ও অন্যান্য আরও তিন সনদ রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি সনদ জাল পেয়েছে রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে। এই দুই বিভাগের জাল শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ৫১টি, কম্পিউটার সনদ ৪৫টি ও অন্যান্য জাল সনদ রয়েছে আরও ৪টি। সব মিলিয়ে এই দুই বিভাগের জাল সনদের সংখ্যা ১০০। খুলনা ও বরিশাল বিভাগ ১৭ শিক্ষকের জাল সনদ পেয়েছে ডিআইএ। এরমধ্যে ৪টি নিবন্ধন সনদ, ১২টি কম্পিউটার সনদ ও অন্যান্য সনদ রয়েছে একটি।

জাল শিক্ষকদের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, এসব শিক্ষক বছরের পর বছর সরকার থেকে বেতন নিয়েছেন। যাদের এখন সরকারের দেওয়া বেতন ফেরত দিতে হবে। এর মধ্যে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের এনটিআরসিএর নিবন্ধন জাল সনদধারী শিক্ষকদের ২ কোটি ৯৫ লাখ ২২ হাজার টাকা ফেরত দিতে বলা হয়েছে। কম্পিউটার জাল সনদধারী শিক্ষকদের ফেরত দিতে হবে ৬ কোটি ৩ লাখ টাকা।

অন্যান্য সনদধারীদের দিতে হবে ১ লাখ ৩৭ হাজার টাকার বেশি। চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের জাল শিক্ষকদের ফিরিয়ে দিতে হবে ৮৪ লাখ টাকা। এ ছাড়াও খুলনা ও বরিশালের দুই বিভাগের ১৭ শিক্ষককে দুই কোটি ৬৬ লাখ টাকার বেশি সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে বলা হয়েছে। ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগে জাল নিবন্ধনধারী (এনটিআরসিএ) শিক্ষকদের সরকারের কোষাগারে জমা দিতে হবে ৭২ লাখ ২৮ হাজার ২০১ টাকা। এই দুই বিভাগের যেসব শিক্ষক জাল কম্পিউটার সনদে চাকরি করেছেন তাদের ফিরিয়ে দিতে হবে এক কোটি ৬৭ লাখের বেশি। অন্যদের দিতে হবে ৬ লাখ ৯ হাজার টাকা।

দেশের একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ তসরুপ, ভুয়া নিয়োগ, জাল সনদ ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীরা নানা অনিয়ম করার পরও অদৃশ্য কারণে পার পেয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। তবে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাল সনদ ব্যাবহার, দুর্নীতি ও অনিয়মের লাগাম টানতে কঠোর হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে ডিআইএ মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। গত বছরও জাল সনদ ব্যাবহারের অভিযোগে ৬৭৮ শিক্ষক-কর্মচারীর জাল সনদ শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

গত বছরও নিবন্ধন সনদ না থাকা, নিয়োগে দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের অভিযোগে মন্ত্রণালয় থেকে অন্তত ৩০ শিক্ষক-কর্মচারীকে সরকারি কোষাগারে অর্থ ফেরতেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়।

জানতে চাইলে নিরীক্ষা ও পরিদর্শন অধিদপ্তরের পরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষক। কিন্তু শিক্ষকের সনদ যদি জাল হয় তাহলে মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

ডিআইএ এ কারণেই মাঠ পর্যায়ে তদন্তের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, দুর্নীতি ও জাল সনদ যাচাইয়ের কাজ করে আসছে। সনদ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে সনদ পাঠিয়ে সনদের সত্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এর ভিত্তিতেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। তবে এবার যেকোনো সময়ের চেয়ে ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) শিক্ষক নিবন্ধন সনদ জাল করে দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাল সনদ ব্যবহার করে বহু শিক্ষক চাকরি করছেন। এর ফলে সরকারের প্রতিবছরে ক্ষতি হচ্ছে শত শত কোটি টাকা। সম্প্রতি যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা জাল সনদ ব্যবহার করছেন শিক্ষকরা তাদের তালিকা মন্ত্রণালয় থেকে চাওয়া হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মুকেশ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ডিআইএ থেকে ১৫৬ জন জাল সনদধারী শিক্ষকের যে তালিকা পেয়েছি সে বিষয়ে কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ডিআইএ থেকে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সনদ সরবরাহকারী সংস্থার কাছে আবারও যাচাই বাছাইয়ে পাঠায়। প্রতিবেদন অনুসারে মাধ্যমিক ও উচ্চ বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে শিক্ষকদের মধ্যে জাল সনদ ব্যাবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। জাল সনদধারী শিক্ষকদের অর্থ সরকারের কোষাগারে ফেরত ও তাদের নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জাল সনদে শিক্ষকতার বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্বব্দিয়ালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।

তিনি জানান, যারা প্রতারণার মাধ্যমে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হয়েছেন, তারা শিক্ষক নামের কলঙ্ক। যাদের নৈতিকতা নেই তারা শিক্ষার্থীদের কি শিখাবেন? জাল সনদধারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৮/০২/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.