ছোট ভাইয়ের শাশুড়ির শ্রাদ্ধ শেষে ঢাকায় ফিরছিলেন পীযূষ কান্তি সরকার মনোজ। তিনি রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির বহরপুর ইউনিয়নের পাটুরিয়া গ্রামের মতিলাল সরকারের ছেলে। পেশায় শিক্ষক ও চিত্রশিল্পী। কাজ করেন প্রকৃতি, পাখি ও ফুল নিয়ে। নিরাপত্তার কথা ভেবে ট্রেনে চেপে বসেছিলেন তিনি। অনলাইনে না পেয়ে রাজবাড়ী রেলস্টেশন থেকে দাঁড়ানো (স্ট্যান্ডিং) টিকিট সংগ্রহ করেন। সন্ধ্যা ৬টা ১৮ মিনিটে বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেন স্টেশন থেকে ছেড়ে যায়। একসময় পার হয় পদ্মা সেতু। রাজধানীর সায়েদাবাদে যখন প্রবেশ করে তখনও সবার মুখে আনন্দের হাসি।
হঠাৎ সবার হাসি মিলিয়ে যায়। নিমেষেই কালো ধোঁয়ায় ভরে যায় বগি। সেদিন ভয়াবহ আগুনে প্রাণ হারান অনেকে। সে দৃশ্য নিজ চোখে দেখেছেন মনোজ। একজনের মৃত্যু দেখেছেন চোখের সামনে। এ ঘটনার পর থেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ তিনি। চোখের সামনে ভাসছে অসহায় মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি। তিনি বলছিলেন, এ রকম মৃত্যু পৃথিবীতে যেন আর একজনেরও না হয়। শত্রুর মৃত্যুও যেন স্বাভাবিক হয়।
মনোজ প্রথমে ভেবেছিলেন ডাকাত আক্রমণ করেছে। পরে পোড়া গন্ধ আর কালো ধোঁয়ায় তিনি টের পান, ট্রেনে আগুন ধরেছে। সে সময় মাথা কোনো কাজ করছিল না। দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি। বেঁচে থাকার আকুতি সবার। চোখের সামনে পুড়েছেন এক নারী যাত্রী। পুরো শরীরে আগুন জ্বলছিল। দিশা না পেয়ে যাত্রীদের মালপত্র রাখার জায়গা থেকে লম্বা পাথর জাতীয় বস্তু দিয়ে জানালার গ্লাস ভেঙে ফেলেন।
জীবন বাঁচাতে চলন্ত ট্রেন থেকে লাফ দেন মনোজ। এরপর তাঁর কিছুই মনে নেই। যখন জ্ঞান ফেরে তখন দেখেন, স্থানীয়রা তাঁকে ঘিরে রেখেছেন। পরে স্থানীয় একটি হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাদের সহযোগিতায় ফেরেন ঢাকায়। এ ঘটনার পর অন্তত দু’দিন কারও সঙ্গে কথা বলতে পারেননি। এখনও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।
তিনি বলছিলেন, মৃত্যু যে কতটা ভয়ংকর, তা কাছ থেকে দেখেছেন। এখনও ভাবলে গা শিউরে ওঠে তাঁর। বাঁচার কী আকুতি ছিল সবার। চোখের সামনে পুড়ছে স্ত্রী-সন্তানের দেহ। কিছুই করতে পারছেন না অসহায় স্বামী ও বাবা।
জাতীয় নির্বাচনের প্রচারের সময় গত ৫ জানুয়ারি রাজধানীর গোপীবাগে বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। পরদিনই বিএনপির হরতাল কর্মসূচি ছিল। এর আগের রাতের আগুনে অন্তত চারজনের মৃত্যু হয়। সেদিন বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের একজন পীযূষ কান্তি সরকার মনোজ।
সেদিনের ভয়াবহতা ও নৃশংসতা এবং যাত্রীদের বাঁচার আকুতির মর্মস্পর্শী বর্ণনা দিয়েছেন মনোজ। গতকাল মঙ্গলবার কথা হয় তাঁর সঙ্গে। এ সময় ট্রেনে অগ্নিসংযোগকারীদের উদ্দেশে মনোজ বলেন, ‘যারা পুড়ে মরল, তারা কারা? তারা তো আপনাদেরই কারও ভাই, কারও মা কিংবা বোন। কী লাভ হয়েছে আপনাদের? কাদের স্বার্থে এমন জঘন্য কাজ করলেন। একবার ভেবে দেখবেন।’
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১০/০১/২০২৪
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
