নিজস্ব প্রতিবেদক।।
অর্থনীতি, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ইতিহাস, গবেষণা, আত্মজীবনী—এমন নানা বইয়ের সংগ্রহ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী নন-ফিকশন বইমেলা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ প্রাঙ্গণে গতকাল সকালে মেলা উদ্বোধন করে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, ‘নন-ফিকশন বইমেলার মাধ্যমে সমসাময়িক জ্ঞানের খোরাক সৃষ্টি হয়।’
ঢাবির ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ ও বণিক বার্তা যৌথভাবে সপ্তমবারের মতো এ বইমেলার আয়োজন করেছে। এতে দেশের প্রথম সারির মোট ৪১টি প্রকাশনা ও গবেষণা সংস্থা অংশ নিয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞানের হাব। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের অন্য সদস্যরা প্রতিনিয়ত বইয়ের স্পর্শ খোঁজেন এবং খোঁজার চেষ্টা করেন। তারা জ্ঞান ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত থাকেন। এ বইমেলা তিনদিনের জন্য, কিন্তু এর মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানতে পারেন নতুন কী বই বাজারে এসেছে। সমসাময়িক জ্ঞানের খোরাকও সৃষ্টি হয় এর মাধ্যমে।’
উপাচার্য বলেন, ‘মেলায় এসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বই কিনুক আর না কিনুক বই নিয়ে ঠিকই আলোচনা করেন। বইয়ের আশপাশে থাকেন। গত কয়েক বছর ধরে বণিক বার্তা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ সে সুযোগ করে দিয়ে আসছে, সেজন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই। সুযোগ হলে আমরাও চাই বইমেলার পরিসর আরো বড় হোক। এখানে নন-ফিকশন বইগুলো উপস্থাপন করা হয়। সাধারণত এগুলো ফ্যাক্টস-ফ্যাক্টর এবং পদ্ধতি অনুসরণ করেই লেখা হয়। এটি শিক্ষার্থীদের জন্য এবং আমাদের জন্য অনেক ভালো। আবার ফিকশন বইগুলো চিন্তার খোরাক জোগায়। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি যখন পাখিকে দেখে উড়োজাহাজের ছবি এঁকেছেন তারও প্রায় ৪০০ বছর পর উড়োজাহাজ আবিষ্কার হয়। সে সময় কল্পনা করার কারণেই ৪০০ বছর পর উড়োজাহাজ আবিষ্কার হয়। এ কারণে ফিকশন বইয়ের প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। যদি ফিকশন বই যুক্ত করার প্রয়োজন হয় তাহলেও আমরা তা আয়োজন করতে পারি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, ‘নন-ফিকশন বইমেলা একটি দারুণ উদ্যোগ। যখন প্রথম রেডিও এল তখন মনে করা হয়েছিল বই গুরুত্ব হারাবে। আবার যখন চলচ্চিত্র এল তখনো ভেবে নেয়া হয়েছিল বই গুরুত্ব হারাবে। কিন্তু পরে দেখা গেল রেডিও-টেলিভিশনে বই পড়ার কাজ হবে না। একটি জাতি গড়ার জন্য নন-ফিকশন বইয়ের প্রয়োজনীয়তা অনেক।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘পাঠকরা অনেক সময় নন-ফিকশন বইয়ের সন্ধান পান না। এসব বই বিপণনেরও একটা সমস্যা থাকে। আবার প্রকাশকরা সবসময় এ বইয়ের বিক্রি নিয়ে শঙ্কায় থাকেন। তাই বিপণনের জন্য এবং প্রচারের জন্য মেলাগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার বাইরেও এ ধরনের মেলার আয়োজন করতে হবে। কেননা ঢাকার বাইরের অনেকে জানেনই না, এ ধরনের বই প্রকাশ হয়েছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চা ও মুক্তচিন্তার জন্য আরো উন্মুক্ত হবে সে প্রত্যাশা রেখে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘সমাজ কতটা বিকশিত হচ্ছে তা চিনতে পারা যায়, সেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র, মুক্তচিন্তা কতটা সম্প্রসারণ হচ্ছে, কতটা অনুকূল পরিস্থিতি আছে তার ওপর। একটা সমাজে জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্প্রসারণ করা ততক্ষণই সম্ভব, যতক্ষণ সেখানে প্রশ্ন করা সম্ভব, ভিন্নমত আনা সম্ভব, বিশ্লেষণ করা সম্ভব, বিতর্ক করা সম্ভব। এ কারণে জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, তাদের অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে পার হতে হয়। সে প্রতিবন্ধকতা, সে রকম বাধা, সে রকম ঝুঁকি এখন পর্যন্ত অব্যাহত আছে, বাংলাদেশেও তা অব্যাহত আছে। এমন একটা পরিস্থিতিতে এ ধরনের মেলা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ।’
শুভেচ্ছা বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ আব্দুল মঈন বলেন, ‘২০১৫ সাল থেকে এ বইমেলা হচ্ছে। শুরু থেকেই এর সঙ্গে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ সম্পৃক্ত রয়েছে। জ্ঞানের চর্চায় বইয়ের পঠন-পাঠন, বিশেষত নন-ফিকশন বইয়ের চর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বণিক বার্তার নন-ফিকশন বইমেলার এ উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি নিজামুল হক ভুঁইয়া বলেন, ‘জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্যচর্চায় নন-ফিকশন বইয়ের বিকল্প নেই। বণিক বার্তাকে ধন্যবাদ এ ধরনের আয়োজনের জন্য। আমরা প্রত্যাশা করি ভবিষ্যতে তারা দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও এ ধরনের মেলার আয়োজন করবে।’
অনুষ্ঠানে সময় প্রকাশনের প্রকাশক ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘বইমেলার সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বাংলা একাডেমিতে হয় একুশে বইমেলা। এছাড়া সংস্কৃত বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র বাংলাদেশ বইমেলা করত একটা। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে হতো। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতর এখন নন-ফিকশন বইমেলা হচ্ছে। এটা প্রকাশকদের জন্য সৌভাগ্যের। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ এ বইমেলা করে দিচ্ছে। এ রকম মেলার কথা আমরা এর আগে ভাবিনি। বণিক বার্তা এটা ভেবেছে। এজন্য অসংখ্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আমরা প্রকাশকরা বিষয়টিকে সাদরে গ্রহণ করেছি এবং প্রথম থেকে এর সঙ্গে আছি। চেষ্টা করে যাচ্ছি, এ বইমেলার পরিসর আরেকটু বৃদ্ধি পাক।’
ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমরা যারা কর্মক্ষেত্রে রয়েছি তারা এটা ভীষণভাবে উপলব্ধি করি যে আমাদের শিক্ষার্থীদের একাডেমিক শিক্ষা ছাড়াও আর্থসামাজিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে, বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গভীর জ্ঞান প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের এ ধরনের জ্ঞান অর্জনের একটি সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে এ নন-ফিকশন বইমেলা।’
এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন ঢাবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাকসুদুর রহমান, সাবেক প্রক্টর ড. একেএম গোলাম রাব্বানী, ম্যানেজমেন্ট ইনফেরমেশন সিস্টেম বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. রাবেয়া সুলতানা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসিফ হোসেন খান, জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মিহির লাল সাহা, মহসীন হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মাসুদুর রহমান প্রমুখ। অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে মেলা পরিদর্শন করেন অতিথিরা। তার আগে বণিক বার্তা প্রকাশিত দুটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বইগুলো হলো আনু মুহাম্মদের ‘চীন: পরাশক্তির বিবর্তন’ ও ‘নির্বাচিত সিল্করুট’।
নন-ফিকশন বইমেলা প্রাঙ্গণ আগামীকাল পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এ বছর মেলায় অংশ নেয়া প্রকাশনা ও গবেষণা সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে অনন্যা, অনিন্দ্য প্রকাশ, অনুপম প্রকাশনী, অন্যপ্রকাশ, অবসর প্রকাশনা সংস্থা, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, আগামী প্রকাশনী, আলোঘর প্রকাশনা, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, একাডেমিক প্রেস অ্যান্ড পাবলিশার্স লিমিটেড, ঐতিহ্য, কথাপ্রকাশ, কাকলী প্রকাশনী, কোয়ান্টাম, গ্রন্থিক প্রকাশন, জাগৃতি প্রকাশনী, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, জার্নিম্যান বুকস, ডেইলি স্টার বুকস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থা, তাম্রলিপি, দিব্যপ্রকাশ, দ্যু প্রকাশন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেড, পাঠক সমাবেশ, প্রথমা প্রকাশন, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাতিঘর, বাঙ্গালা গবেষণা, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট, ভাষাচিত্র, মাওলা ব্রাদার্স, রকমারি, শ্রাবণ প্রকাশনী, সংহতি প্রকাশন, সময় প্রকাশন, সাহিত্য প্রকাশ, সুবর্ণ, স্বরে অ।
মেলায় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্টল থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড়ে বই কেনার সুযোগ পাবেন পাঠক। বই ক্রেতাদের জন্য প্রতিদিন থাকছে র্যাফল ড্রর আয়োজন। বিজয়ীরা পাবেন আকর্ষণীয় সব পুরস্কার। এছাড়া এ বছর প্রথমবারের মতো ‘নন-ফিকশন গ্রন্থ সম্মাননা’ পুরস্কার প্রবর্তন করতে যাচ্ছে বইমেলা কর্তৃপক্ষ। মেলায় অংশ নেয়া প্রকাশকদের মনোনীত বই থেকে বিচারক প্যানেল ২০২৩ সালের দুটি নন-ফিকশন বই নির্বাচিত করবেন। মেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে জুরিদের নির্বাচিত দুটি বইকে ‘নন-ফিকশন গ্রন্থ সম্মাননা’ দেয়া হবে।
মেলা শেষ হবে আগামীকাল। সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ। বিশেষ অতিথি থাকবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
