রংপুরঃ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষক আসাদুজ্জামান মণ্ডল আসাদকে সহযোগী অধ্যাপক পদে নিয়োগের বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। ‘অযোগ্য হওয়ার পরও’ তাকে সহযোগী অধ্যাপকের শূন্যপদে নিয়োগ দেওয়া হয়- এমন অভিযোগ ইউজিসিতে দেওয়া হলে এ ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
গত ১৪ ডিসেম্বর ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের উপ-পরিচালক মো. গোলাম দস্তগীর স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত চিঠি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বরাবর পাঠানো হয়। গত রোববার (১৭ ডিসেম্বর) চিঠিটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হাতে পায়। মঙ্গলবার (১৯ ডিসেম্বর) চিঠির বিষয়টি নিশ্চিত করেন বেরোবি রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী আলমগীর চৌধুরী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্থাপন দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ২৭ অক্টোবর লোকপ্রশাসন বিভাগের শূন্যপদে দুজন সহযোগী অধ্যাপক নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে সহযোগী অধ্যাপক পদের আবেদনের শর্তে বলা হয়- সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও অন্যূন দ্বিতীয় শ্রেণীর স্নাতকোত্তর ডিগ্রিসহ পিএইচডি এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে চার বছরসহ কমপক্ষে সাত বছরের সক্রিয় শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। অথবা বর্ণিত যোগ্যতাসহ এমফিল ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পাঁচ বছরসহ মোট ১০ বছরের শিক্ষকতার বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আবেদনের শেষ তারিখ ছিল ২০২২ সালের ২২ নভেম্বর।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি মোতাবেক লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপকের দুটি শূন্যপদে চার জন প্রার্থী আবেদন করেন। যার মধ্যে তিন জনই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী ওই শিক্ষকদের কেউই সহযোগী অধ্যাপকের শূন্যপদে নিয়োগের শর্ত পূরণ করেন না। তবে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ শিক্ষকবৃন্দের পদ আপগ্রেডেশন নীতিমালা অনুযায়ী একজনের সহযোগী অধ্যাপক পদে আবেদনের যোগ্যতা ছিল।
অপর দুই শিক্ষকের মধ্যে মো. আসাদুজ্জামান মণ্ডল আসাদ এবং সাব্বীর আহমেদ চৌধুরী, কারও-ই পিএইচডি কিংবা এমফিল ডিগ্রি না থাকায় কেউ ওই পদের জন্য যোগ্য ছিলেন না। বিভাগীয় প্রধান আসাদ মণ্ডলের সভাপতিত্বে ২০২২ সালের ১৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত প্ল্যানিং কমিটির সভায় এই অযোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগের সুপারিশ করলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হাসিবুর রশীদ ২০২৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সহযোগী অধ্যাপক পদের বাছাই বোর্ডের তারিখ নির্ধারণ করেন। এসব অনিয়মের বিষয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে বোর্ড স্থগিত করতে বাধ্য হন উপাচার্য।
সূত্র আরও জানায়, চলতি বছরের গত ১৩ জুলাই আবারও লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নিয়োগের বাছাই বোর্ড অনুষ্ঠিত হয়। ওই বোর্ডে অযোগ্য প্রার্থী মো. আসাদুজ্জামানকে মাত্র আট বছর এক মাসের চাকরির অভিজ্ঞতায় সহযোগী অধ্যাপকের শূন্যপদে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। সুপারিশটি গত ২০ জুলাই অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের ৯৬তম সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হলে প্রার্থীর চাহিত যোগ্যতা না থাকায় বাছাই বোর্ডের সুপারিশ অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ওই সভার সিদ্ধান্ত-৫ মোতাবেক সুপারিশটি পুনরায় বাছাই বোর্ডে পাঠানো হয়।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর আইন-২০০৯ এর প্রথম সংবিধি ৫(৪) ধারায় বলা হয়েছে ‘কোনও বাছাই বোর্ডের সুপারিশের সঙ্গে সিন্ডিকেট একমত না হলে বিষয়টি ওই বোর্ড কর্তৃক চ্যান্সেলরের নিকট পাঠানো হবে এবং এ ব্যাপারে তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।’ কিন্তু আইনটি অমান্য করে উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. হাসিবুর রশীদ গত ২৩ সেপ্টেম্বর পুনরায় ওই বিষয়ে বাছাই বোর্ড আহ্বান করেন।
উপাচার্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নিয়োগ বাছাই বোর্ডের মাধ্যমে অযোগ্য প্রার্থী আসাদুজ্জামানকে সহযোগী অধ্যাপকের শূন্যপদে নিয়োগের সুপারিশ করা হয় এবং গত ২৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ৯৮তম সিন্ডিকেট সভায় তা অনুমোদন করে ওইদিনই তড়িঘড়ি করে যোগদান করানো হয়।
অভিযোগ আছে, ওই নিয়োগের জন্য সিন্ডিকেটের ৯৬তম সভায় অযোগ্য প্রার্থীকে সুপারিশের বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপনকারী সদস্যদের অনুপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত হয়েই উপাচার্য তড়িঘড়ি করে আগের দিন পুনরায় বাছাই বোর্ড আহ্বান করেন এবং পরদিন ৯৮তম সিন্ডিকেটে অনুমোদন করেন।
এদিকে, আইন ভঙ্গ করে অযোগ্য প্রার্থী হিসেবে মো. আসাদুজ্জামানকে সহযোগী অধ্যাপক পদে দেওয়া নিয়োগপত্রে ৯৬তম সিন্ডিকেট সভায় অননুমোদনের বিষয়টিও গোপন করা হয়েছে।
অনিয়ম ও আইন ভঙ্গের মাধ্যমে নিয়োগের বিষয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক তাবিউর রহমান গত ১০ অক্টোবর ইউজিসিতে অভিযোগ করলে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা তলব করে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে। গত রোববার এ সংক্রান্ত চিঠি বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছালে সমালোচনা শুরু হয়। এ ছাড়া, অভিযোগকারী তাবিউর রহমানকেও চিঠি দিয়ে যথাযথ মাধ্যমে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগ করার নির্দেশ দেয় ইউজিসি।
ইউজিসির চিঠি পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী আলমগীর চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘৯৬তম সিন্ডিকেট সভায় সদস্যরা অনাপত্তি জানাননি। তবে পুনরায় বাছাই বোর্ডের কাছে পাঠানো হয়েছিলো। সবকিছুই একটা নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হয়। বাছাই বোর্ডের সুপারিশ অনুসারেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’
ইউজিসির চিঠির ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘অনেকে না বুঝেই অনেক বিষয়ে অভিযোগ করে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সময়মত চিঠির জবাব দেওয়া হবে।’
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হাসিবুর রশীদ বলেন, ‘সময়ানুযায়ী চিঠি পাঠিয়ে সিন্ডিকেট সভার আহ্বান করা হয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়মের কোনও ব্যত্যয় ঘটেনি।’
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৯/১২/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
