ঢাকাঃ গরুর মাংস এখন বিক্রি হচ্ছে যেমন খুশি তেমন দামে। কোনো কসাই বিক্রি করছেন ৫৮০ টাকায়, কেউ ৬০০ টাকায়, কেউ বিক্রি করছেন ৬৫০ টাকায়, আবার কেউ ৭০০ টাকায় বিক্রি করছেন এক কেজি গরুর মাংস। এ ছাড়া সুপারশপগুলোতে বিক্রি হচ্ছে কোনোটিতে ৬৭৫ টাকা, আবার কোনোটিতে ৬৫০ টাকা। অথচ গত বুধবার ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হবে ৬৫০ টাকায় এবং পর দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার থেকেই এই দামে গরুর মাংস বিক্রি হওয়ার কথা।
ডেইরি ফার্ম ও মাংস ব্যবসায়ীদের নেতারা বসে এ সিদ্ধান্ত নিলেও কসাইরা মাংস বিক্রি করছেন যে যার ইচ্ছেমতো দামে। এদিকে বুধবারের বৈঠকে প্রথমে শুধু ঢাকায় ৬৫০ টাকা কেজিতে মাংস বিক্রি করার কথা বলা হলেও, সারা দেশে পর্যায়ক্রমে এই দাম কার্যকর করার কথা ছিল। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার বাইরে জেলা-উপজেলা পর্যায়েও এখন বেশিরভাগ জায়গায় প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায়।
এ ছাড়া গরুর মাংসের দাম কমার কারণে খাসির মাংসের দামও কমে এখন ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায়ও বিক্রি হতে দেখা গেছে। কোনো কোনো বাজারে ৯০০ টাকা কেজিতেও খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে। অথচ দেশের বাজারে মাস দুয়েক আগেও এক কেজি খাসির মাংস বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়। শুধু তাই নয়, গরুর মাংসের দাম কমার প্রভাবে বাজারে সব ধরনের মুরগির দাম কমেছে কেজিতে ২০ থেকে ২৫ টাকা, কমেছে ডিমের দাম। তা ছাড়া গরুর মাংসের দাম কমার প্রভাবে বাজারে সব ধরনের মাছের দামও কমেছে।
শুক্রবার রাজধানীর কল্যাণপুর নতুন বাজার, শেওড়াপাড়া বাজার, কারওয়ান বাজারসহ আরও কয়েকটি বাজার ঘুরে মাংসের বাজারের এ চিত্র দেখা যায়। রাজধানীর কল্যাণপুর নতুন বাজারে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, এখানকার পাশাপাশি দুটি বাজারে ১০ থেকে ১২টি মাংসের দোকান আছে। প্রত্যেকটি দোকানেই গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে ৭০০ টাকায়। শুধু জাহাঙ্গীর কসাই বিক্রি করছেন ৬৫০ টাকায়। অন্যরা ৭০০ টাকায় বিক্রি করলেও আপনি কেন ৬৫০ টাকায় বিক্রি করছেন, এ প্রশ্নের জবাবে জাহাঙ্গীর কসাই বলেন, ‘আমাদের মাংস ব্যবসায়ী সমিতির কেন্দ্রীয় নেতারা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন ৬৫০ টাকায় মাংস বিক্রি করার জন্য-আমি সে সিদ্ধান্ত মেনেই মাংস বিক্রি করছি। আসলে গত তিন-চার মাস থেকে গাবতলির পশুর হাটে গরুর দাম বেশ খানিকটা কমেছে। দেখা গেছে চার মাস আগে যে গরু ১ লাখ টাকায় কিনতে হয়েছে, এখন সে গরু ৮০ হাজার থেকে ৮৫ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। গরুর দাম কমে যাওয়ায় মাংসও কম দামে বিক্রি করা যায়। কিন্তু বাজারের সবাই যেহেতু আগের মতো বেশি দামেই বিক্রি করত-তাই আমিও বিক্রি করতাম। এর ফলে গত তিন-চার মাস মাংস বিক্রি করে লাভ হয়েছে বেশি। কিন্তু গত বুধবার যখন মাংসের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হলো-তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ৬৫০ টাকা দরেই বিক্রি করব গরুর মাংস। এখন হয়তো আমার লাভ কিছুটা কম হবে, কিন্তু দাম কম রাখার কারণে মাংস বিক্রি বেশি হচ্ছে। আমি মনে করি দুয়েক দিনের মধ্যে আমাদের বাজারের সব মাংস বিক্রেতাই ৬৫০ টাকা দরে বিক্রি করবে।’
পাশের দোকানের হাসিব কসাই অবশ্য ৭০০ টাকা কেজিতেই মাংস বিক্রি করছেন। কেন ৬৫০ টাকায় বিক্রি করছেন না-জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলে আমার জানা ছিল না যে মূল্য ৬৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আমি বিষয়টি আজই জানলাম। কাল থেকে আমিও ৬৫০ টাকায় বিক্রি করব গরুর মাংস।
রাজধানীর শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড বাজারেও দুই রকম দামে গরুর মাংস বিক্রি হতে দেখা গেছে। এখানকার সিরাজ কসাই বিক্রি করছেন ৭০০ টাকায় এবং হাবিব কসাই বিক্রি করছেন ৬৫০ টাকায়। দুজনই জানালেন, দাম কমে আসায় গুরুর মাংস বিক্রি বেড়েছে। তবে ৭০০ টাকায় বিক্রি করা সিরাজ কসাই বললেন, ‘৭০০ টাকার নিচে বিক্রি করলে আমার পোষাই না। কারণ আমি যে দামে গরু কিনে এনেছি, তাতে ৭০০ টাকার নিচে বিক্রি করলে আমার লস হবে। আমি লোকসান দিয়ে তো আর ব্যবসা করতে পারব না।’
এদিকে কসাইরা একেক বাজারে একেক দামে বিক্রি করাই ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে বাকবিতণ্ডাও চলছে। ক্রেতার প্রশ্ন-ব্যবসায়ীরাই ৬৫০ টাকা দাম নির্ধারণ করে দিল, আবার সেই ব্যবসায়ীরাই মাংস বিক্রি করছেন একেক জন একেক দামে। এমনটি কেন হবে। কল্যাণপুর নতুন বাজারের ক্রেতা আনিসুর রহমান তর্কে জড়ান মাংস বিক্রেতা হাবিবের সঙ্গে। কারণ তিনি প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম চাচ্ছেন ৭০০ টাকা। অথচ গণমাধ্যম মারফত ওই ক্রেতা জেনে এসেছেন, মাসে প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম থাকবে ৬৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আনিসুর রহমান বলেন, ‘বৃহস্পতিবার আমি খবরের কাগজে দেখলাম প্রতি কেজি গরুর মাংস ৬৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিন বাজারে এসেছি দুই কেজি গরুর মাংস কিনব বলে। কারণ দাম বেড়ে যাওয়ায় গত এক বছরের অধিক সময় হয়ে গেল এক সঙ্গে দুই কেজি গরুর মাংস কিনিনি। এক কেজি নিয়েই বাসায় ফিরেছি। আমার ছেলে-মেয়ে গরুর মাংস খেতে খুব পছন্দ করে। তাই ভাবলাম দাম যেহেতু কমেছে দুই কেজি নিয়ে যায়। কিন্তু দোকানে মাংস নিতে এসে দেখি ৭০০ টাকা চাচ্ছে। কেন তারা এখন ৭০০ টাকায় বিক্রি করবে-দাম তো ব্যবসায়ীরাই নির্ধারণ করেছেন। তাই আমি তার কাছে জানতে চেয়েছি, কেন বেঁধে দেওয়া দামের চেয়েও বেশি রাখা হচ্ছে। এই কসাই যেহেতু দাম কমাবে না, তাই পাশের দোকান থেকে ৬৫০ টাকা কেজিতে দুই কেজি মাংস কিনব।’
শেওড়াপাড়া বাজারের ক্রেতা ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘খবরে শুনেছি মাংসের দাম থাকবে ৬৫০ টাকা কেজি। কিন্তু বাজারে এসে সত্যতা মিলছে না। অনেক দোকানেই তারা ৭০০ টাকা আবার ৭২০ টাকা করে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি করছে। এই দোকানিকে জিজ্ঞেস করলে বলছে-খবরে তো কত কিছুই দেখায়, আমাদের কেনা দাম বেশি, তাই ৭০০ টাকার কমে আমরা বিক্রি করতে পারছি না। এটা আসলে ব্যবসায়ীদের স্বেচ্ছাচারিতা।’
সুপারশপেও বিক্রি হচ্ছে বেশি দামে
রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা ফার্মগেটের পাশে ইন্দিরা রোডে রয়েছে আগোরার শো রুম। এখানে গিয়ে দেখা যায়, গরুর মাংস (হাড়যুক্ত) বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৬৭৫ টাকায়। আর হাড়ছাড়া মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ টাকায়। নির্ধারিত দামে কেন গরুর মাংস বিক্রি করা হচ্ছে না জানতে চাইলে-এখানকার বিক্রয়কর্মী খাদিজা খাতুন বলেন, ‘বিভিন্ন খামার থেকে আমরা গরুর মাংস সাপ্লাই দেওয়া হয়। তারা এখনও দাম কমায়নি, তাই আমরাও কমাতে পারিনি। কম দামে কিনতে পারলে আমরাও কম দামে বিক্রি করতে পারব।’
বৃষ্টিতে বেড়েছে সবজির দাম, মাংসের প্রভাব মাছের বাজারে : গত দুই তিন-দিনের বৈরী আবহাওয়ার কারণে সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় প্রতিটি সবজির দাম বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার দিনভর টানা বৃষ্টির কারণে আড়তে সবজির সরবরাহ কমে গেছে। এ কারণে দামও কিছুটা বেড়েছে। তবে এ সময়ে মাংসের দাম কমার প্রভাব পড়েছে মাছের বাজারে। সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন জাতের মাছের দাম কিছুটা কমেছে।
গত সপ্তাহের তুলনায় আলুর দাম কেজিপ্রতি ৫ টাকা বেড়ে এখন ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পুরোনো আলু ৪৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৫ টাকা। কয়েক দিন আগেও যে লাউ বিক্রি হতো ৪০ টাকায়, সেটি এখন বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৭০ টাকায়। ৩০ টাকা দামের ফুলকপি বেড়ে হয়েছে ৪০ টাকা। বাজারে দুই জাতের বেগুনেই কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ৫ থেকে ১০ টাকা। শিমের কেজি ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকা, বেড়ে হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। ২০ টাকা কেজির মুলা বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা দরে। বেড়েছে কাঁচামরিচের দামও। ৮০ টাকা কেজির কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। বাজারে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে ধনিয়া পাতার। ৬০ টাকা কেজির ধনিয়া পাতা তিনগুণ বেড়ে হয়েছে ১৮০ টাকা।
গত সপ্তাহের মতোই একই দামে ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে টমেটো। রসুন, আদারও দাম বেড়েছে। এ দুটি পণ্য ১৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১৯০ থেকে ২০০ টাকা হয়েছে। ১২০ টাকার দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়। আমদানি করা পেঁয়াজ কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে হয়েছে ১১০ টাকা।
বাজারে এখন মাছের সরবরাহ ভালো। মাংসের দাম কমার প্রভাব পড়েছে মাছের দামেও। গত সপ্তাহের মতো এ সপ্তাহেও কিছুটা কমেছে চাষের মাছের দাম। মাঝারি মানের চাষের পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায়। বড় আকারের চাষের তেলাপিয়া ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, ছোট আকারের ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। আর মান ও আকারভেদে চাষের রুই মাছের কেজি পাওয়া যাচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। তবে চিংড়ির দাম তেমন কমেনি। প্রতি কেজি চিংড়ি কিনতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ৭০০ থেকে ১০০০ টাকা। শোল মাছের দাম কিছুটা বেড়ে ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা হয়েছে। ইলিশ মাছ কেজিপ্রতি দাম হাঁকানো হচ্ছে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত। সময়ের আলো
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৯/১২/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
