নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ প্রধান শিক্ষক এবং সহকারি প্রধান শিক্ষক মিলে স্কুলটিকে জাতীয়করণ করাবেন। আর এই জাতীয়করণের জন্য কর্মকর্তাদের উপহার (ঘুষ) দিতে হবে। এজন্য সকল শিক্ষক কর্মচারীদের নিকট থেকে ১৬ লাখ টাকা তুলেছেন এক প্রধান শিক্ষক এবং সহকারি প্রধান শিক্ষক। এমনই অভিযোগ পাওয়া গেছে, পটুয়াখালী জেলা সদরে অবস্থিত এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ লতিফ মিউনিসিপ্যাল সেমিনারী পটুয়াখালীর প্রধান শিক্ষক মোঃ জাকির হোসেন (সেলিম) এবং সহকারী প্রধান শিক্ষক মোঃ মজিবুর রহমান এর বিরুদ্ধে। আর ১৬ লাখ টাকার লেনদেনের একাধিক কল রেকর্ড শিক্ষাবার্তা’র হাতে এসেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯১৬ সালে বিদ্যোৎসাহী হিসেবে পরিচিত কে এম আবদুল লতিফ ছিলেন তৎকালীন মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট এবং একই সঙ্গে পটুয়াখালী মিউনিসিপ্যালিটির প্রশাসক। তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় এ বিদ্যাপীঠ। কে এম আবদুল লতিফের নামানুসারে বিদ্যালয়টির নামকরণ করা হয়। শতবর্ষী এই বিদ্যাপীঠটি এক সময়ে জেলার অন্যতম প্রধান শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান থাকলেও বর্তমান প্রধান শিক্ষক এবং সহকারি প্রধান শিক্ষকের অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতায় ডুবতে বসেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি।
এর আগে গত ১৯ আগস্ট ২০২৩ ইং তারিখে ‘সহকারি শিক্ষকের বকেয়া এমপিও’র জন্য এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি প্রধান শিক্ষকের‘ শিরোনামে প্রধান শিক্ষক মোঃ জাকির হোসেন এর চাঁদা দাবির বিষয়ে শিক্ষাবার্তা’য় সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তদন্তে গেলেও কোন এক অদৃশ্য কারণে সেই তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। বরং ভুক্তোভুগী শিক্ষক গণমাধ্যমে কথা বলায় তাকে চাকরি থেকে প্রথমে সাময়িক পরবর্তীতে কোন নিয়ম নীতিমালা তোয়াক্কা না করেই চূড়ান্ত বরখাস্ত করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সকল শিক্ষক কর্মচারীদের কাছ থেকে জাতীয়করণের কথা বলে ১৬ লাখ টাকা আত্মসাতের বিষয়টি উঠে এসেছে কর্মরত শিক্ষকদের কল রেকর্ডে। শিক্ষাবার্তা’র হাতে থাকা স্কুলটির শিক্ষকদের সাথে শিক্ষকদের মুঠোফোনের কল রেকর্ডে শোনা যায়, হিন্দু ধর্ম শিক্ষিকা সংগীতা রানী দেবনাথ জাতীয়করণের জন্য প্রধান শিক্ষককে ৯৮ হাজার টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। একই অডিও রেকর্ডে তাকে বলতে শোনা যায়, মিতু ম্যাডাম আমার থেকে সামান্য কম দিয়েছেন। বিদ্যালয়টির আরেক শিক্ষিকা রিফাত খাইরুল মুরসালিন তার অডিও রেকর্ডে এক লাখ টাকা চেক দেওয়ার কথা বলেন। একই রেকর্ডে শোনা যায় বিদ্যালয়টির অপর শিক্ষিকা হাবিবা এক লাখ টাকার কিছু কম দিয়েছেন। সহকারি শিক্ষিকা (গণিত) মৌসুমী আক্তার মিতুর কল রেকর্ডে শোনা যায়, জাতীয়করণের জন্য প্রধান শিক্ষকের নির্দেশনায় সহকারী প্রধান শিক্ষকের কাছে ৬০ হাজার টাকা দিয়েছি। এরপর আবার ২০ হাজার টাকা দিয়েছি। শিক্ষক মোঃ লোকমানের কথপকথনে শোনা যায়, তিনি প্রধান শিক্ষকের কাছে ৮০ হাজার কি ৮৫ হাজার দিয়েছেন। শিক্ষক এইচ এম মোশাররফ হোসেন দিয়েছেন আমার মতই। এছাড়াও স্কুলটির কর্মচারীরা দিয়েছেন কেউ পাঁচ হাজার কেউবা দশ হাজার বা তারও বেশি।
জানা গেছে, লতিফ মিউনিসিপ্যাল সেমিনারী’র ভৌতবিজ্ঞানের সহকারি শিক্ষক মোঃ নুরুজামান এনটিআরসিএ’র ২য় গণবিজ্ঞাপ্তিতে পটুয়াখালী বোতল বুনিয়া স্কুল এন্ড কলেজে সুপারিশ প্রাপ্ত হয়ে গত ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারিতে যোগদান করেন এবং ২০২২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। এনটিআরসিএ ৩য় গণবিজ্ঞাপ্তিতে আবেদন করে তিনি লতিফ মিউনিসিপ্যাল সেমিনারী পটুয়াখালীতে সুপারিশ প্রাপ্ত হন। এনটিআরসিএ সুপারিশ পত্র প্রদান করার পর অত্র প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক তাকে যোগদানের জন্য এক লাখ টাকা দাবি করে ২০২২ সালের ০১ ফেব্রুয়ারি তারিখে তাকে যোগদান করান। যোগদানের পর থেকে তিনি নিয়মিত এই সহকারি শিক্ষকের কাছে টাকা চেয়ে আসছেন টাকা না দেওয়াতে প্রধান শিক্ষক মোঃ জাকির হোসেন তার কক্ষে নিয়ে গালাগাল করেন এবং বিভিন্ন ভাবে হুমকি দিতে থাকেন। নিয়মিত হুমকি প্রদানের এক সময় প্রধান শিক্ষক বলেন, আমি অত্র প্রতিষ্ঠানে সভাপতিকে টাকার খাম দিয়ে এখানে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ নিয়েছি, কাজেই আমাকে এক লক্ষ টাকা দিতে হবে। ভুক্তোভুগী শিক্ষকের সাথে প্রধান শিক্ষকের এই কথপকথনের কল রেকর্ড শিক্ষাবার্তা’র বার্তা কক্ষের হাতে রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যালয়টির একাধিক শিক্ষক শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, জাতীয়করণের জন্য টাকা বাধ্য হয়ে দিয়েছি আমরা। আর কোনো খবর নাই সেই টাকাও আর ফেরত দেয়নি প্রধান শিক্ষক।
জাতীয়করণের জন্য টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করে প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন শিক্ষাবার্তা’র কাছে দাবি করেন, এ জাতীয় কোন ঘটনা ঘটেনি। এনটিআরসিএ’র সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকের কাছ চাঁদা দাবির প্রসঙ্গে বলেন, ঐ শিক্ষক নিজেই জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে স্বীকার করেছেন তিনি টাকা দেন নি।
বর্তমানে চাকুরিচ্যুত শিক্ষক নুরুজ্জামান এমন কোনো কথা বলেন নি বলে শিক্ষাবার্তার’র কাছে জানান।
এ বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও পটুয়াখালীর পৌরসভার সাবেক মেয়র ডাঃ মোঃ শফিকুল ইসলাম এর মুঠোফোনে কল দিলেও সেটি বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পটুয়াখালী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ মুজিবুর রহমান শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, আমি ইতিমধ্যে একটি তদন্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। কল রেকর্ড আমাকে পাঠান আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিব।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/৩১/১০/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
