নেত্রকোনাঃ জেলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দত্ত উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহজাহান কবিরের স্বেচ্ছচারিতায় চাকরিহারা ২৭ জন শিক্ষক স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তার বিরুদ্ধে সীমাহীন স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিপুল অর্থ আত্মসাৎ ও জনৈক ছাত্রীকে যৌন হয়রানিসহ একাধিক অভিযোগ করার পরও কোনো প্রতিকার না হওয়ায় অভিভাবকসহ সুধী মহলে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, আজ থেকে ১৩৫ বছর আগে ১৮৮৯ সালে শহরের প্রাণকেন্দ্রে এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু শত বছর পর রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের মধ্যে পড়ে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি শুরু হয়। প্রধান শিক্ষক হিসেবে অঞ্জন ভদ্র দায়িত্বে আসার পর থেকে অনিয়মের যাত্রা প্রশস্ত হতে থাকে। তিনি প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকাকালে তার নিজের পদটি শূন্য দেখিয়ে ২০১৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নেপথ্যের কলকাঠির ইশারায় বিশেষ পন্থায় বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাহজাহান কবিরকে ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাইয়ে দেন। সেই থেকে বিদ্যালয়ে অনিয়ম ও অব্যবস্থার মাত্রা চরম আকার ধারণ করতে থাকে। ২০২৩ সালে এসে বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ থেকে ১০ শ্রেণী পর্যন্ত মাসিক বেতন ৩৫০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৫২০ টাকা, ভর্তি ফি ৩০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা এবং পরীক্ষা ফি ৭০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা করা হয়। এমন কি প্রধান শিক্ষক প্রতি বছরই ফরম ফিলাপের ফি বোর্ড নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে জনপ্রতি ৫০০ টাকা বেশি নিয়ে থাকেন। ২০২৩ সালের এসএসসি পরীক্ষায় কোচিং ক্লাসে ভর্তি বাবদ ২০০০ হাজার টাকা করে আদায় করেন। এতে অনেক গরিব শিক্ষার্থীর অভিভাবক তা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন। বিদ্যালয়ে বর্তমানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা তিন সহস্রাধিক। ধারণক্ষমতার অধিক শিক্ষার্থী থাকায় পড়াশোনায় বিঘœ ঘটছে। তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর থেকে আপত্তির পরও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো রসিদ ছাড়াই প্রতি ডায়েরি বাবদ ১০০ টাকার স্থলে ২০০ টাকা করে আদায় করে চলেছেন।
জানা যায়, ২০ লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করে প্রধান শিক্ষকের কক্ষকে বিলাসবহুল করে গড়ে তোলায় শিক্ষার্থীদের উপর বর্ধিত ফি চাপিয়ে দেয়া হয়। তিনি স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে কোনো রকম টেন্ডার ছাড়াই বিদ্যালয়ের বাণিজ্যিক ভবনের তৃতীয় তলার নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে ইতোমধ্যে অন্তত ২২টি রুমের পজিশন বিক্রি করে স্কুল ফান্ডে যে পরিমাণ টাকা জমা দেন চুক্তিনামার বাইরে তার তিন গুণ অর্থ হাতিয়ে নেন।
এরই মধ্যে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ওই প্রধান শিক্ষক বিনা নোটিশে বেআইনিভাবে ২৭ জন শিক্ষককে সরাসরি চাকরিচ্যুত করে বিশেষ সুবিধা নিয়ে নতুন করে ওইসব পদে নিয়োগ দেন। আর চাকরিচ্যুত শিক্ষকরা পরিবার, পরিজন নিয়ে এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
গত ১৪ আগস্ট এক ছাত্রী অভিভাবক জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পেশ করা এক অভিযোগে জানান, ওই বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণীতে অধ্যায়নরত তার মেয়েকে গত ২০ জুলাই স্কুল বন্ধের দিন বিকেলে প্রধান শিক্ষক শাহজাহান কবির এক ছাত্রীর মাধ্যমে ডেকে নিয়ে তার কক্ষে জুবায়েত হোসেন নামে অপর এক শিক্ষককে নিয়ে যৌন হয়রানি চালান। এতে ওই ছাত্রী মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ায় বর্তমানে তার চিকিৎসা চলছে। এর প্রতিকার চেয়ে শিক্ষকসহ ১১ জন অভিভাবক মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক অধিদফতরের মহাপরিচালক, জেলা প্রশাসক ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ পেশ করেছেন। গত ২৫ জুলাই জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুল গফুর জেলা প্রশাসকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করার চার মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।
তবে প্রধান শিক্ষক শাহজাহান করিব তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন উল্লেখ করে বলেন, আমার বিরুদ্ধে একটি মহল ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুল গফুর বলেন, প্রধান শিক্ষকের অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।
ছাত্রীর শ্লীলতাহানির বিষয়ে তিনি বলেন, অভিযোগকারী আইনের আশ্রয় নেয়ার কারণে বিষয়টি এখন আমি দেখছি না।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক শাহেদ পারভেজ চৌধুরী বলেন, কাজের ব্যস্ততার কারণে এখনো তদন্ত প্রতিবেদন দেখা হয়নি।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৩/১০/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
