ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য

ঢাকাঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সূতিকাগার। এ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে যারা অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছেন তাদের মধ্য অন্যতম হলেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌল ভিত্তি গড়ে দেওয়া এ উপাচার্যকে নিয়ে লিখেছেন মুমিতুল চৌধুরী।

ব্রিটিশ নাগরিক ফিলিপ জোসেফ হার্টগ ১৮৬৪ সালের ২ মার্চ লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আলফন্সে হার্টগ ছিলেন ইহুদি বংশোদ্ভূত। হার্টগের পরিবার তাদের আদি বাসস্থান হল্যান্ড থেকে ফ্রান্সে চলে গেলে প্যারিসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন তারা। আলফন্সে হার্টগ লন্ডনে ফরাসি ভাষার শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন।

জোসেফ হার্টগ লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ স্কুল ও ম্যানচেস্টারে ওয়েন্স কলেজে প্রাথমিক শিক্ষা নেন। তিনি ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৮৮০ সালে বিএসসি ডিগ্রি এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৮৮৫ সালে রসায়নশাস্ত্রে বিএসসি (অনার্স) ডিগ্রি লাভ করেন। বেশ কয়েক বছর হার্টগ ফ্রান্স ও জার্মানিতে রাসায়নিক গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন।

১৮৯১ সালে ম্যানচেস্টারে ওয়েন্স কলেজে রসায়নের সহকারী প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন হার্টগ। কিছুদিনের জন্য তিনি ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণ প্রকল্পে খণ্ডকালীন সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯০৩ সাল থেকে দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক রেজিস্ট্রার পদে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১৬ সালে তাকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নিং বডিতে রাজ প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯১৭ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের সদস্য ছিলেন। এ কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন মাইকেল স্যাডলার। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক রেজিস্ট্রার থাকাকালে ভারতের গভর্নর জেনারেল জোসেফ হার্টগকে ১৯২০ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে পাঁচ বছরের জন্য নবপ্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিয়োগ দান করেন। যদিও এর প্রক্রিয়া শুরু হয় আরও আগে।

১৯২০ সালের জুন মাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির প্রাক্কালে ইংল্যান্ডের শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা জে ই ফারার্ড উপাচার্য হওয়ার প্রস্তাব পাঠান স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগের কাছে। উপাচার্যের মাসিক বেতন চার হাজার টাকা। ব্যক্তিগত যানবাহন সুবিধা না থাকলেও আছে বাসভবন সুবিধা। ঢাকা থেকে লন্ডন যাতায়াতের জন্য প্রথম শ্রেণির স্টিমার-ট্রেন ভাড়া পাবেন, মেয়াদ শেষে পাবেন প্রত্যাবর্তন ভাতাও। অপেক্ষাকৃত অনগ্রসর বাঙালিদের জন্য নির্মিত বিশ্ববিদ্যালয় বলে সুযোগ-সুবিধা যে কম থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। প্রস্তাবটা লুফে নিলেন তিনি। সাউথ কেনসিংটন থেকে চিঠির জবাবে লিখলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হওয়ার প্রস্তাব আমি সাদরে গ্রহণ করছি।’ কবে নাগাদ যোগ দিতে পারবেন সে প্রশ্নের জবাবে জানালেন, ১৯২০ সালের ১ ডিসেম্বর যোগ দেবেন তিনি। পাশ্চাত্যে তখন টানটান উত্তেজনা চলছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে। টাইমসহ বড় বড় পত্রিকা তাকে অভিনন্দন জানাল। দুই সন্তান ও স্ত্রী মাবেল হার্টগকে নিয়ে চলে এলেন কলকাতায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পের অফিস তখন কলকাতায়। নতুন বাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার জন্য ২ মাসের অগ্রিম আবেদন করেন তিনি। প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ ছিল না বলে বিনা শর্তে সে টাকা তাকে দেওয়া হয়নি। ব্যক্তি ফিলিপ ছিলেন কাজপাগল। এসব অসুবিধা তার গায়ে লাগেনি। একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেন। জাঁকজমকপূর্ণ গভর্নমেন্ট হাউজ তার জন্য বরাদ্দ করা হলে তাতে তিনি সায় দেননি। কারণ ঢাবি থেকে গভর্নমেন্ট হাউজ ছিল বেশ দূরে।

নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড ও বোরনের মতো অনেক আধুনিক মানুষ ছিলেন হার্টগের বন্ধুস্থানীয়। ব্রিটেনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে ঘুরে অনেক মানুষের পরামর্শ নিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সাজানোর চেষ্টা করেন। পূর্ববঙ্গের মুসলিম সংস্কৃতির কথাও মাথায় রাখেন তিনি। উপমহাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে গিয়ে নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয় সাজানোর স্বপ্ন দেখেন। জার্মান ও ফরাসি শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সরাসরি অভিজ্ঞতা থাকায় তার সুবিধা হয় এই কাজ বাস্তবায়নের পথে হাঁটতে। জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায়চৌধুরীর ‘সাহিত্যসমাজ’ সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন। একজন নতুন মুখ হিসেবে মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা ও নিষ্ঠার প্রমাণ দেওয়ার জন্য সেই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘লর্ড হার্ডিঞ্জের সঙ্গে মুসলিম প্রতিনিধি দলের আলোচনার ফসল এই বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের সর্বাধিক প্রচেষ্টা থাকবে অধিকসংখ্যক মুসলমান ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয়ে টেনে আনতে। তাদের শিক্ষিত করতে হবে যেন রাজনৈতিক ব্যাপারে তারা আরও বেশি অংশ নিতে পারে। ভবিষ্যৎ বাংলার সরকার পরিচালনার যথেষ্ট যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিচয় দেয়। তার মানে এই দাঁড়ায় না যে, কেবল মুসলিমদের জন্যই এই বিশ্ববিদ্যালয় উন্মুক্ত। এই বিশ্ববিদ্যালয় সবার জন্য উন্মুক্ত। অন্তত আমি যত দিন আছি।’

তিনি ১৯২০ সালের ১০ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯২০ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের গভর্নর জেনারেল তাকে সিআইই খেতাবে ভ‚ষিত করেন। জোসেফ হার্টগ ১৯২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২৫ সালে হার্টগকে সম্মানসূচক এলএল.ডি ডিগ্রি প্রদান করে। হার্টগ ইংরেজি, জার্মান, ফরাসি, হিন্দি, উর্দু ও বাংলা ভাষায় পারদর্শী ছিলেন।

ফিলিপ জোসেফ হার্টগ ইন্ডিয়ান পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য, ১৯২৮-২৯ সাল মেয়াদে ভারতীয় শিক্ষাবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান এবং পরীক্ষাগুলোর নির্ভরযোগ্যতা অনুসন্ধানের জন্য গঠিত একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার ইংলিশ কমিটির ডিরেক্টর ছিলেন। ইন্ডিয়ান স্ট্যাটুটরি কমিশন কর্তৃক ভারতে শাসনতান্ত্রিক অগ্রগতি সম্পর্কিত তদন্তকাজের অংশবিশেষ পরিচালনার দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করা হয়েছিল। লন্ডনে বসবাসরত উদারপন্থি ইহুদিদের ধর্মমন্দির (সিন্যাগগ) পরিচালনা পরিষদের তিনি একজন সদস্য ছিলেন। ১৯৩০ সালে তাকে নাইটহুটে ভ‚ষিত করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত জ্ঞানচর্চার একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে স্যার পি জে হার্টগের অবদানের কথা বাংলাদেশ স্মরণ করবে চিরকাল।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৩/০৭/২০২৩   

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.