এইমাত্র পাওয়া

অধ্যক্ষ শাহিনুরের অনিয়মের ১০ অভিযোগের সত্যতা মিলেছে

ঢাকাঃ  মো. শাহিনুর মিয়া। রাজধানীর উত্তরার নওয়াব হাবিবুল্লাহ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। দীর্ঘদিন ধরে কলেজে অনিয়ম করে আসছেন। বিধি না মেনে শ্রেণিকক্ষ ভেঙে নিজের বসবাসের জন্য কোয়ার্টার তৈরি করে ২০১০ সাল থেকে তিনি তার পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছেন। বাসায় তিনটি এসি ব্যবহার করলেও কোনো প্রকার বিদ্যুৎ বিল দেন না। প্রতিষ্ঠানের তিন-চার জন অফিস সহায়ক/আয়াকে তিনি নিজের বাসার কাজ করতে বাধ্য করেন। আর প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন আয়ের বড় একটি অংশ তিনি আত্মসাৎ করেন।

এই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে এমন ১০টি অভিযোগ জমা পড়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। দুদক এই অভিযোগ আমলে নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ পরিপ্রেক্ষিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই কমিটি ইতিমধ্যে তদন্ত রিপোর্ট মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) জমা দিয়েছে। ১০টি অভিযোগই প্রমাণিত হওয়ায় ঐ অধ্যক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেন বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, এ বিষয়ে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়।

মো. শাহিনুর মিয়া সরকারি অংশের বেতন-ভাতাদি ছাড়াও প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে নগর ভাতা ও অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে ৭০ হাজার টাকা, শিফটিং ভাতা ৫০ হাজার টাকা ও কারিগরি ভাতা বাবদ ২০ হাজার টাকাসহ মোট ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা প্রতি মাসে উত্তোলন করে আসছেন। তদন্ত কমিটি অবৈধভাবে ভাতা গ্রহণের বিয়য়টির প্রমাণ পায়। অভিযোগে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের ১৭টি দোকান, সাতটি এটিএম বুথ, তিনটি ব্যাংক ও দুইটি অফিস থেকে ভাড়া বাবদ প্রাপ্ত অধিকাংশ অর্থই তিনি আত্মসাৎ করেছেন। গুঞ্জন রয়েছে, দোকান ভাড়া বাবদ প্রাপ্ত অগ্রিম অর্থ যা প্রায় কোটি টাকারও বেশি, তিনি নিজের পকেটে ঢুকিয়েছেন। অভিযোগটি প্রমাণিত হয়েছে বলে রিপোর্টে বলা হয়।

গত আড়াই বছর ধরে অ্যাডহক কমিটি নিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন তিনি। তিনি গভর্নিং বডি গঠন না করে আরো দুই বার অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছেন। তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়, শাহিনুর মিয়ার গভর্নিং বডির নির্বাচন না দেওয়া ইচ্ছাকৃত। তার বিরুদ্ধে আনীত গভর্নিং বডি নির্বাচন/অ্যাডহক কমিটি গঠন সম্পর্কিত অভিযোগটি প্রমাণিত হয়েছে।

অভিযোগ বলা হয়, গত ১৮ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের এমপিও না করিয়ে জিম্মি করে রাখা হয়েছে। সবাইকে নিজের অনুগত করে রাখার কৌশল হিসেবে তিনি এই পন্থা অবলম্বন করেছেন। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের এই স্বেচ্ছাচারিতার কারণে অনেক শিক্ষক প্রাপ্যতা থাকা সত্ত্বেও এমপিওভুক্ত হতে পারেননি। তিনি তাদের বঞ্চিত করেছেন। তদন্তে অভিযোগটি প্রমাণিত হয়।

প্রতিষ্ঠানের নন-এমপিও শিক্ষকদের তালিকায় আছেন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মাহমুদা খাতুন। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তাকে বাদ দিয়ে তার আস্থাভাজন এবং সহকারী শিক্ষক আরেফা বিল্লাহর এমপিওভুক্তির ফাইল গোপনে ঊর্ধ্বতন অফিসে পাঠান। বিষয়টি জানতে পেরে মাহমুদা খাতুন থানা শিক্ষা অফিসার, জেলা শিক্ষা অফিসার ও আঞ্চলিক উপপরিচালককে তার জ্যেষ্ঠতার প্রমাণ দেখান। ফলে আরেফা বিল্লাহর এমপিওভুক্তির ফাইলটি রিজেক্ট হয়। এতে অধ্যক্ষ রেগে গিয়ে মাহমুদা খাতুনের ওপর নির্যাতন, হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন শুরু করেন। তিনি মাহমুদা খাতুনের প্রতিষ্ঠান থেকে প্রদত্ত বেতন বন্ধ করে দেন। মাহমুদা খাতুন দীর্ঘ ২২ মাস বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়, মাহমুদা খাতুনের সিনিয়রিটি রক্ষা করা হয়নি বলে অভিযোগটি প্রমাণিত হয়েছে।

শাহিনুর মিয়া প্রতিষ্ঠানের কলেজ শাখার স্বীকৃতি করানোর নামে শিক্ষকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা তুলে তা আত্মসাৎ করেছেন। সাক্ষীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে অভিযোগটি প্রমাণিত হয়েছে বলে তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগে বলা হয়, শাহিনুর মিয়া দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে ২০১৬ সালে বরখাস্ত হয়েছিলেন। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) কর্তৃক এ বিষয়টি তদন্ত হয়। তদন্তে প্রমাণিত হয় যে, তিনি চাতুরীর মাধ্যমে অধ্যক্ষ পদের বেতন ও ভাতা গ্রহণ করে বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অতিরিক্ত গৃহীত অর্থ ফেরত প্রদানের নির্দেশনা দেওয়া হলে তিনি তা প্রতিপালন করেননি। বেতনভাতা-সংক্রান্ত আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি সঠিক বলে তদন্ত কমিটির কাছে প্রমাণিত হয়েছে।

তদন্ত কমিটির সদস্য শাহাবুদ্দীন আহমেদ বলেন, যেসব তথ্য তদন্তে পাওয়া গেছে, সে অনুযায়ী রিপোর্ট লেখা হয়েছে।

এসব বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. শাহিনুর মিয়ার মোবাইল ফোনে একাধিক বার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে মোবাইলে এসএমএস দিলেও তিনি সাড়া দেননি।

তবে প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির সভাপতি মতিউল হক বলেন, ‘তদন্ত চলাকালীন আমি উপস্থিত ছিলাম। অধ্যক্ষ বিভিন্ন কাগজপত্র তদন্ত কমিটির কাছে উত্থাপন করেছেন। তদন্ত রিপোর্টে কী আসছে, আমি জানি না। না দেখে কিছু বলতে পারব না।’

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৭/০৬/২০২৩   

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.