প্রতিষ্ঠানকে না জানিয়েই দুবাই যান ডা. সংযুক্তা

ঢাকাঃ রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসার অভিযোগে মা ও নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় নিজের দায় অস্বীকার করেছেন ডা. সংযুক্তা সাহা। তার দাবি, ভুক্তভোগী আঁখি হাসপাতালে ভর্তির সময়ে তিনি হাসপাতালে ছিলেন না। রোগী ভর্তির আগেই তিনি হাসপাতাল ছেড়ে যান।

তবে ভিন্ন কথা বলছে সেন্ট্রাল হাসপাতাল। ডা. সংযুক্তা সাহা হাসপাতালে আছেন জেনেই আঁখিকে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি তিনি যে দেশের বাইরে দুবাই যাচ্ছেন সে ব্যাপারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কোনো কিছু জানাননি বলেও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

মঙ্গলবার সকালে ডা. সংযুক্ততার দায় অস্বীকারের বিষয়ে জানতে চাইলে সেন্ট্রাল হাসপাতালে ম্যানেজার (বিজনেস ডেভেলপমেন্ট) মো. মামুনুর রশিদ রাসেল এ তথ্য জানান।

মামুনুর রশিদ বলেন, ‌‘হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী কোনো চিকিৎসক ছুটিতে যেতে চাইলে অন্তত তিন দিন আগে কর্তৃপক্ষকে চিঠির মাধ্যমে জানাতে হয়। সে অনুযায়ী রোগীদের স্বার্থে নোটিশ টাঙানো হয়। কিন্তু ডা. সংযুক্তা এগুলোর কোনটাই করেননি।’

তিনি বলেন, ‘ঘটনার দিন ৯ জুন ডা. সংযুক্তা যে হাসপাতাল ছেড়ে গেছেন সেটিও আমাদের অবহিত করেননি। আঁখিকে হাসপাতালে ভর্তির আগে আমরা জানতাম না তিনি নেই। অস্ত্রোপচার হওয়ার পর জটিলতা দেখা দিলে পরদিন ভোরে আমরা জানতে পারি সংযুক্তা সাহা দেশের বাইরে যাচ্ছেন।’

তবে আগের দিন ডা. সংযুক্তাকে অভিযুক্ত করে দেওয়া হাসপাতালের উপপরিচালক মো. নজরুল ইসলামের দেওয়া বক্তব্য তার ব্যক্তিগত বলে দাবি করেন তিনি। মামুনুর রশিদ বলেন, ‘এ ঘটনায় তদন্ত হচ্ছে। তাই প্রতিবেদন পাওয়ার আগে কাউকে দায়ী করতে পারি না।’

এর আগে, আঁখি ও নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সকালে সংবাদ সম্মেলনে নিজের সব দায় এড়িয়ে যান সেন্ট্রাল হাসপাতালের গাইন ও প্রসূতি বিভাগের চিকিৎসক ডা. সংযুক্তা সাহা। এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের মাধ্যমে রোগীকে প্রলুব্ধ করাকে অনৈতিক মনে করেন না তিনি।

দীর্ঘদিন সেন্ট্রাল হাসপাতালে চিকিৎসা দিলেও তার নামে রোগীর ভর্তির ব্যাপারে ডা. সংযুক্তা সাহা বলেন, ‘আমাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন ছিল নরমাল ডেলিভারির। বেশি বেশি রোগী ভর্তি হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাহ বাহ দিতেন। কিন্তু আঁখির ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমার ওপর দায় চাপিয়ে পার পেতে চাচ্ছে। তারা আমার নাম ব্যবহার করে রোগী ভর্তির ব্যাপারে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। এখন তারা নিজেদের স্বার্থে আমার ওপর দায় চাপিয়ে দিচ্ছেন।’

‘যেখানে আমি দেশেই ছিলাম না সেখানে কেন আমি দায়ী হব? রোগীদের কেন তারা বলেননি যে আমি নেই। আমি একজন কনসালট্যান্ট, সেখানে রাত সাড়ে ১০টার দিকে বের হয়েছি’, বলেন তিনি।

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা অনৈতিক মনে করেন কি না জানতে চাইলে এই চিকিৎসক বলেন, ‘এটি সচেতনতার জন্য করা হয়। বিএমডিসির পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো রুলস নেই।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভে রোগীর গোপনীয়তা প্রকাশের ব্যাপারে তিনি বলেন, সেটি রোগীর নিজের ব্যাপার। এর বেশিকিছু বলতে রাজি হননি তিনি।

একজন চিকিৎসকের পক্ষে এত রোগী দেখা সম্ভব কি না জানতে চাইলে ডা. সংযুক্তা সাহা বলেন, ‘আমি একা এগুলো করি না। আমাদের টিম দ্বারা হয়ে থাকে। ’

আঁখির ও তার নবজাতকের মৃত্যুতে আপনি পুরোপুরি দায় এড়াচ্ছেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দায় এড়িয়ে গেলে তো আর মিডিয়ায় কথা বলতাম না। কিন্তু যেখানে আমি হাসপাতালে ছিলাম না, সেখানে আমার নামে রোগী ভর্তি করা হলে কেন আমি দোষী হব?’

এদিকে, আজ দুপুরে সরেজমিনে সেন্ট্রাল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় সুনসান নীরবতা। যেখানে প্রতিদিন শত শত রোগী চিকিৎসা নিতে আসতেন রাজধানীরদসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, সেখানে রোগী আনাগোনা একেবারেই কম।

নোটিশ দিয়ে আইসিইউ চালুর ঘোষণা দিলেও পরে সেটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। হাসপাতালের নোটিশ বোর্ডে আইসিইউ ও অস্ত্রোপচার বন্ধের তথ্য জানানো হয়েছে। এমনকি ডাক্তারদের তালিকায় ডা. সংযুক্তার নাম কাগজ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ৯ জুন প্রসব ব্যথা নিয়ে ২৫১টি শয্যার সেন্ট্রাল হাসপাতালে আসেন মাহবুবা রহমান আঁখি (২৫)। ওইদিন নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে সন্তান প্রসব করার কথা থাকলেও পরে সিজার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভিডিও দেখে ঝুঁকি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির গাইনি ও প্রসূতি বিভাগের চিকিৎসক ডা. সংযুক্তা সাহার কাছে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু সে সময় হাসপাতালে ছিলেন না ওই চিকিৎসক।

রোগীদের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারে সন্তান প্রসবকালে আঁখির মূত্রণালি মলদার কেটে ফেলা হয়েছে। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে পর দিনই আঁখিকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। অন্যদিকে জন্মের কয়েক ঘণ্টার পরই মারা যায় নবজাতক। আট দিন চিকিৎসাধীন থেকে গত রোববার মা আঁখিও মারা যান।

মা ও নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় ভুল চিকিৎসার অভিযোগ এনে সেন্ট্রাল হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল এবং অস্ত্রোপচারে জড়িত চিকিৎসকদের নিবন্ধন বাতিলের দাবি জানিয়েছে আঁখির সহপাঠীরা। এ ঘটনায় ব্যবস্থা নেওযার আশ্বাস দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত হাসপাতালটির দুই চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডা. সংযুক্তার চিকিৎসা দেওয়া বন্ধসহ সাতটি নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

আগামীকাল সকাল ১০টায় সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে সেন্ট্রাল হাসপাতাল। সেখানেই নিজেদের অবস্থা তুলে ধরবে প্রতিষ্ঠানটি।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২০/০৬/২০২৩   

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.