হাজী অছি আমরুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক উম্মে কুলসুম। ছবিঃ সংগৃহীত

পদত্যাগ করেও স্বপদে বহাল ঝিনাইগাতীর স্কুল শিক্ষিকা উম্মে কুলসুম 

আল আমীন হোসেন মৃধা, শিক্ষাবার্তা, ঢাকাঃ শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার হাজী অছি আমরুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক উম্মে কুলসুম আট বছর আগে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ থেকে পদত্যাগ করেও বর্তমান সেই একই পদে বহাল তবিয়তে রয়েছেন এমনকি সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে এমপিও ভোগ করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাজী অছি আমরুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর সেলিমকে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ জালিয়াতির অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করে সহকারী প্রধান শিক্ষক উম্মে কুলসুম। এরপর প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য ঘোষণা করে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ থেকে ২০১৫ সালের ২৭ অক্টোবর পদত্যাগ করে পদত্যাগ পত্র জমা দেন বিদ্যালয়টির তৎকালীন সভাপতি মোঃ জাকির হোসেনের নিকট। আর এই পদত্যাগের রেজুলেশন করেন তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটি। তবে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর সেলিমকে জোরপূর্বক বিদ্যালয়ের ঢুকতে না দিয়ে এবং প্রধান শিক্ষক সেলিমের এমপিও বহাল থাকা অবস্থাতেই প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য ঘোষণা করে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ নেন উম্মে কুলসুম। এমপিও বহাল থাকা অবস্থায় কোনভাবেই সেই পদ শূন্য ঘোষণার সুযোগ না থাকায় এবং হাইকোর্ট কর্তৃক উম্মে কুলসুমের প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ অবৈধ ঘোষণা করলে তিনি পদত্যাগ করা সেই সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে ফিরে যান যা এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী অবৈধ। এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী, পদত্যাগ করে এবং ম্যানেজিং কমিটি কর্তৃক পদত্যাগ পত্রটি গৃহীত হলে ঐ শিক্ষকের স্বপদে ফিরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই।

বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর সেলিমের নিয়োগ জালিয়াতি নিয়ে মামলা এবং অভিযোগ দায়ের করলে সেই মামলা থেকে জাহাঙ্গীর সেলিমের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ খারিজ হয়ে যায়। এমপিও আপিল কমিটিও জাহাঙ্গীর সেলিমের প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ জালিয়াতির কোন প্রমাণ পায়নি এমনকি শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত তদন্ত প্রতিবেদনেও জাহাঙ্গীর সেলিমের নিয়োগ জালিয়াতির কোন প্রমাণ মেলেনি।

শিক্ষাবার্তা অনুসন্ধানে এই সহকারী প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে উঠেছে আরও ভয়ংকর তথ্য। ২০১৯ সালে হাইকোর্ট কর্তৃক স্থগিত কমিটি দ্বারা সহকারী প্রধান শিক্ষক উম্মে কুলসুম দুই জন কর্মচারী নিয়োগ প্রদান করেন এমনকি তাদের এমপিওভুক্ত করেন। নিয়মিত ম্যানেজিং কমিটিবিহীন কোন ভাবেই কোন স্কুলে কর্মচারী নিয়োগের কোনো ধরনের বিধান না থাকলেও দুই পদের বিপরীতে দশ লক্ষ টাকা ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে এই নিয়োগ দেন উম্মে কুলসুম।

সহকারী প্রধান শিক্ষক উম্মে কুলসুমের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বিদ্যালয়টির সাবেক সভাপতি জাকির হোসেন ও অভিভাবকবৃন্দ ২০২০ সালের মার্চ মাসে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড বরাবর একটি লিখিত অভিযোগও দেন। তবে সেই অভিযোগের ভিত্তিতে আজ পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর সেলিম এর বিরুদ্ধে করা মামলা ও অভিযোগ হাইকোর্ট, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাউশি কর্তৃক মিথ্যা প্রমাণ হলেও আজ পর্যন্ত তাঁকে স্বপদে বসতে দেয়নি উম্মে কুলসুম। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে জাহাঙ্গীর সেলিমকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে স্বপদে বহালের জন্য চিঠি দেয় ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড এবং সাত কর্ম দিবসের মধ্যে তাঁকে (জাহাঙ্গীর সেলিম) স্বপদে বহাল করে বোর্ডকে অবহিত করার কথা চিঠিতে উল্লেখ করলেও সাড়ে চার বছরেও সেই সাত কর্ম দিবস আজ পর্যন্ত পূরণ হয়নি।

জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের একাধিক অভিভাবক বলেন, এক সময়ে এই বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী সংখখ্যা যে পরিমাণ ছিল তা এখন অর্ধেকে নেমে এসেছে। আগে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল তিনশ’র এর উপরে। বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা একশোর নিচে। অন্য স্কুলের পরীক্ষার্থী দিয়ে এই স্কুলে রেজিস্ট্রেশন করে সব মিলিয়ে এক শত শিক্ষার্থীর কিছু বেশি এবারে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। এভাবে এই সহকারী প্রধান শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা করতে থাকলে এক সময়ে ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠে কোনো শিক্ষার্থীই পাওয়া যাবে না।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক উম্মে কুলসুম শিক্ষাবার্তা’কে জানান, তিনি অসুস্থ্য, তাঁর চোখ অপারেশন করা হয়েছে, তাঁর কথা বলা নিষেধ আছে। এখন তিনি কথা বলতে পারবেন না। পরে যোগাযোগ করতে বলেছেন।

বিদ্যালয়টির ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি জাকির হোসেন শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, তিনি তার সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ থেকে আমার কাছে পদত্যাগ পত্র দেন এবং তা কমিটির উপস্থিত সকল সদস্যের সর্বসম্মিতি ক্রমে গৃহীত হয় এবং সেটার রেজুলেশনও হয়। তাঁর অবৈধ প্রধান শিক্ষক নিয়োগ বাতিল হলে তিনি পুনরায় আগের পদে বেতন ভাতা উত্তোলন করছেন যা নিয়ম বহির্ভুত। এ বিষয়ে আমি এবং অভিভাবকরা মিলে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে লিখিত দিয়েছি। তবে কোন প্রতিকার পাইনি। বছরের পর বছর অবৈধভাবে তিনি পদত্যাগ করা পদের এমপিও ভোগ করছেন। হাইকোর্ট কর্তৃক স্থগিত কমিটি দিয়ে তিনি দুইজন কর্মচারী নিয়োগ করেছেন এবং তাদের এমপিওভুক্তও করে ফেলেছেন। কমিটিবিহীন নিয়োগ দেওয়া কোনভাবেই বিধি সম্মত নয়।

জানতে চাইলে ঝিনাইগাতি মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল মুঠোফোনে কোন কথা বুঝতে পারছেন না বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন  করে দেন।

এ বিষয়ে শেরপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ রেজুয়ান শিক্ষাবার্তাকে বলেন, স্থগিত ম্যানেজিং কমিটি এবং সেই কমিটি কর্তৃক নিয়োগের সময় আমি দায়িত্বে ছিলাম না বলে জানতে পারিনি। তবে ঐ স্কুলে হাইকোর্টে মামলা চলছে সেটা জানি। মামলা শেষ হলে স্কুলটির বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নিব।

জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা ময়মনসিংহ আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিচালক জনাব আবু নূর মো: আনিসুল ইসলাম চৌধুরী শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, জী অছি আমরুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক উম্মে কুলসুম  যদি পদত্যাগ করে থাকেন তাহলে কোন ভাবেই সেই পদে বহাল থাকার সুযোগ নেই। সেটা অবৈধ। এছাড়াও কোন ম্যানেজিং কমিটি যদি হাইকোর্ট কর্তৃক স্থগিত থাকে তাহলে স্থগিত থাকা অবস্থাতে কোন কর্মচারী নিয়োগ করার সুযোগ নেই। নিয়োগ হয়েছে এবং নিয়োগ কৃত দুই জন কর্মচারী এমপিওভুক্ত হয়ে এমপিও সুবিধা ভোগ করছেন উল্লেখ করলে তিনি বলেন, এটা কোন ভাবেই গ্রহণ যোগ্য নয়। এই বিষয়ে কেউ কোন অভিযোগ করলে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিব।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৯/০৬/২০২৩   

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.