এইমাত্র পাওয়া

ঢাকায় ‘হিট অফিসার’ কেন দরকার?

ঢাকাঃ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়ছে বিশ্বের তাপমাত্রা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাপমাত্রা বাড়ার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে শহর ও তার বাসিন্দাদের। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বাড়ছে তাপমাত্রা। মাসখানেকের বেশি সময় ধরে প্রচণ্ড গরমে নাকাল পুরো দেশ। তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি রাজধানী ঢাকায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, যে হারে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে তার প্রভাব পড়বে জিডিপিতে।

যানজট, জলাবদ্ধতার পাশাপাশি রাজধানীর নতুন সমস্যা অধিক তাপমাত্রা। চলতি বছর এপ্রিল মাসে ২৬ দিন ঢাকায় তাপপ্রবাহ হয়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, এপ্রিল মাসে স্বাভাবিকের থেকে ৬৬ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। ১৬ এপ্রিল ঢাকায় দিনের তাপমাত্রা ছিল ৪০.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা গত ৫৮ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এমন একটি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অ্যাডিয়েশন আরশট-রকফেলার ফাউন্ডেশনের হয়ে ঢাকার ‘চিফ হিট অফিসার’ (সিএইচও) প্রথমবারের মতো নিয়োগ পেয়েছেন ‘চিফ হিট অফিসার’। বাংলায় কথাটি ‘শীর্ষ তাপ কর্মকর্তা’ হলেও, আসলে কথাটি হবে ‘শীর্ষ তাপনিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা’। নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম বুশরা আফরিন।

হিট অফিসার ও তার কাজ

ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের তথ্য অনুসারে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা কমানোর লক্ষ্যে চিফ হিট অফিসার নিয়োগ দেয়া হয়।

একজন চিফ হিট অফিসারের কাজ হলো, শহরের নাগরিকদের চরম তাপমাত্রা থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া। তার কাজের আওতায় রয়েছে তাপমাত্রা কমানোর জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা তৈরি ও সমন্বয় করা।

পাশাপাশি তাপমাত্রার কারণে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি নানা ঝুঁকি হ্রাসের জন্য নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা। এসবের মধ্যে আছে বৃক্ষরোপণ, ছায়াযুক্ত স্থান বাড়ানো, সবার সময় কাটানোর মতো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্থান বাড়ানো এবং তাপ নিয়ন্ত্রণ ও তাপজনিত রোগের চিকিৎসাবিষয়ক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করা।

বুশরা আফরিন ‘চিফ হিট অফিসার’ হিসেবে নিয়োগের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বেশকিছু জায়গায় এ নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। বাংলাদেশে এই প্রথম কাউকে হিট অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলেও এর আগে আমেরিকার মিয়ামি, লস অ্যাঞ্জেলস, গ্রিসের অ্যাথেন্স, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন, আফ্রিকার কিছু দেশে এই ‘চিফ হিট অফিসার’ নিয়োগ করা হয়।

নগরীকে বাঁচাতে চাই সবুজ ও জলাধার
হিট অফিসারের কাজ কী এবং ঢাকায় হিট অফিসারের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু এ বিষয় জানিয়েছেন পরিবেশবিদ এবং নগর পরিকল্পনাবিদরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সফি উল্লাহ  বলেন, ঢাকায় কিন্তু বলতে গেলে কোনো জলাধার নেই। যেগুলো ছিল সেগুলোও দখল হয়ে গেছে এবং যেসব গ্রিন কাভারেজ বা সবুজ এলাকা ছিল সেগুলোতেও স্থাপনা গড়ে উঠেছে। হিট অফিসার বলি আর যাই বলি ঢাকায় একজন প্ল্যানার দরকার, যিনি ঢাকার নির্ধারিত ওই অংশকে চিহ্নিত করে— অর্থাৎ যেখানে হিট বেড়ে যাচ্ছে এবং বেড়ে যাওয়ার কারণ এবং প্রভাবগুলো বের করে তার সমাধানে কাজ করবেন।

হিট কমানোর জন্য গ্রিন কাভারেজ প্রয়োজন। তবে সেটা চাইলেই তো করা সম্ভব না। এ সংক্রান্ত পরিকল্পনা করতে হবে যে কীভাবে এই গ্রিন কাভারেজ বাড়ানো যায়।

বুশরা আফরিনের নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গ্রিন কাভারেজ বাড়ানোর জন্য এবং হিট কমানোর জন্য প্ল্যানিং লাগবে, প্ল্যানার লাগবে। তিনি এই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেবেন। এ জন্য পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট লোকের প্রয়োজন রয়েছে। কাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তার চেয়ে বড় বিষয় হলো এমন একজন লোকের অবশ্যই প্রয়োজন ঢাকার।

চিফ হিট অফিসার বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. নীলোপল অদ্রি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে প্রভাব পড়ছে সেগুলো শহরে একটু ভিন্নভাবে পড়ে। বিষয়টিকে আমরা আরবান ক্লাইমেট চেঞ্জ বলে থাকি।

আমাদের শহরের বাস্তবতায় বিশেষ করে ঢাকাতে দুটো বড় সমস্যার মধ্যে একটি হলো অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং আরেকটি হলো জলাবদ্ধতা। ঢাকার মতো একটি শহরের জন্য এটা একটি ভালো উদ্যোগ যে একজন চিফ হিট অফিসার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তার থেকে আমরা ভালো কিছুই আশা করছি। তিনি ইতোমধ্যে বলেছেন তিনি কী করতে চান এবং তার কী পরিকল্পনা রয়েছে।

নগর পরিকল্পনার এই শিক্ষক আরও বলেন, নানান ধরনের কর্মপরিকল্পনা নতুন নতুন বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে হিট অফিসারকে কাজ করতে হবে। যেমন- বেশি বেশি গাছ লাগানো কিংবা জলাশয়গুলো যেন ভরাট না হয় তার ব্যবস্থা করতে হবে। ভরাট জলাধারগুলো উদ্ধার করতে হবে। আমরা আশাবাদী যে, হিট অফিসার নিয়োগের ফলে এই কাজগুলো আরও সুসংগঠিতভাবে বাস্তবায়ন হবে।

তাপমাত্রার বাড়ার প্রভাব পড়বে জিডিপিতে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফাহমিদা পারভীন  বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবী উষ্ণ হচ্ছে। এই গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শহরগুলো।

গ্রামের চেয়ে শহরের তাপমাত্রা বেশি থাকার কারণ- শহরের মেটাল, কংক্রিট এবং বিল্ডিংয়ের গ্লাস। এগুলোর কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে। ঢাকা শহরে তাপমাত্রা অনেক বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ নগরীতে সবুজ নেই। পুরো ঢাকা ঘুরে গুটি কয়েক গ্রিন কাভারেজ জোন পাওয়া যাবে। যেমন- রমনা, ধানমন্ডি পার্ক, গুলশান পার্ক। এরকম কয়েকটি ছাড়া ঢাকায় কিন্তু আর কোনো গ্রিন কাভারেজ নেই।

তিনি আরও বলেন, যে হারে তাপমাত্রা বাড়ছে এবং এ তাপমাত্রা যদি একই হারে বাড়তে থাকে, তাহলে ২০৫০ এর মধ্যে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ শহরের ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়বে। যদি একই হারে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে তবে ২১০০ সালের মধ্যে ২৫ শতাংশ শহরে এই তাপমাত্রা বাড়বে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

তার মতে, তাপমাত্রা বাড়ার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জিডিপিতে। ঠিক একই হারে তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে ৩ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত জিডিপি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ঢাকার পরিবেশ ভালো করতে হিট অফিসারের নিয়োগের বিষয়টিকে সময়োপযোগী এবং যৌক্তিক বলে মনে করেন এ পরিবেশবিদ।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা অ্যাড্রিয়েন আরশট-রকফেলার ফাউন্ডেশন রেসিলিয়েন্স সেন্টার ও এক্সট্রিম হিট রেসিলিয়েন্স অ্যালায়েন্সের কল্যাণে এই পদ সৃষ্টি হয় এ দশকের শুরুর দিকে। সংস্থাটি ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ১০০ কোটি মানুষকে জলবায়ুর চরম অবস্থা থেকে রক্ষার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৫/০৫/২০২৩ 

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তা’য়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.