জিকরুল হক, সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিবেদকঃ তিন দশক পর সৈয়দপুর সরকারি কলেজ এইচএসসির ফলাফলে ইউটার্ন নিয়েছে। শিক্ষকদের দায়িত্ববোধ আর অধ্যক্ষের দক্ষ পরিচালনায় এবারে এসেছে ঈর্ষণীয় ফল। রংপুর বিভাগের ঐতিহ্যবাহি এ কলেজটি ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও জাতীয়করণ হয় বর্তমান সরকারের তৃতীয় মেয়াদে। এর ফলে বিলুপ্ত হয়ে যায় স্থানীয় কলেজ পরিচালনা পরিষদ। অধ্যক্ষের দায়িত্বে আসে শিক্ষা ক্যাডারের অধিভুক্ত শিক্ষক। রাজস্বখাতে পদায়ন হয় শিক্ষক কর্মচারীদের।
বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে অনুসন্ধানে জানা যায়, লোকাল কমিটি দ্বারা কলেজ পরিচালিত হওয়ায় শিক্ষকেরা ছিলো বহুদলে বিভক্ত। অধ্যক্ষের চেয়ারটি ছিলো দয়ার দান। গভর্নিং বডির সদস্যদের ছিলো অযাচিত হস্তক্ষেপ। বলতে গেলে কলেজ পরিচালনায় ছিলোনা কোন শৃঙ্খলা। শিক্ষকরা রাজনৈতিক দলে যুক্ত থাকার কারণে খেয়াল খুশিমতো ক্লাসে পাঠদান করতো। শিক্ষকরা মাসের প্রায় সময় থাকতেন গড় হাজির। কিন্তু ২০২০ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক এ কলেজে অধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়া হয়। ফলে শিক্ষক কর্মচারীরা নড়েচড়ে বসেন। শুরু হয় জঞ্জাল সরানোর প্রক্রিয়া। প্রথম অবস্থায় প্রতিষ্ঠান প্রধানকে এমন কাজে বেগ পেতে হয়। তারপরও শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রক্রিয়া থাকে অব্যাহত। এমন অবস্থায় ২০২২ সালে ওই কলেজের সহকারী অধ্যাপক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আসাদুজ্জামান আসাদ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। শুরু হয় কলেজে শৃঙ্খলা ফেরানোর যুদ্ধ।
এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে তিন দশক পর ইউটার্ন নেয়ার বিষয়ে জানতে কথা হয় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আসাদুজ্জামান আসাদের সঙ্গে। তিনি বলেন, দায়িত্ব নেয়ার পর সকাল ৯টায় কলেজে উপস্থিত হন। হাতে থাকে শিক্ষক হাজিরা খাতা। তারপর তিনি চলে যান হাজিরা খাতায় অনুপস্থিত শিক্ষকের ক্লাশে। সেখানে গিয়ে অনুপস্থিত শিক্ষকের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে বিলম্বের কারণ জানতে চান। এরপর নিজেই শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেয়া শুরু করেন। এমন অবস্থা চলার পর শিক্ষকদের গড়হাজির শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনেন। এরপর শিক্ষার্থীদের ক্লাসে শতভাগ উপস্থিত করার জন্য নানা ধরনের প্রোগ্রাম হাতে নেন। এসবের মধ্যে ছিলো উপস্থিত বক্তৃতা, আবৃত্তি প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড। যেসব শিক্ষার্থী ভালো করতো তাদের করা হতো পুরস্কৃত। আর মাঝে মাঝেই পরীক্ষার ফলাফল ভালো করবার জন্য ও সমাজে কিভাবে সম্মানজকভাবে জীবনযাপন করা যাবে এসব বিষয়ে অনুপ্রেরণামূলক আলোচনা করতেন তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে। এভাবেই শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মাঝে দূরত্বের দেয়াল ভেঙ্গে গড়ে তোলা হয় বন্ধুত্বের সম্পর্ক।
বিশেষ করে পরীক্ষার কয়েক মাস পূর্ব থেকেই প্রতিজন শিক্ষকের হাতে ১০ জন করে পরীক্ষার্থীর নাম, মোবাইল নম্বরসহ তালিকা তুলে দেয়া হয়। কোন শিক্ষার্থী কলেজে অনুপস্থিত থাকলেই মোবাইলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলতেন দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক। আর এটি দৃঢ়তার সঙ্গে মনিটরিং করতেন অধ্যক্ষ। এরপর শিক্ষকদের নিয়ে নিয়মিত করা হতো কাউন্সিলিং। শিক্ষক সুলভ মনোভাব শিক্ষকদের মাঝে গড়ে তোলা ও দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সচেতন করাই ছিল কাউন্সিলিংয়ের মূল থিম।
এভাবেই শিক্ষকদের পাঠদানে উৎসাহী এবং শিক্ষার্থীদের পড়ার প্রতি মনোযোগী করতে পেরেই ২০২২ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে অতীত রেকর্ড ভাঙ্গা সম্ভবপর হয়েছে। তার মতে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অতীত ফলাফলের কারণে ভালো শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তিই হতো না। অভিভাবকরাও নাক সিটকাতো। এমন পরিস্থিতি থেকে ধীরে ধীরে বের হয়ে আসছে ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
২০২২ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় তিন বিভাগ মিলে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ৪২০ জন। পাশ করেছে ৪০৪ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬৮ জন। পাশের হার ৯৬ দশমিক ১৯। অথচ ২০২১ সালে ৪১০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাশ করেছিল ৩৯২ জন। পাশের হার ছিলো শতকরা ৯৬ ভাগ। জিপিএ পেয়েছিলো তিন বিভাগ মিলে ৫২ জন। এদিকে ২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ৪০০ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে শতভাগ পাস করলেও জিপিএ-৫ পেয়েছিলো দুই বিভাগ মিলে মাত্র ২০ জন। তার মধ্যে মানবিক বিভাগ থেকে কেউ জিপিএ-৫ পায়নি। কিন্তু ২০২২ সালের পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে ১১ জন ও ২০২১ সালের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পায় ১০ জন।
অধ্যক্ষ আসাদের মতে, দায়িত্বশীলতা ও সততা থাকলে যে কোন সমস্যা মোকাবেলা করে পরিস্থিতি ও পরিবেশ পাল্টে দেয়া সম্ভব। এজন্য থাকতে হবে দৃঢ় সচেতন।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১১/০২/২৩
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
