নিজস্ব প্রতিবেদক, নীলফামারীঃ সরকারি চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরদিনই পেনশনের টাকা পেয়েছেন নীলফামারী সদর উপজেলার দক্ষিণ রাম নগর ফুলতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহিদা আফরোজ। গত বুধবার তার বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হলে মেয়াদ শেষ হয় চাকরিকালের। মেয়াদ পূর্তির ঠিক এক দিন পর গতকাল বৃহস্পতিবার কোনো ধরনের ভোগান্তি ছাড়াই তিনি বুঝে পেয়েছেন পেনশনের টাকার চেক।
শাহিদা আফরোজ অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল পেনশনটা ডিউ ডেটে কেউ পায় না। আমিও সেভাবেই প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু অবসরে যাওয়ার পরদিনই পেনশনের টাকার চেক পেয়ে গেলাম। আমাকে ফোন করে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে ওই চেক প্রদান করেন জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আব্দুল খালেক। তার এ রকম কাজে আমি এক্সাইটেড।’
তিনি আরো বলেন, ‘ধারণা ছিল চাকরি শেষে পেনশনের টাকার জন্য অনেক দৌড়ঝাঁপ করতে হবে। চিন্তায় ছিলাম, না জানি কোথায় কোথায় যেতে হবে। পেনশনের টাকার জন্য আমার পরিচিতজনকে অনেক দৌড়াতে দেখেছি। কিন্তু আজকে আমার ধারণা পাল্টে গেল। কোনো দৌড়ঝাঁপ ছাড়াই এজি অফিস আমাকে ডেকে নিয়ে চেক (পেনশনের) তুলে দিল আমাকে।’
‘নিশ্চয়ই জেলা এজি অফিসের কোনো পরিবর্তন হয়েছে’ মন্তব্য করে শাহিদা আফরোজ বলেন, ‘এ অফিসের যিনি হেড তিনি অবশ্যই সক্রিয় এবং মানবিক। তিনি এ অফিসে যোগদান করার পর বদলে ফেলেছেন পুরনো ধারণা। তার সময়ে আমার অনেক পরিচিতজন পেনশনের চেক পেয়েছেন আমার মতো করেই। ভালো কাজ করার জন্য একজন মানুষের সদিচ্ছাই যথেষ্ট। এটি তার মধ্যে আছে বলে আজকে প্রমাণ পেলাম।’
ওই শিক্ষিকার বাড়ি জেলা শহরের উকিলপাড়ায়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে চাকরিতে প্রবেশ করেছিলেন ১৯৮৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। ১৯৬৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তার জন্ম তারিখ অনুযায়ী বয়সের ৬০ বছর পূর্তি হয় চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি।
জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আব্দুল খালেক বলেন, ‘কোনো চাকরিজীবীর অবসরের সময় হলেই প্রত্যাশিত শেষ বেতনের সনদ আমরা যথাযথভাবে যাচাই করে রাখি। এরপর প্রস্তুতি গ্রহণ করে অবসরে যাওয়ার পরদিনই পেনশনের টাকার চেক প্রদান করছি। এতে করে মানুষ উপকৃত হচ্ছে। এ জন্য আমার অফিসের গোটা টিমকে নিয়ে কাজ করছি।’
এমন সদিচ্ছার ব্যাপারে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমার এক আত্মীয়ের সঙ্গে একই ডিপার্টমেন্টে কাজ করতাম। তিনি মারা যান। তার কয়েকজন ছেলে-মেয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিল। অভিভাবকের মৃত্যুর পর গোটা পরিবার অসহায় হয়ে পড়ে। এমন অসহায়ত্বে ছেলে-মেয়েদেরকে টিউশনি করে লেখাপড়া করতে দেখেছি। তার সেই পেনশনের টাকা পেতে দেড় বছর ঘুরেছে ছেলে-মেয়েরা। পরিবারটির সেই কষ্ট আমার মনে দাগ কাটে। তখন থেকে আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, কখনো সুযোগ পেলে একজন চাকরিজীবীর অবসরের পরদিনই পেনশনের টাকা বুঝিয়ে দেব। আল্লাহ তাআলা আমাকে সে সুযোগটা করে দিয়েছেন।’
ওই কার্যালয়ের নিরীক্ষক দুলাল চন্দ্র রায় বলেন, ‘স্যারের এমন সদিচ্ছাকে স্বাগত জানিয়ে তার নির্দেশমতো আমরা কাজ করছি। সময়ের মধ্যে মানুষের সেবা দিতে পেরে নিজেদেরকে ধন্য মনে হচ্ছে। স্যারের অনুপ্রেরণা অনুসরণ করে চাকরিজীবনটা কাটাতে চাই।’
ওই কর্মকর্তা জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে যোগদান করেছেন ২০২২ সালের ২২ এপ্রিল। এ কার্যালয়ে যোগদানের পর থেকে ওই শিক্ষিকার ন্যায় মোট ৭৮টি পেনশন নিষ্পত্তি করেছেন। বর্তমানে তার দপ্তরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় নেই কোনো পেনশনের ফাইল। এর আগে তিনি ডোমার, কিশোরগঞ্জ উপজেলায় কর্মকর্তার দায়িত্বে থেকে একইভাবে চমক দেখিয়েছিলেন। তার এমন সততায় অর্জন করেছেন জাতীয় পুরস্কার। প্রশংসিত হয়েছেন ‘পেনশন কেস সহজীকরণ’ পদ্ধতি উদ্ভাবন করে।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১০/০২/২৩
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
