দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতিতে কূলকিনারাহীন শিক্ষকের রোজনামচা

দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘কতটুকু কষ্টে আছি বলার মতো নয়। প্রতি মাসে যে টাকা রোজগার হয়, এখন সেই টাকায় কোনোরকমে শুধু সমানে সমান করে পরিবার চালিয়ে নিচ্ছি। টাকা জমানো যাচ্ছে না।’ বিদ্যুৎ আর গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কার কথা তিনি জানান।

দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শীত মৌসুমের কারণে এখন বিদ্যুৎ বিল দিতে হয় প্রায় এক হাজার টাকা। গরমের সময় প্রতি মাসে এই ব্যয় গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় দেড় হাজার টাকায়। নতুন করে মূল্য বৃদ্ধির কারণে এই টাকায় আর হয়তো হবে না।

প্রতি মাসে গ্যাসের প্রিপেইড মিটারে ১০০০ হাজার টাকা ভরেন। ৩০ দিনে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকার গ্যাস ব্যবহৃত হয়। আর প্রতি মাসে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পানির বিল দিতে হয়।

বিদ্যুৎ বিভাগের বাড়ানো এই নতুন দাম আগামীকাল ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর। নতুন মূল্য অনুযায়ী, গ্রাহক পর্যায়ে সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর জন্য আগের চেয়ে ইউনিটপ্রতি ২০ পয়সা মূল্য বেড়েছে। গ্রাহক পর্যায়ে এই দাম ৩ টাকা ৯৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪ টাকা ১৪ পয়সা করা হয়েছে। পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য ৬ টাকা ২০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ১০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এখন পরিবার চালানোর খরচ বাড়লেও বিপরীতে রোজগার এক টাকাও বাড়েনি জানিয়ে এই শিক্ষক বলেন, ‘এত বেশি খরচ বেড়েছে যে আগের তুলনায় খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। কিন্তু আয় আরও কমেছে। বিশেষ করে শিক্ষকতায়।’

এর ব্যাখ্যা দিয়ে দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আগে হয়তো একজন শিক্ষার্থীকে দুই হাজার টাকায় টিউশনি পড়াতাম। অভিভাবকেরা টাকা দিতে না পারায় সেটা এখন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় নেমে এসেছে। অনেক অভিভাবক সারা বছর টিউশনি না পড়িয়ে শুধু পরীক্ষার আগে দুই-তিন মাস পড়াচ্ছেন।’

গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম এমন সময় বাড়ানো হচ্ছে, যখন নিত্যপণ্যের চড়া দামে সাধারণ মানুষ এমনিতেই সংকটে রয়েছে। অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি কমেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এতে বাড়তি কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে না। বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও গত মে মাস থেকে ডলারের দাম ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে ১০৫ টাকায় ওঠায় সব আমদানি পণ্য ও শিল্পের কাঁচামালের দাম বেড়েছে, যা বাড়িয়ে দিয়েছে নিত্যপণ্যের দাম।

এর প্রভাব পড়েছে দেলোয়ার হোসেন জীবনেও। বাজার-সদায়ে অনেক কিছু বাদের তালিকায় রেখেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আগে সপ্তাহে অন্তত দুই দিন গরুর মাংস খাওয়ার চেষ্টা করতাম। এখন কখনো এক মাসে, কখনো দুই মাসে একবার কিনি।’

দেলোয়ার হোসেন আরও বলেন, ‘আমি বাসায় কখনো সাদা মুরগি (ব্রয়লার) খেতাম না। দাম কিছুটা কম দেখে এখন সেটাই নিয়মিত খাই। মাছের মধ্যে বাজারে যেটা সবচেয়ে কম দামে পাওয়া যায়, সেটাই কেনার চেষ্টা করি।’

ব্যক্তিগত ব্যয় একেবারে শূন্যে নামিয়ে এনেছেন জানিয়ে দেলোয়ার বলেন, ‘আগে বন্ধুদের সঙ্গে প্রচুর গল্প-আড্ডায় সময় দিতাম, এসবে খরচও হতো। খরচ কমাতে এক বছর ধরে সেটাও বাদ দিয়েছি। এমন করছি যাতে দুই ছেলে আর স্ত্রীকে নিয়ে কোনোমতে সংসার চালিয়ে যেতে পারি।’

দিনে দিনে সবকিছুর দাম শুধু বাড়ছেই। সব মিলিয়ে সরকার গত ১৪ বছরে ১১ বার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। এর আগে গত বছর রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানো হয় জ্বালানি তেলের দাম। গ্যাসের দাম গত জুনে গড়ে ২৩ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। ১৮ জানুয়ারি তা রেকর্ড ৮২ শতাংশ বাড়ানো হয়।

শুধু গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নয়, বেড়েছে সারের দামও। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ৫১টি সেবার মূল্য, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করা পণ্যের দাম, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চালের দাম বেড়েছে। ঢাকা ওয়াসা গত ১৪ বছরে ১৪ বার পানির দাম বাড়িয়েছে।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.